মৃত্যুর মিছিলেও পাহাড় ছাড়ছে না কেউ, ঝুঁকিতে ৫ লাখ মানুষ

প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রতিদিন মাইকিং করা হলেও পাহাড় ছাড়ছেন না মানুষ। ঝুঁকি নিয়েই বাস করছে—ছবি: সংগৃহীত
রোজিনা আক্তার তখন রাতের খাবার রান্না করছিলেন। চুলায় ছিল ভাত। পাশে তরকারি। পরিবারের সদস্যরা অপেক্ষা করছিলেন খাবারের জন্য। কিন্তু রান্না শেষ হওয়ার আগেই শেষ হয়ে যায় রোজিনার জীবন। মুহূর্তের মধ্যে পাশের পাহাড় ধসে পড়ে। মাটির নিচে চাপা পড়ে রান্নাঘর। চাপা পড়েন রোজিনাও। স্থানীয়রা ঘণ্টার পর ঘণ্টা চেষ্টা করেন। পরে উদ্ধারকাজে যোগ দেয় ফায়ার সার্ভিস। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাকে বাঁচানো যায়নি। এটি কোনো বিচ্ছিন্ন দুর্ঘটনা নয়। বরং বর্ষা এলেই কক্সবাজারে ফিরে আসা এক নির্মম বাস্তবতার আরেকটি অধ্যায়।
চলতি জুলাইয়ে টানা আট দিনের ভারী বৃষ্টিতে কক্সবাজারে দেখা দিয়েছে বহুমুখী দুর্যোগ। বন্যা, পাহাড়ধস, ভূমিধস, নদীভাঙন ও জলাবদ্ধতায় বিপর্যস্ত পুরো জেলা। জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, জেলার অর্ধশতাধিক ইউনিয়ন প্লাবিত হয়েছে। পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন অন্তত পাঁচ লাখ মানুষ। পাহাড়ধস, পানিতে ডুবে যাওয়া, দেয়ালধস ও অন্যান্য দুর্ঘটনায় এখন পর্যন্ত মৃত্যু হয়েছে অন্তত ২৯ জনের।
সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি উখিয়ার রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরে। মাত্র তিন দিনের টানা বৃষ্টিতে সেখানে ১৬০টির বেশি দুর্যোগের ঘটনা ঘটেছে। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে ৪ হাজার রোহিঙ্গা এবং ৬ হাজার স্থানীয় বাসিন্দাকে। তবু প্রাণহানি ঠেকানো যায়নি। শুধু পাহাড়ধসেই রোহিঙ্গা ক্যাম্পে মারা গেছেন ১৩ জন। উখিয়ার ৫ নম্বর ক্যাম্পে পাহাড়ধসে একটি মাদ্রাসা চাপা পড়ে পাঁচ কিশোরীর মৃত্যু পুরো দেশকে নাড়িয়ে দিয়েছে।
অন্যদিকে গতকাল শনিবার রাতে কক্সবাজার শহরের ঝিরঝিরি এলাকায় পাহাড়ধসে প্রাণ হারান গৃহবধূ রোজিনা আক্তার। তার পরিবারের অভিযোগ, দীর্ঘদিনের অবৈধ পাহাড় কাটার কারণেই এ দুর্ঘটনা ঘটেছে। তবে এমন অভিযোগ নতুন নয়। প্রায় প্রতি বর্ষাতেই একই অভিযোগ ওঠে। এরপর কিছুদিন আলোচনা হয়। তারপর আবার সবকিছু আগের মতোই চলতে থাকে।
এর মধ্যেই আরেকটি ঘটনা নতুন করে পাহাড়ের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। টেকনাফের শিয়ালিয়াঘোনা পাহাড়ে খাদ্য সংগ্রহের সময় প্রায় ৩০০ ফুট নিচে পড়ে গুরুতর আহত হয় ২০ থেকে ২৫ বছর বয়সী একটি বন্য মা হাতি। বন বিভাগ, প্রাণিসম্পদ বিভাগ ও ডুলাহাজারা সাফারি পার্কের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকেরা টানা একদিন চেষ্টা চালান। কিন্তু আজ রবিবার সকালে হাতিটি মারা যায়। বন কর্মকর্তাদের ধারণা, টানা বৃষ্টিতে পাহাড়ের মাটি নরম ও পিচ্ছিল হয়ে যাওয়ায় এ দুর্ঘটনা ঘটেছে। এই ঘটনা দেখিয়ে দিয়েছে—শুধু মানুষ নয়, বন্য প্রাণীরাও এখন পাহাড়ের পরিবর্তিত পরিবেশের নির্মম শিকার।
পাহাড় এখন মানবসৃষ্ট বিপদের কেন্দ্র
একসময় কক্সবাজারের পাহাড়জুড়ে ছিল গর্জন, চাপালিশ, তেলসুরসহ নানা দেশীয় গাছ। ঝিরি-ঝরনা, বন্যপ্রাণী ও জীববৈচিত্র্যের নিরাপদ আবাস ছিল এই বনাঞ্চল। সময়ের সঙ্গে সেই চিত্র পাল্টে গেছে। এখন পাহাড় কেটে গড়ে উঠেছে হাজার হাজার অবৈধ বসতি। হয়েছে বাজার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সড়ক, বিদ্যুতের খুঁটি, মোবাইল টাওয়ার এবং স্থায়ী জনপদ।
সরকারি হিসাব বলছে, কক্সবাজার উত্তর ও দক্ষিণ বন বিভাগের আওতায় রয়েছে দুই লাখ ২৩ হাজার একরেরও বেশি সংরক্ষিত বনভূমি। অথচ এর বড় অংশ এখন দখলদারদের নিয়ন্ত্রণে। দক্ষিণ বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, শুধু তাদের আওতাতেই প্রায় ১২ হাজার একর বনভূমি বেদখলে। সাম্প্রতিক সময়ে ৫ হাজার একর উদ্ধার করা হলেও দখলদারদের দৌরাত্ম্য থামেনি।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) কক্সবাজার জেলা সাধারণ সম্পাদক করিম উল্লাহ কলিমের দাবি, সংরক্ষিত বনাঞ্চলের ভেতরে বর্তমানে পাঁচ লাখেরও বেশি মানুষের বসবাস। যদিও বন বিভাগের হিসাব দুই লাখের কিছু বেশি। সংখ্যার পার্থক্য থাকলেও বাস্তবতা একটাই, বনের জায়গায় গড়ে উঠেছে বিশাল জনপদ।
অবৈধ দখলের সঙ্গে নাগরিক সুবিধা
দক্ষিণ বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ আল মামুনের ভাষ্য, তার সংরক্ষিত বনাঞ্চলের ভেতরে ইতোমধ্যে ৭ হাজার ২৭৪টি পল্লী বিদ্যুতের খুঁটি বসানো হয়েছে। পাশাপাশি রয়েছে সড়ক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ নানা স্থাপনা।
তিনি প্রশ্ন রাখেন, যেখানে রাষ্ট্রই বনভূমির ভেতরে নাগরিক সুবিধা পৌঁছে দিচ্ছে। সেখানে নতুন বসতি গড়ে ওঠা কীভাবে বন্ধ হবে?
পরিবেশবিদদের মতে, এই প্রশ্নই আজ কক্সবাজারের পরিবেশ সংকটের মূল চিত্র তুলে ধরে।
প্রশাসনের মাইকিং, মানুষের অনীহা
ভূমিধসের সতর্কতা জারি করেছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। জেলা প্রশাসন, তথ্য অফিস, পৌরসভা ও উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রতিদিন মাইকিং, লিফলেট বিতরণ ও সচেতনতামূলক প্রচারণা চালানো হচ্ছে। তবু ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার কোনো পরিবার পাহাড় ছাড়তে রাজি নয়। এসব তথ্য জানালেন কক্সবাজার সদর উপজেলার বর্তমান উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) তাহমিনা আক্তার।
জেলা প্রশাসক মো. আবদুল মান্নান জানালেন, ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড় থেকে মানুষ সরাতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের মাঠে নামানো হয়েছে। নির্দেশনা অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থাও নেওয়া হবে। ইতোমধ্যে শতাধিক পরিবারকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
তার ভাষ্য, ‘বাস্তবতা হলো পুনর্বাসনের নিশ্চয়তা না থাকায় অনেকেই ছাড়তে চান না পাহাড়। তাদের আশঙ্কা, একবার জায়গা ছেড়ে গেলে আর কখনো ফিরে আসতে পারবেন না।
৯ দিনেও বন্ধ হয়নি বৃষ্টি
কক্সবাজার আবহাওয়া অফিসের সহকারী আবহাওয়াবিদ মো. আব্দুল হান্নানের তথ্য অনুযায়ী, ৪ থেকে ১১ জুলাই পর্যন্ত ৮ দিনে কক্সবাজারে মোট ৮২৩ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয়েছে। এর মধ্যে ৫ জুলাই সর্বোচ্চ ২৪০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়। যা চলতি মৌসুমের অন্যতম সর্বোচ্চ দৈনিক বৃষ্টিপাত। এছাড়া ৬ জুলাই ১২৯ মিলিমিটার, ৮ জুলাই ১২৫ মিলিমিটার, ১১ জুলাই ১১৫ মিলিমিটার, ৯ জুলাই ৯৯ মিলিমিটার, ৭ জুলাই ৬৯ মিলিমিটার, ৪ জুলাই ২৮ মিলিমিটার এবং ১০ জুলাই ১৮ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়। অর্থাৎ ৮ দিনে দৈনিক গড়ে প্রায় ১০৩ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে। ১২ জুলাইও টানা নবম দিনের মতো বৃষ্টি অব্যাহত ছিল। আজ রবিবারে বৃষ্টিপাত চলমান থাকায় এ পরিমাপ চূড়ান্ত হিসাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।
প্রকৃতি নয়, দায় মানুষেরও
পরিবেশবিদদের মতে, কক্সবাজারের বর্তমান দুর্যোগকে শুধু প্রাকৃতিক বিপর্যয় বলে দায় এড়ানোর সুযোগ নেই। বন উজাড়, পাহাড় কাটা, সংরক্ষিত বনভূমি দখল, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, খাল-নালা ভরাট, রোহিঙ্গা সংকট এবং জলবায়ু পরিবর্তনের সম্মিলিত প্রভাব কক্সবাজারকে একটি মানবসৃষ্ট দুর্যোগ অঞ্চলে পরিণত করেছে।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) কক্সবাজারের সাংগঠনিক সম্পাদক এইচ এম নজরুল ইসলাম সতর্ক করেন, ভবিষ্যতে মোট বৃষ্টিপাত খুব বেশি না বাড়লেও স্বল্প সময়ে অতিভারী বৃষ্টির ঘটনা বাড়বে। অর্থাৎ প্রতিবছরই পাহাড়ধস ও আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি আরও বাড়বে।







