এক আগুনে পুড়ল ১০৫ ব্যবসায়ীর ‘কপাল’

ছবি: আগামীর সময়
কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারী বাজারের কাপড় পট্টির খুচরা ও পাইকারি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ‘মেসার্স মামুন বস্ত্রালয়’। প্রায় ২০ বছর ধরে এই বাজারে ব্যবসা করে আসছেন এর স্বত্বাধিকারী জাকির হোসেন। দোকানে ছিল ঋণের টাকায় কেনা প্রায় ৫০ লাখ টাকার মালামাল। কিন্তু গত ৫ জুন শুক্রবারের এক রাতের অগ্নিকাণ্ড তাঁর সেই তিল তিল করে গড়ে তোলা স্বপ্ন এক নিমেষেই ছাই করে দিয়েছে। ঋণে জর্জরিত জাকির এখন পুরোপুরি দিশেহারা।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বললেন, 'আগুনে পুড়ে আমার সবকিছু শেষ হয়ে গেছে। দোকানে ৫০ লাখ টাকার বেশি মালামাল আর প্রায় ১০ লাখ টাকার ডেকোরেশন ছিল। চোখের সামনে সব পুড়ে ছাই হয়ে গেল, একটি টুকরো কাপড়ও বের করতে পারি নাই। আমি একেবারে নিঃস্ব হয়ে গেছি।'
জাকিরের মতো একই বুকফাটা হাহাকার আরেক ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ী আবুল বাসার আলিমের। দোকানে আগুন লাগার খবর পেয়ে যখন ছুটে এসেছিলেন, তখন চোখের সামনে নিজের স্বপ্নকে পুড়ে খাক হতে দেখা ছাড়া আর কিছুই করার ছিল না তাঁর। আলিম জানালেন, 'খবর পেয়ে দোকানে এসে দেখি আসবাবপত্রসহ সব মালামাল পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। এই ব্যবসার আয়ের টাকায় পুরো পরিবার চলত। সব হারিয়ে আমরা এখন পথে বসেছি।'
বক্তব্যগুলো শুধু জাকির বা আলিমের নয়; গত ৫ জুন শুক্রবার সকাল সাড়ে ৬টার দিকে কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারী উপজেলার ভূরুঙ্গামারী বাজারে দুটি মার্কেটে ঘটে যাওয়া ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া ১০৫ জন ব্যবসায়ীর সবার গল্পই এখন এমন চুরমার হয়ে যাওয়া স্বপ্নের। মাত্র দেড় ঘণ্টার আগুনে তছনছ হয়ে গেছে তাঁদের বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন।
ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ী জাকির হোসেন আরও জানান, এনআরবিসি ব্যাংক ও ব্র্যাক এনজিও থেকে তাঁর বড় অঙ্কের ঋণ নেওয়া আছে। এখন কীভাবে ঋণের কিস্তি শোধ করবেন, আর দোকানে কাজ করা ৭ জন কর্মচারীর সংসারই বা কীভাবে চলবে—তা ভেবে পাচ্ছেন না তিনি। সরকারের কাছে পুনর্বাসনের দাবি জানানোর পাশাপাশি ব্যাংকের ঋণের সুদ মওকুফ ও তা পুনঃতফসিল করার আকুতি জানিয়েছেন তিনি।
সেদিনের ভয়াবহ ঘটনার বর্ণনা দিয়ে বাজারের মাংস ব্যবসায়ী মোজাম্মেল জানালেন, 'আমরা বাজারে গরু জবাই করার প্রস্তুতি নেওয়ার সময় সকাল সাড়ে ৬টার দিকে হঠাৎ কাপড় পট্টির একটি দোকান থেকে ধোঁয়া বের হতে দেখি। দ্রুত সেখানে গিয়ে কয়েকটি দোকান থেকে কিছু মালামাল বের করতে পারলেও মুহূর্তের মধ্যে আগুন পুরো মার্কেটে ছড়িয়ে পড়ে। আগুনের উত্তাপ এত বেশি ছিল যে কেউ আর কাছে ভিড়তে পারেনি।' পরে স্থানীয়রা ফায়ার সার্ভিসকে খবর দিলে নাগেশ্বরী ফায়ার সার্ভিসের ৩টি ইউনিট ঘটনাস্থলে পৌঁছে প্রায় দুই ঘণ্টার চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে।
ব্যবসায়ীরা জানান, ‘স্বপ্ন ছোঁয়া ক্ষুদ্র কাপড় ব্যবসায়ী মার্কেট’ ও ‘চেয়ারম্যান মার্কেট’-এ লাগা এই আগুনে মাত্র দেড় ঘণ্টার মধ্যে ৮৫টি কাপড়ের দোকান, জাকের পার্টির উপজেলা কার্যালয়, ১৫টি ফল, জুতা, কসমেটিকস ও বইয়ের দোকান এবং ৫টি ভ্রাম্যমাণ নার্সারি (গাছের দোকান) পুড়ে ভস্মীভূত হয়ে গেছে। এতে প্রায় ১৫ কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
নাগেশ্বরী ফায়ার সার্ভিসের স্টেশন অফিসার খলিলুর রহমান জানান, খবর পাওয়া মাত্রই তাঁরা ঘটনাস্থলে এসে কাজ শুরু করেন এবং প্রায় ২ ঘণ্টার চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনেন। বৈদ্যুতিক গোলযোগ (শর্ট সার্কিট) থেকে এই অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত হতে পারে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করছেন তিনি।
স্বপ্ন ছোঁয়া ক্ষুদ্র কাপড় ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি আকতারুজ্জামান টুটুল আক্ষেপ করে বলেছেন, 'আমার দোকানে প্রায় ১২ লক্ষ টাকার তৈরি পোশাক ও কাপড় ছিল। কিছুই বের করতে পারি নাই। আগুনে আমার মতো ১০৫ জন ব্যবসায়ী আজ পথে বসেছে।' তিনি আরও জানান, ব্যবসা বড় করতে খামারিরা বিভিন্ন ব্যাংক ও এনজিও থেকে বড় অঙ্কের ঋণ নিয়েছিলেন। দোকানের আয় দিয়ে সংসার চালানোর পাশাপাশি ঋণের কিস্তি দিতেন। রোজগারের একমাত্র উৎসটি চোখের সামনে শেষ হয়ে যাওয়ায় সবাই এখন বাকরুদ্ধ।
সার্বিক বিষয়ে ভূরুঙ্গামারী উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) অমৃ্ত দেবনাথ জানান, অগ্নিকাণ্ডে দুটি মার্কেটের ১০৫টি দোকান পুড়ে প্রাথমিকভাবে প্রায় ১৫ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে জানা গেছে। সদর ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আব্দুল লতিফকে ক্ষতিগ্রস্তদের একটি সঠিক তালিকা তৈরি করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া ক্ষতিগ্রস্তদের দ্রুত পুনর্বাসনের বিষয়টি ইতিমধ্যে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।




