ভেজা ধান না কেনায় সুনামগঞ্জের কৃষকের ক্ষতি ৪০০ কোটি টাকা

ছবি: আগামীর সময়
সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলে টানা বৃষ্টি ও অকাল বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের দুর্ভোগ চরমে পৌঁছেছে। জেলা খাদ্য বিভাগ সময়মতো ভেজা ধান কেনার উদ্যোগ নিলে এই ক্ষতির পরিমাণ অনেক কমানো যেত বলে দাবি করেছেন স্থানীয় কৃষকরা। তারা জানান, কাঁচা ধান কিছুটা কম দামে কিনে মিলারদের মাধ্যমে শুকানোর ব্যবস্থা করা যেত, কিন্তু প্রশাসনের উচ্চপর্যায়ে বারবার অনুরোধ সত্ত্বেও কোনো কার্যকরী পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। রোদ না থাকায় স্তূপ করে রাখা ধানে চারা গাজিয়ে নষ্ট হচ্ছে, অথচ মিলার বা ফড়িয়ারা এই ধান কিনছে না। কোথাও কোথাও নামমাত্র দামে অর্থাৎ মণপ্রতি পাঁচ-ছয়শ টাকায় ধান বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন নিরুপায় চাষিরা।
দেখার হাওরপাড়ের ইসলামপুর গ্রামের কৃষক আবু সালাম জানান, চার একর জমির ধান আধা-পাকা অবস্থায় কাটলেও বৃষ্টির কারণে তা শুকাতে পারেননি। অনেক ধানে চারা উঠে যাওয়ায় এখন কেউ তা কিনতে চাইছে না। তার মতে, সরকার যদি ৮০০ টাকা মণে ধান কিনে ভৈরব বা ব্রাহ্মণবাড়িয়ার চাতালগুলোতে শুকানোর ব্যবস্থা করত, তবে কৃষকরা অন্তত খরচের টাকাটা ফিরে পেত।
একই হাওরে ৩২ একর জমি চাষ করা আব্দুল্লা মিয়া বললেন, বাঁধ কেটে পানি নিষ্কাশন না করায় তার ১৬ একর জমি তলিয়ে গেছে। বাকি যেটুকু কেটেছিলেন, রোদের অভাবে তার বেশির ভাগ পচে গেছে। তিনি আক্ষেপ করে জানান, এপ্রিলের শেষে খাদ্য বিভাগ ৯০০ টাকা মণে ভেজা ধান কিনলে কৃষক ও সরকার কারোই লোকসান হতো না।
কৃষকদের এই সংকটে ছাতক উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা তৌফিক হোসেন খান গত ২৯ এপ্রিল জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক বরাবর একটি লিখিত প্রস্তাব পাঠান। চিঠিতে তিনি ধানের আর্দ্রতা ১৪ শতাংশের পরিবর্তে ১৮ থেকে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত শিথিল করে সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে ধান কেনার সুপারিশ করেন। তিনি উল্লেখ করেন, দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায় ধান শুকানো অসম্ভব হয়ে পড়েছে এবং শ্রমিক সংকটে কৃষকরা হাল ছেড়ে দিচ্ছেন। মিলারদের মাধ্যমে সরকারিভাবে ধান শুকানোর ব্যবস্থা করলে চাষিরা অন্তত ৮০ শতাংশ পরিপক্ক ধান দ্রুত কাটতে উৎসাহিত হতো। তবে এমন গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ জেলা ও আঞ্চলিক পর্যায়ের কর্মকর্তারা আমলে নেননি বলে অভিযোগ উঠেছে। এই প্রস্তাবের অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে চাইলে কৃষি কর্মকর্তা তৌফিক হোসেন খান বিষয়টি এড়িয়ে গিয়ে জানান, দুর্যোগ হঠাৎ আসায় সবাই ব্যস্ত ছিলেন।
এদিকে জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক বিএম মুশফিকুর রহমান এ ধরনের কোনো চিঠি পাওয়ার কথা অস্বীকার করেছেন। তিনি জানান, ধানের আর্দ্রতা সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত জাতীয়ভাবে নিতে হয়। জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মিনহাজুর রহমানও চিঠি না পাওয়ার দাবি করে জানান, মিলাররা কৃষকদের ভেজা ধান শুকানোর বিষয়ে মৌখিক প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানে ধান শুকানোর সুযোগ দেওয়ার কথা জানানো হয়েছিল।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মোহাম্মদ ওমর ফারুকের তথ্যমতে, জেলায় এ বছর ২০ হাজার ১৬০ হেক্টর জমি আক্রান্ত হয়েছে, যার মধ্যে ১৬ হাজার ৪০১ হেক্টর জমির ফসল সম্পূর্ণ নষ্ট হয়েছে। এই বিপুল ক্ষয়ক্ষতির আর্থিক মূল্য প্রায় সাড়ে তিনশ থেকে চারশ কোটি টাকা। বর্তমানে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক পরিবারের তালিকা তৈরির কাজ চলছে।




