ফুলবাড়িয়ায় যে মন্দিরের প্রতিমা বিসর্জন হয়নি

ছবি: আগামীর সময়
ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়ায় শারদীয় দুর্গোৎসবের একটি মণ্ডপের প্রতিমা বিসর্জন দেওয়া হয়নি। উপজেলার পুটিজানা ইউনিয়নের বেরীবাড়ি গ্রামে স্বর্গীয় গঙ্গা জীবন পালের বাড়ির মণ্ডপে স্থাপিত প্রতিমাগুলো রেখে দিয়েছেন আয়োজকরা। এ ঘটনায় স্থানীয় হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে আলোচনা তৈরি হয়েছে।
ফুলবাড়িয়া উপজেলায় পৌরসভাসহ ১৩টি ইউনিয়নের ৭৫টি মণ্ডপে দুর্গাপূজার আয়োজন করা হয়। গতকাল বুধবার বিজয়া দশমীতে ৭৪টি মণ্ডপের প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে পূজার আনুষ্ঠানিকতা শেষ হয়। তবে বেরীবাড়ি গ্রামের ওই মণ্ডপের প্রতিমাগুলো বিসর্জন হয়নি।
প্রবীণ পূজারি ও বীর মুক্তিযোদ্ধা সুকুমার চক্রবর্তী বলেন, ফুলবাড়িয়ায় কোনো মণ্ডপের প্রতিমা বিসর্জন না দেওয়ার ঘটনা আগে তার জানা ছিল না। তার ভাষ্য, দর্পণ বিসর্জনের মাধ্যমে প্রতিমা বিসর্জনের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। পরে জলাশয়ে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে তা সম্পন্ন হয়। মণ্ডপের আয়োজকরা দর্পণ বিসর্জন দিলেও প্রতিমা বিসর্জন দেননি। তারা সারা বছর পূজা-অর্চনার জন্য প্রতিমা রেখে দিতে পারেন।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বেরীবাড়ি গ্রামের স্বর্গীয় জীবন চন্দ্র পালের ছেলে রিপন চন্দ্র পাল ও তার স্ত্রী রিনা রানী পাল প্রতিমা তৈরির কাজ করেন। তাদের বাড়ির আশপাশে দীর্ঘদিন ধরে চারটি মন্দিরে দুর্গাপূজা হয়ে আসছে। প্রায় আড়াই মাস আগে তারা নিজেদের বাড়িতে প্রথমবারের মতো দুর্গাপূজার আয়োজনের ঘোষণা দেন। এরপর প্রতিমা তৈরি, পুরোহিত ঠিক করাসহ পূজার অন্যান্য প্রস্তুতি নেওয়া হয়।
আয়োজন পরিচালনার জন্য ৪০ সদস্যের একটি মণ্ডপ কমিটি গঠন করা হয়। তবে রিপন চন্দ্র পালের অভিযোগ, তপন পালসহ কয়েকজনের সঙ্গে বিরোধের জেরে কমিটির সদস্যরা সরে যান। তার দাবি, তপন পালদের সঙ্গে তাদের জমি নিয়ে বিরোধ রয়েছে। পূজার আয়োজনে সহযোগিতা না করার জন্যও কয়েকজনকে হুমকি দেওয়া হয়েছিল বলে তিনি অভিযোগ করেন।
পরে রিপন চন্দ্র পাল সভাপতি, তার ভাই কাজল চন্দ্র পাল সাধারণ সম্পাদক এবং স্ত্রী রিনা রানী পাল কোষাধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব নিয়ে পরিবারের সদস্যদের সহায়তায় পূজার আয়োজন সম্পন্ন করেন।
আজ বৃহস্পতিবার দুপুরে সরেজমিনে দেখা যায়, বেরীবাড়ি গ্রামের পাকা সড়কের পাশে স্বর্গীয় গঙ্গা জীবন পালের বাড়িতে পূজামণ্ডপটি অবস্থিত। মণ্ডপের প্রবেশদ্বারে আলোকসজ্জা করা হয়েছে। ভেতরে দেবী দুর্গাসহ সব প্রতিমা রাখা রয়েছে। সামনে ধূপ ও ঘিয়ের প্রদীপ জ্বলছে। রিনা রানী পাল দেবী দুর্গার প্রতি ভক্তি নিবেদন করছিলেন।
এ সময় রিপন চন্দ্র পাল ও তার মা অবলা রানীর সঙ্গে কথা হয়। তারা জানান, প্রতিবেশীদের সঙ্গে আলোচনা করে বাড়িতে প্রথমবারের মতো পূজার আয়োজন করেন। তবে পূজার শেষ পর্যায়ে মণ্ডপ কমিটির সদস্যরা সরে যাওয়ায় পরিবারের সদস্যদের নিয়েই তারা সব কার্যক্রম সম্পন্ন করেন। রিপন চন্দ্র পালের দাবি, প্রতিমা বিসর্জন দেওয়ার জন্য প্রশাসনের পক্ষ থেকেও তাদের বলা হয়েছিল। তবে তারা প্রতিমাগুলো রেখে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
রিপন চন্দ্র পাল বলেন, ‘আমরা দর্পণ বিসর্জন দিয়েছি, প্রতিমা বিসর্জন দিইনি। সারা বছর প্রতিমা রেখে পূজা-অর্চনা করব। আগামী বছর এসব প্রতিমা জলাশয়ে বিসর্জন দিয়ে নতুন প্রতিমা তৈরি করব।’
অন্যদিকে, তপন পাল হুমকি দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, মণ্ডপে গিয়ে তিনি পূজা দেখে এসেছেন এবং ভক্তি জানিয়েছেন। কমিটির কোনো সদস্যকে হুমকি দেওয়া হয়নি। রিপন চন্দ্র পালদের সঙ্গে তার জমি নিয়ে বিরোধ রয়েছে বলে স্বীকার করেন তিনি। তবে প্রতিমা বিসর্জন না দেওয়ার সঙ্গে ওই বিরোধের কোনো সম্পর্ক আছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়ার মতো কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান কল্যাণ ফ্রন্টের ফুলবাড়িয়া শাখার সভাপতি সঞ্জীব রতন দে বলেন, পুটিজানা ইউনিয়নের বেরীবাড়ি গ্রামের ওই মণ্ডপে প্রতিমা বিসর্জন দেওয়া হয়নি। আয়োজকরা দর্পণ বিসর্জন দিয়েছেন এবং আগামী বছর প্রতিমাগুলো বিসর্জন দেওয়ার কথা জানিয়েছেন। তার মতে, এটি ধর্মীয় রীতিনীতির মধ্যেই রয়েছে।
ফুলবাড়িয়া থানার ওসি রাশেদুল হাসান বলেন, ওই মণ্ডপে প্রতিমা বিসর্জন দেওয়া হয়নি। আয়োজকরা আগামী বছর বিসর্জন দেবেন বলে জানিয়েছেন। মন্দিরে রাখা প্রতিমাগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নিজ দায়িত্বে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য তাদের বলা হয়েছে।





