ক্লাসরুমের অভাবে এক কক্ষে দুই ক্লাস

সংকট মোকাবিলায় পড়ানো হচ্ছে দুই শিফটে। ছবি : আগামীর সময়
সময়ের সঙ্গে বদলেছে শিক্ষাব্যবস্থা। পাঠ্যতালিকায় যুক্ত হয়েছে নতুন অধ্যায়, নতুন বই। কিন্তু বদলায়নি কুষ্টিয়ার দৌলতপুরের অর্ধশতাধিক বিদ্যালয়ের জীর্ণদশা। বছরে বছরে শিক্ষার্থী বাড়লেও তৈরি হয়নি প্রয়োজনীয় ভবন। ঠায় দাঁড়িয়ে কঙ্কালসার বিল্ডিং; খসে পড়ছে পলেস্তারা, উঠে গেছে রঙ। সংকট মোকাবিলায় পড়ানো হচ্ছে দুই শিফটে। এতেও জায়গা সংকুলান না হওয়ায় একই কক্ষে পর্দা টাঙিয়ে নেওয়া হচ্ছে দুই শ্রেণির ক্লাস। আবার কোথাও কোথাও ফিরতে হয়েছে পরিত্যক্ত টিনশেডে। প্রচণ্ড গরমে ঘামে শরীর ভিজিয়েই পাঠ নিচ্ছে কোমলমতিরা। এসব কারণে বিদ্যালয়ের প্রতি অনীহা বাড়ছে ছাত্র-ছাত্রীদের। অন্যদিকে শিশুদের জীবন নিয়ে উদ্বেগে থাকছেন অভিভাবকরা।
নানা ঝুঁকি ও ভবন সংকটের কিছুটা আঁচ করা গেল শিক্ষার্থীদের ক্ষোভ ও শঙ্কাভরা মন্তব্যে। উপজেলার পিপুলবাড়িয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণির ছাত্র মো. আনাস বলল, ‘আমাদের স্কুল ভবনে অনেক সমস্যা। মাঝেমধ্যেই ভেঙে পড়ে ছাদের পলেস্তারাসহ বিভিন্ন অংশ। এ কারণে ক্লাসে মনোযোগ দেওয়া কঠিন। সবসময় আতঙ্কে থাকি। এজন্য বিদ্যালয়ে যেতে ভয় লাগে। ভবনটি নতুন করে তৈরি করলে আমরা নিরাপদে লেখাপড়া করতে পারব।’
উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, দৌলতপুরে ২১৭টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। এর মধ্যে নব্বইয়ের দশকে নির্মিত তিন কক্ষের অনেক ভবনই এখন ঝুঁকিপূর্ণ। পলেস্তারা খসে পড়ে ভবনগুলো জরাজীর্ণ ও পরিত্যক্ত হয়ে পড়েছে। কোথাও বিকল্প উপায়ে টিনের ঘর তৈরি করে ক্লাস নেওয়া হচ্ছে, আবার কোথাও আরও দু-তিন দশক আগে পরিত্যক্ত ঘোষণা করা টিনশেডেই চলছে পাঠদান। যেসব বিদ্যালয়ে সেই সুযোগও নেই, সেখানে পাঠকক্ষ ভাগাভাগি করে নেওয়া হচ্ছে।
সরেজমিনে সবচেয়ে আশঙ্কাজনক চিত্র দেখা গেছে উপজেলার তালবাড়িয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও চরআমলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। তীব্র শ্রেণিকক্ষ সংকটে পাঠদান অব্যাহত রাখতে চলছে প্রাণপণ লড়াই। এর মধ্যে তালবাড়িয়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শ্রেণিকক্ষের অভাবে একই রুমে একসঙ্গে নেওয়া হচ্ছে একাধিক শ্রেণির ক্লাস। মাঝে পর্দা টাঙিয়ে তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির পাঠদান একসঙ্গে হওয়ায় কোনটি কার পড়া সেটি নিয়ে বিপাকে পড়ছে কোমলমতিরা। দিতে পারছে না মনোযোগ। শিক্ষকরাও পড়েছেন বিপাকে, পড়াতে পারছেন না নির্বিঘ্নে।
বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী সাদিয়া ও জুনায়েদ জানাল, একই কক্ষে দুটি ক্লাস চলায় শিক্ষকদের কথা ঠিকমতো শোনা যায় না। অন্যপাশের ক্লাসের শব্দে তাদের পড়া বুঝতেও অনেক কষ্ট হয়।
বিড়ম্বনার কথা জানালেন বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক সুমি খাতুনও। তিনি বললেন, ‘কক্ষের সংকটে বাধ্য হয়েই আমাদের এভাবে পর্দা টাঙিয়ে ক্লাস নিতে হচ্ছে। একই সময়ে দুই শিক্ষকের পাঠদানের কারণে শব্দ মিশে যায়, যা নষ্ট করছে শিক্ষার্থীদের শেখার পরিবেশ।’
ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক হেলাল উদ্দিনের আক্ষেপ, স্কুলে শিক্ষার্থী ১০৮ জন। স্বাভাবিকভাবে একটি ক্লাসরুমে বসতে পারে ৩০ ছাত্রছাত্রী। দুই শ্রেণি একত্রে এককক্ষে পাঠদান করানো লাগে ৪০ থেকে ৪২ জনকে। এতে তাদের বসতে খুব কষ্ট হয়। পড়ালেখা সচল রাখতে অনিচ্ছা সত্ত্বেও এক রুমকে পর্দা দিয়ে দুই ভাগ করে পাঠদান চালাতে হচ্ছে। দ্রুত নতুন ভবন নির্মাণ না করলে শিক্ষার মান ধরে রাখা সম্ভব হবে না।
উপজেলার চরআমলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তিন কক্ষের মূল ভবনটির ছাদের পলেস্তারা খসে পড়ছে। এতে ঝুঁকির মধ্যে পাঠ নিচ্ছে শিক্ষার্থীরা। বাধ্য হয়ে আগের একটি পরিত্যক্ত টিনশেডে শিক্ষার্থীদের পাঠদান করাচ্ছেন শিক্ষকরা। এ ছাড়া পিপুলবাড়িয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভাঙাচোরা ভবনেই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নেওয়া হচ্ছে ক্লাস। পর্যাপ্ত স্থান না থাকায় বাধ্য হয়ে সিঁড়ি কক্ষকে অফিস রুম হিসেবে ব্যবহার করছেন শিক্ষকরা।
পিপুলবাড়িয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণির ছাত্রী মাহিয়া খাতুন বলছিল, ‘আমাদের স্কুল ভবন জরাজীর্ণ হওয়ায় ক্লাসরুমে ঠিকমতো বসতে পারি না। যেকোনো সময় ছাদের সিমেন্ট বা রড খুলে নিচে ভেঙে পড়তে পারে। সম্প্রতি ছাদের অংশ ভেঙে আমাদের এক বান্ধবীর গায়ে পড়েছে। এতে আঘাত পাওয়ায় তার মধ্যে বেশি আতঙ্ক বিরাজ করছে।’
বিদ্যালয়টির এক শিক্ষার্থীর অভিভাবক হিরা খাতুনের ক্ষোভ, ‘আমার দুই সন্তান এই স্কুলেই পড়াশোনা করছে। কিন্তু ক্লাসরুমগুলোর ভেতরের অবস্থা খুবই নাজুক ও জরাজীর্ণ। ছাদ ও দেয়াল যেভাবে ভেঙে পড়ছে, তাতে বাচ্চাদের স্কুলে পাঠিয়ে আমরা আতঙ্কে থাকি। কখন যে কোন বড় দুর্ঘটনা ঘটে যায়। এভাবে কি শিক্ষাব্যবস্থা চলতে পারে? দ্রুত নতুন ভবনের ব্যবস্থা না করলে শিশুদের স্কুলে পাঠানোই কঠিন হবে।’
জরাজীর্ণ ভবন ও শ্রেণিকক্ষ সংকটের কথা স্বীকার করলেন উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মোস্তাক আহম্মেদ। তার ভাষ্য, উপজেলায় ৫০-৬০টি বিদ্যালয় রয়েছে, যেখানে নতুন ভবন হয়নি এবং পুরাতন ভবনগুলো জরাজীর্ণ। এরই মধ্যে অনেক বিদ্যালয় পরিত্যক্ত ঘোষণা করে বিকল্প উপায়ে ক্লাস নেওয়া হচ্ছে। নব্বইয়ের দশকের তৈরি ভবনগুলো চিহ্নিত করে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে তালিকা পাঠানো হয়েছে। বরাদ্দ এলেই তৈরি করা হবে নতুন ভবন।



