রংপুরে নববর্ষের নানা রঙ

ছবিঃ আগামীর সময়
রঙ্গরসে ভরপুর তার নাম রংপুর। নামকরণের স্বার্থকতা ধরে রাখতে যেকোন আনন্দ উৎসবে কখনোই পিছিয়ে থাকে না এ অঞ্চলের মানুষ। বাংলা বর্ষবরণের জন্য চলছে ব্যাপক প্রস্তুতি। সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনসহ সর্বত্র বিরাজ করছে বৈশাখী আমেজ।
নতুন বছর উপলক্ষ্যে বৈশাখী মেলা, গ্রামীণ খেলা, পান্তা-ইলিশের আয়োজন, হালখাতা, শোভাযাত্রাসহ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি চলছে বিভিন্ন স্থানে। নগরের বিপণীবিতানগুলোও সেজেছে উৎসবের আমেজে। পুরনো দিনের সমস্ত গ্লানি ধুয়ে মুছে নতুনের আয়োজনে এখন ব্যস্ত সবাই। বর্ষবরণকে ঘিরে রংপুরের সর্বত্র পড়েছে উৎসবের ধুম।
মেলা
চৈত্রসংক্রান্তি ও পহেলা বৈশাখে রংপুরের বিভিন্ন এলাকায় মেলার আয়োজন অনেক পুরনো রীতি। বাংলার ঐতিহ্যবাহী লোকসংস্কৃতির অন্যতম উপাদান মেলা। গ্রামীণ সমাজ জীবনের পারস্পরিক যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে মেলার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল একসময়। মেলা কেন্দ্র করে বিরাজ করে উৎসবমুখর পরিবেশ।
আশপাশের কয়েক গ্রামের মানুষ আসে মেলায়। সামাজিক সম্প্রীতি সৃষ্টির ক্ষেত্রে ইতিবাচক ভূমিকা রাখে এ পারস্পরিক যোগাযোগ। স্থানীয় কারুশিল্পীদের উৎপাদিত ও কৃষিপণ্যই থাকে গ্রামীণ মেলার মূল বেচাকেনার মূল। বাঁশ, বেত, পাট, শোলা, ধাতব, মৃৎ, চামড়া, তন্তুজাত বাহারি কারুপণ্য ও শিশুদের খেলনার বিপুল সমাবেশ প্রাণবন্ত এই মেলা। এর পাশাপাশি থাকে খাজা, গজা, মওয়া— নানা পদের খাবার। থাকে নাগরদোলা, পুতুলনাচ, গাজির গান, যাত্রাপালা, সার্কাস, লাঠিখেলাসহ বর্ণিল আয়োজন।
রংপুরের চব্বিশ হাজারীতে লোকনাথ মন্দিরে চৈত্রসংক্রান্তিতে মেলার আয়োজন করা হয় শত বছর ধরে। এখানে বিশেষ আকর্ষণ থাকে চড়ক পূজা। গত কয়েক বছর ধরে বুড়িরহাটের বুড়ি মন্দিরেও পহেলা বৈশাখে মেলা বসে। নগরে শোভাযাত্রাসহ নানা আয়োজনের বাইরে পহেলা বৈশাখে চিকলী বিল সিটি পার্ক, ঘাঘট নদের তীরে অবস্থিত প্রয়াস সেনা বিনোদন পার্ক, পুরনো শহর মাহিগঞ্জ এবং গঙ্গাচড়ায় তিস্তা নদীর পারসহ জেলার আট উপজেলাতেও হয় বৈশাখী মেলা। এছাড়া মাহিগঞ্জ ডিমলা রাজ দেবোত্তর এস্টেট প্রাঙ্গণে তিনদিনব্যাপি হয় বউ মেলা। এখানে আসেন শুধু নারীরা। ক্রেতা-বিক্রেতা সকলেই নারীরাই।
খেলা
বাংলা নববর্ষে দিনভর আনন্দ-আড্ডায় মেতে থাকা যেন রংপুরের মানুষের অলিখিত নিয়ম। তাই স্থানীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছাড়াও বড় মাঠে আয়োজন করা হয় গ্রামীণ খেলার। এখানে প্রীতি ফুটবল, হাডুডু, কাবাডি, ঐতিহ্যবাহী লাঠিখেলাসহ গ্রামীণ খেলাধুলা হয়ে থাকে। বুড়িরহাট, পাগলাপীর, ময়নাকুঠি, বড়বাড়ি, খটখটিয়াসহ রংপুরের পল্লী এলাকাগুলোতে বৈশাখে থাকে নানা খেলা।
পান্তা-ইলিশ
বৈশাখ মানেই যেন বাঙালিয়ানা। পান্তা-ইলিশ ছাড়া এ উৎসব পূর্ণতা পায় না। নগর জীবনের বাইরেও রংপুরের রাস্তার মোড়ে মোড়ে সামাজিক সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো এর আয়োজন করে।
হালখাতা
পয়লা বৈশাখে ‘পুণ্যাহ’ উৎসব চালু করেন নবাব মুর্শিদ কুলি খান। তখন কিছুটা জাতীয় পুঁজির বিকাশ ঘটায় ব্যবসা-বাণিজ্যের একটি উন্নত অবস্থা সৃষ্টি হচ্ছিল। এই ব্যবসায়ীরাই পুণ্যাহর আনুষঙ্গিক অনুষ্ঠান হিসেবে ‘হালখাতা’ উৎসব চালু করেন। বাংলার অর্থনীতি ছিল কৃষিনির্ভর। ফলে কৃষকের হাতে নগদ অর্থের জোগান শুধু ফসল কাটার সময়েই আসত। তাই বাধ্য হয়ে তারা দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় জিনিস ব্যবসায়ী বা দোকানিদের কাছ থেকে বাকিতে কিনতে বাধ্য হতেন।
নতুন বছরের প্রথম দিনে হালখাতা উৎসবে বকেয়া অর্থের পুরোটা বা আংশিক পরিশোধ করে হালখাতা বা নতুন খাতায় লেখা হতো নাম। তার মধ্যে অবশ্য আনন্দের উপকরণও ছিল। হালখাতা উপলক্ষে খাওয়া-দাওয়া বিশেষ করে মিষ্টান্ন বিতরণের রেওয়াজ ছিল। সেই রীতি অনুসরণ করে রংপুর অঞ্চলের ব্যবসায়ীদের বাড়ি কিংবা দোকানে থাকে হালখাতা উৎসব। আমন্ত্রিতদের খাতিরে থাকে মন্ডা-মিঠাইসহ ঘরে বানানো হরেক পদের খাবার।
রীতিনীতি
রংপুরের গ্রামাঞ্চলের মানুষের মাঝে এখনো প্রচলিত পহেলা বৈশাখের পুরনো রীতি। সর্বত্র আধুনিকতার ছোঁয়া লাগলেও সেই রেওয়াজের চর্চা আছে এখানে। বাংলা বছরের শেষ দিনটিকে বলা হয় চৈত্রসংক্রান্তি। শাস্ত্র অনুসারে এই দিনে স্নান, দান, ব্রত, উপবাস প্রভৃতিকে পুণ্যকর্ম বলে মনে করা হয়। চৈত্রসংক্রান্তিতে সনাতন সম্প্রদায়ের প্রধান উৎসব হলো চড়ক। এর সঙ্গে চলে মেলা। চৈত্র মাসজুড়ে উপবাস, ভিক্ষান্নভোজন পালন শেষে সংক্রান্তির দিন আয়োজন হয় চড়ক মেলা। এ মেলায় মাঠের মধ্যে ‘চড়কগাছ’ নামের লম্বা খুঁটি পোঁতা হয়। এরপর ভক্তরা পিঠে লোহার বড়শি বিদ্ধ করে চড়কে ঘোরে।
বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, চৈত্রসংক্রান্তিকে ঘিরে সন্ন্যাসীরা বাদ্যের তালে তালে নেচে নেচে দেবদেবীর প্রতিকৃতি (পাট) মাথায় নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। তারা যে বাড়িতে যান, সেই বাড়ির গৃহিণী পরিষ্কার পিঁড়ি বা জলচৌকি পেতে দেন। এরপর তারা ওই পিঁড়ি বা জলচৌকির ওপর পাট নামান। এই সময় গৃহস্থের মঙ্গল কামনায় নেচে নেচে গান পরিবেশন করেন সন্ন্যাসীরা। গান পরিবেশন শেষে সন্ন্যাসীদের চাল, সবজি কিংবা টাকা উপঢৌকন দেন গৃহিণীরা। সংগৃহিত অর্থে বাংলার সংস্কৃতি নতুন প্রজন্মের কাছে ছড়িয়ে দিতে চৈত্রসংক্রান্তি উৎসব ও চড়ক মেলার আয়োজন করা হয়।
এছাড়া পুরনো রীতি অনুয়ায়ী রংপুরের গ্রামাঞ্চলের লোকজন চৈত্রসংক্রান্তির সকালে তিতা জাতীয় (ভাটির পাতার রস, জাত নিমের পাতার রস, নীলতাতের রস) খাবার খান। তাদের বিশ্বাস, এতে সারাবছর শরীরে হবে না কোন রোগ-বালাই। এছাড়া ওইদিন মুলত খেসারী, না হলে মসুর, ছোলা জাতীয় কলাই ভেজে চিবিয়ে খাওয়া হয়। এই রীতি মূলত দাঁত শক্ত করার জন্য। পহেলা বৈশাখে ভালো খাবার, ভালো কাপড় পরিধান, ঝগড়াঝাটি না করা, কারো সঙ্গে লেন-দেন না করাসহ বিভিন্ন নিয়ম মেনে চলেন অনেকেই। নতুন বছরজুড়ে ভালো থাকা যাবে— এই বিশ্বাস থেকেই পহেলা বৈশাখে রংপুর অঞ্চলের মানুষজন এখনো মেনে চলেন পুরনো প্রথা।

