পদ্মার ঢেউয়ে বৈঠার ছন্দ, বাঘায় ফিরল লোকজ ঐতিহ্য

বাঘা উপজেলার গড়গড়ি ইউনিয়নের বেঙ্গাড়ী বাজারসংলগ্ন পদ্মাপাড়ে তিন দিনব্যাপী নৌকাবাইচ। ছবি: আগামীর সময়
পদ্মার বুকে সারি সারি নৌকা। মাঝিদের ছন্দময় বৈঠার টানে এগিয়ে চলছে প্রতিযোগীরা। নদীর দুই তীরে হাজারো দর্শনার্থীর উচ্ছ্বাস। করতালি আর হর্ষধ্বনিতে মুখর চারপাশ। কোথাও প্রিয় দলের জয়ের অপেক্ষা, কোথাও নৌকার গতির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে উত্তেজনা। রাজশাহীর বাঘা উপজেলার গড়গড়ি ইউনিয়নের বেঙ্গাড়ী বাজারসংলগ্ন পদ্মাপাড়ে তিন দিনব্যাপী নৌকাবাইচ ও গ্রামীণ মেলাকে ঘিরে তৈরি হয় এমনই উৎসবমুখর পরিবেশ।
গত বৃহস্পতিবার থেকে শুরু হওয়া এ আয়োজন শেষ হয়েছে গতকাল শনিবার রাতে। শেষ দিনের হাতবৈঠা নৌকাবাইচে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে হুমায়ুনের দল। রানার্সআপ হয়েছে দুড়দুড়িয়া দল। প্রতিযোগিতা শেষে চ্যাম্পিয়ন দলকে ১ লাখ টাকা এবং রানার্সআপ দলকে ৬০ হাজার টাকা পুরস্কার দেওয়া হয়।
আয়োজকদের তথ্য অনুযায়ী, প্রথম ও দ্বিতীয় দিনের প্রতিযোগিতায় বিজয়ী দলগুলোকে পর্যায়ক্রমে স্মার্ট টেলিভিশন ও কালার টেলিভিশন পুরস্কার দেওয়া হয়। কয়েক বছর বিরতির পর নৌকাবাইচ ও গ্রামীণ মেলার আয়োজন হওয়ায় স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে বাড়তি উৎসাহ দেখা যায়। সর্বশেষ ২০২৩ সালে এখানে এ আয়োজন করা হয়েছিল।
নৌকাবাইচ দেখতে বাঘা, চারঘাট, লালপুরসহ আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে দর্শনার্থীরা আসেন। শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে প্রবীণ, সব বয়সী মানুষের উপস্থিতিতে নদীর দুই পাড়ে তৈরি হয় জনসমাগম। কেউ নৌকাবাইচের রোমাঞ্চ উপভোগ করতে, কেউ গ্রামীণ মেলায় ঘুরতে, আবার কেউ আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগি করতে এসেছিলেন।
সমাপনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন রাজশাহী-৬ আসনের সংসদ সদস্য আবু সাঈদ চাঁদ। তিনি বলেছেন, নৌকাবাইচ বাংলার দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য ও গ্রামীণ সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এ ধরনের আয়োজন নতুন প্রজন্মের কাছে নিজস্ব সংস্কৃতি তুলে ধরার পাশাপাশি মানুষের মধ্যে সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্য বাড়ায়। গ্রামবাংলার ঐতিহ্য ধরে রাখতে এমন আয়োজন নিয়মিত অব্যাহত রাখা প্রয়োজন।
নৌকাবাইচের পাশাপাশি পদ্মার তীর জুড়ে বসেছিল গ্রামীণ মেলা। মৃৎশিল্প, শিশুদের খেলনা, মিষ্টি ও প্লাস্টিকের সামগ্রীসহ নানা পণ্যের পসরা সাজিয়ে বসেন ব্যবসায়ীরা। ছিল নাগরদোলা, সার্কাস ও বিভিন্ন বিনোদনের আয়োজন। আয়োজকদের তথ্য অনুযায়ী, মেলায় প্রায় ৫০০টি ছোট-বড় দোকান বসেছিল। নৌকাবাইচের উত্তেজনার পাশাপাশি মেলায় কেনাকাটা ও বিনোদনে মেতে ওঠেন দর্শনার্থীরা।
নৌকাবাইচ ও মেলাকে ঘিরে স্থানীয় মানুষের পারিবারিক ও সামাজিক সম্পর্কেও তৈরি হয় নতুন প্রাণচাঞ্চল্য। দূরের আত্মীয়স্বজন বাড়িতে বেড়াতে আসেন। মেয়ে-জামাই, পরিচিতজন ও প্রতিবেশীদের মিলনে অনেক বাড়িতে তৈরি হয় আনন্দের পরিবেশ।
স্থানীয় বাসিন্দা মো. সালাহউদ্দিন জানিয়েছেন, মেলা এলেই এলাকায় আনন্দমুখর পরিবেশ তৈরি হয়। আত্মীয়স্বজন, মেয়ে-জামাই বাড়িতে বেড়াতে আসেন। সবাই একসঙ্গে মিলিত হয়ে আনন্দ ভাগাভাগি করেন। এটি এলাকার দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য ও আনন্দের অংশ।
নৌকাবাইচ মেলা কমিটির সভাপতি তোজাম্মেল হক ও সাধারণ সম্পাদক আবুল কালাম আজাদ ডাবলু সরকার জানিয়েছেন, হারিয়ে যেতে বসা লোকজ সংস্কৃতি ধরে রাখা এবং নতুন প্রজন্মের কাছে গ্রামবাংলার ঐতিহ্য তুলে ধরাই এ আয়োজনের অন্যতম উদ্দেশ্য।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বাঘা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. সেরাজুল হক, বাঘা উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক ফকরুল হাসান বাবলু, আড়ানী পৌর বিএনপির সভাপতি ও সাবেক চেয়ারম্যান তোজাম্মেল হক, রাজশাহী জেলা ছাত্রদলের আহ্বায়ক এস এম সালাউদ্দিন আহমেদ শামীম সরকার, নারী নেত্রী সেলিনা আক্তার শাপলা ও শারমিন সুলতানা সোনিয়াসহ স্থানীয় রাজনৈতিক ও সামাজিক নেতারা।




