গোদাগাড়ী
মাতৃভাষায় পড়ছে সাঁওতাল শিশুরা, মুগ্ধ নরওয়ের প্রতিনিধিরা

সাঁওতাল শিশুদের সঙ্গে নরওয়ের প্রতিনিধিরা, ছবি: আগামীর সময়
ভাষা শুধু কথা বলার মাধ্যম নয়। এটি একটি জনগোষ্ঠীর পরিচয়, সংস্কৃতি ও শিকড়ের অংশ। সেই ভাষায় পড়তে পারার আনন্দ সাঁওতাল শিশুদের চোখেমুখে। শ্রেণিকক্ষে তারা শিখছে নিজেদের মাতৃভাষায়। বইয়ের পাতায় খুঁজে নিচ্ছে চেনা শব্দ, চেনা জগৎ।
রাজশাহীর গোদাগাড়ীতে এমন পাঠদান দেখে মুগ্ধ হয়েছেন- নিশীথ সূর্যের দেশ নরওয়ের একটি প্রতিনিধি দল। তাদের মতে, মাতৃভাষায় প্রাথমিক শিক্ষা শিশুদের নিজস্ব সংস্কৃতি রক্ষার পাশাপাশি মূলধারার শিক্ষায় এগিয়ে যাওয়ার পথও তৈরি করে।
আজ বুধবার গোদাগাড়ীর শিমলা দীঘিপাড়া বহুভাষিক শিক্ষা বিদ্যালয় পরিদর্শনে এসে শিশুদের পাঠদান কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করেন নরওয়ের ক্রিস্টিয়ানস্যান্ড মিউনিসিপ্যালিটির ডেপুটি মেয়র সেলথ বেকবান ও ডাগ ভিগের নেতৃত্বে ছয় সদস্যের প্রতিনিধি দল।
স্ট্রমি ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ এবং রাজশাহী-ক্রিস্টিয়ানস্যান্ড ফ্রেন্ডশিপ কমিটির যৌথ পরিকল্পনায় এ সফরের আয়োজন করা হয়। সফরের অংশ হিসেবে প্রতিনিধি দলটি পরিবেশ ও সমাজ উন্নয়নমূলক সংস্থা ন্যাশনাল এজেন্সি ফর গ্রিন রিভ্যূলেশন (এনএজিআর)-এর বিভিন্ন কার্যক্রমও পরিদর্শন করে।
সকালে বিদ্যালয়ে পৌঁছালে ঐতিহ্যবাহী নাচ-গানের মাধ্যমে অতিথিদের স্বাগত জানান স্থানীয় সাঁওতাল জনগোষ্ঠীর মানুষ ও শিক্ষার্থীরা। সাঁওতাল রীতি অনুযায়ী অতিথিদের পা ধুইয়ে বরণ করে নেওয়া হয়। নিজস্ব সংস্কৃতির এমন আন্তরিক আয়োজনে বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে তৈরি হয় আবেগঘন পরিবেশ।
পরে শ্রেণিকক্ষে বসে শিশুদের মাতৃভাষায় পাঠদান দেখেন প্রতিনিধি দলের সদস্যরা। কথা বলেন শিক্ষার্থীদের সঙ্গে। জানতে চান তাদের পড়াশোনার কথা। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর শিশুদের নিজেদের ভাষায় প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ দেখে সন্তোষ প্রকাশ করেন তারা।
প্রতিনিধি দলের সদস্যদের মতে, একটি জাতির ভাষা তার সবচেয়ে বড় পরিচয় ও সম্পদ। মাতৃভাষা হারিয়ে গেলে একসময় সেই জাতির অস্তিত্বও সংকটে পড়তে পারে। তাই সাঁওতাল শিশুদের নিজেদের ভাষায় পড়ার সুযোগ তাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। পরিদর্শন শেষে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে দলীয় ছবিতে অংশ নেন অতিথিরা।
এনএজিআরের নির্বাহী পরিচালক স্টেফান সরেন বলেছেন, নিজেদের ভাষায় পরিচালিত বিদ্যালয় পেয়ে স্থানীয় সাঁওতাল জনগোষ্ঠীর মানুষ অত্যন্ত খুশি ও কৃতজ্ঞ। তার ভাষ্য, এনএজিআরের পরিচালিত বহুভাষিক শিক্ষা বিদ্যালয়ের পাশাপাশি মেনোনাইট সেন্ট্রাল কমিটির অর্থায়নে ১৫টি এবং স্ট্রমি ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ ও ক্রিস্টিয়ানস্যান্ড-রাজশাহী ফ্রেন্ডশিপ কমিটির উদ্যোগে আরও পাঁচটি বহুভাষিক শিক্ষা বিদ্যালয় পরিচালিত হচ্ছে।
তিনি বললেন, এ ধরনের বিদ্যালয়ের সংখ্যা বাড়ানো গেলে আরও বেশি আদিবাসী শিশু নিজেদের মাতৃভাষার পাশাপাশি বাংলাতেও শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ পাবে। এতে তারা মূলধারার শিক্ষায় এগিয়ে যেতে পারবে। এ কার্যক্রমের পরিধি বাড়াতে নরওয়ের প্রতিনিধি দল ও দাতা সংস্থাগুলোর সহযোগিতা অব্যাহত রাখার আহ্বান জানান তিনি।
সাঁওতাল শিশুদের এই শ্রেণিকক্ষ তাই শুধু পাঠ শেখার জায়গা নয়। এটি নিজের ভাষা ও সংস্কৃতিকে সঙ্গে নিয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়ার এক সম্ভাবনাও। মাতৃভাষায় শিক্ষার সুযোগ যত বাড়বে, ততই নিজেদের পরিচয় অটুট রেখে শিক্ষার বৃহত্তর পরিসরে এগিয়ে যাওয়ার পথ খুলবে নতুন প্রজন্মের জন্য।




