পীরগঞ্জে কবরস্থানে পৌরসভার বর্জ্য, ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী

ছবি: আগামীর সময়
উত্তরবঙ্গের ঐতিহাসিক পীরগঞ্জ উপজেলার নামকরণ যার নামে, সেই বিখ্যাত সাধক হযরত পীর সিরাজউদ্দিন আউলিয়ার মাজার সংলগ্ন পীরডাঙ্গী গোরস্থানটি এখন পৌরসভার ময়লার ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে। কোনো প্রকার আইনি বা ধর্মীয় রীতিনীতির তোয়াক্কা না করে স্বয়ং পৌরসভার গাড়ি দিয়ে প্রতিদিন পুরো শহরের বর্জ্য ফেলা হচ্ছে এই পবিত্র স্থানে।
গোরস্থানটির উত্তর পাশে পীরগঞ্জ সরকারি কলেজ এবং দক্ষিণ পাশে সবুজ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় অবস্থিত। এমন একটি জনগুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল জায়গায় দিনদুপুড়ে বর্জ্য ফেলায় একদিকে যেমন পচা দুর্গন্ধ ও রোগবালাই ছড়াচ্ছে। অন্যদিকে চরমভাবে আঘাতপ্রাপ্ত হচ্ছে স্থানীয় ধর্মপ্রাণ মানুষের ধর্মীয় অনুভূতি।
জানা যায়, গত ২৮ মে পবিত্র ঈদুল আজহার পশুর বর্জ্যও এই কবরস্থানের ভেতরে স্তূপ করে রাখা হয়েছে। এমনকি সম্প্রতি এই প্রতিবেদক সরেজমিনে উপস্থিত থাকাকালীন এক নজিরবিহীন দৃশ্য চোখে পড়ে। দেখা যায়, এক ভ্যানচালক একটি মৃত গরু গোরস্থানের ভেতরে উন্মুক্ত অবস্থায় ফেলে দিচ্ছেন। তাৎক্ষণিক তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে তিনি জানালেন, আমি ভ্যান চালাই। আমাকে এক ব্যক্তি এই মরা গরুটি এখানে ফেলে দিয়ে চলে যেতে বলেছে।
তবে সাংবাদিকের উপস্থিতিতে বিষয়টি জানাজানি হয়ে গেলে পরবর্তীতে ওই ভ্যানচালক মৃত গরুটি পুনরায় ভ্যানে তুলে নিয়ে এলাকা ত্যাগ করতে বাধ্য হন।
কবরস্থানটির এমন বেহাল দশায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় সচেতন মহল। এলাকার বাসিন্দা মাসুদ রানা মেনন অভিযোগ করেন, এই কবরস্থানটিতে পর্যাপ্ত পরিমাণ আলোর ব্যবস্থা নেই। চারদিকের বিশাল এলাকার মধ্যে মাত্র একদিকে নামমাত্র একটু বেড়া আছে, বাকি তিন দিক পুরোপুরি অরক্ষিত।
রাতে পুরো এলাকা ঘুটঘুটে অন্ধকারে ডুবে যায়। আর এই অন্ধকারের সুযোগ নিয়ে রাতের বেলা পীরগঞ্জ সবুজ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাশে গোরস্থানের ভেতরেই নিয়মিত বসে মাদকসেবীদের আড্ডা ও জুয়ার আসর।
এছাড়া এলাকার একাধিক পথচারী ও মুসল্লি ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, ময়লা-আবর্জনার তীব্র দুর্গন্ধে এখন গোরস্থানের পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়া কিংবা স্বজনদের কবর জিয়ারত করতে আসাও প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। মৃত মানুষের প্রতি এমন চরম অবমাননা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।
আইনি দৃষ্টিকোণ থেকে বাংলাদেশ দণ্ডবিধির ২৯৫ ও ২৯৭ ধারা অনুযায়ী, যেকোনো ধর্মীয় স্থান বা কবরস্থানের পবিত্রতা নষ্ট করা, সেখানে অনাধিকার প্রবেশ বা ক্ষতিসাধন করা সম্পূর্ণ বেআইনি এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এছাড়া দেশের প্রচলিত পরিবেশ সংরক্ষণ আইন অনুযায়ীও এভাবে উন্মুক্ত স্থানে ময়লা ফেলা নিষিদ্ধ। কিন্তু সাধারণ মানুষের প্রশ্ন, আইন প্রয়োগকারী ও স্থানীয় অভিভাবক সংস্থা হিসেবে পৌরসভা নিজেই কীভাবে এই আইন লঙ্ঘন করে দিনের পর দিন গোরস্থানে বর্জ্য ফেলছে।
গোরস্থানটি অরক্ষিত এবং আলোহীন থাকায় স্থানীয়দের মনে নতুন করে কঙ্কাল চুরির আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। এর আগে ২০২২ সালের জুলাই মাসে এই উপজেলার পীরডাঙ্গী গোরস্থান থেকে এক রাতে প্রায় ১৯টি কবর খুঁড়ে কঙ্কাল চুরির চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটেছিল, যার মধ্যে প্রশাসন পরবর্তীতে ৮-৯টি কঙ্কাল চুরির সত্যতা নিশ্চিত করে।
এর ঠিক পরের বছর ২০২৩ সালের আগস্টে ভেলাতৈড় যৈদ্দপীর কবরস্থান থেকেও এক রাতে ১০-১১টি কঙ্কাল চুরি হয়। স্থানীয়দের আশঙ্কা, বর্তমান গোরস্থানটিকে যেভাবে সীমানা প্রাচীর ছাড়া আর অন্ধকারে ফেলে রাখা হয়েছে, তাতে যেকোনো সময় এখানেও বড় ধরনের কঙ্কাল চুরির ঘটনা ঘটতে পারে।
কবরস্থানের এই সার্বিক অব্যবস্থাপনা, ময়লা ফেলা এবং নিরাপত্তার অভাবের বিষয়ে জানতে চাইলে পীরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বলেছেন, ‘আমি এই উপজেলায় দায়িত্ব গ্রহণের আগে থেকেই ওই স্থানটিতে পৌরসভার ময়লা-আবর্জনা ফেলা হচ্ছিল। তবে বর্তমানে কোনো ময়লা যেন কোনোভাবেই কবরের ওপর গিয়ে না পড়ে, সেজন্য সংশ্লিষ্টদের কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এছাড়া গোরস্থানটিতে রাতের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে খুব দ্রুতই পর্যাপ্ত লাইটিং বা আলোর ব্যবস্থা করা হবে।’
বর্জ্য ব্যবস্থাপনার স্থায়ী সমাধান নিয়ে ইউএনও আরও জানান, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা আধুনিক ও বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে করার জন্য বর্তমান সরকার একটি বিশেষ প্রকল্প গ্রহণ করেছে। আগামী ৫ থেকে ৬ মাসের মধ্যে একটি চাইনিজ প্রতিনিধি দল ঠাকুরগাঁও জেলা পরিদর্শনে আসবেন।
তারা এলে এই আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্রকল্পের কাজ পুরোদমে শুরু হবে এবং তখন এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হয়ে আসবে। তবে যতদিন না পর্যন্ত স্থায়ী ডাম্পিং স্টেশন হচ্ছে, ততদিন এই পবিত্র গোরস্থানটিকে ময়লার ভাগাড় থেকে মুক্ত করা এবং চারদিকে স্থায়ী সীমানা প্রাচীর দিয়ে পূর্বপুরুষদের শেষ ঠিকানার মর্যাদা ফিরিয়ে দেওয়ার জোর দাবি জানিয়েছেন পীরগঞ্জবাসী।




