নির্বাচন পরবর্তী সহিংসতা
বোয়ালমারীতে ৩৪ বাড়ি ভাঙচুর, লুট, আহত ২০

ছবিঃ আগামীর সময়
ফরিদপুরের বোয়ালমারী উপজেলার পরমেশ্বরদী ইউনিয়নের ময়েনদিয়া ও পরমেশ্বরদী গ্রামে নির্বাচন পরবর্তী পৃথক সহিংসতায় ৩৪টি বাড়িতে ব্যাপক ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে। এ ঘটনায় বাধা দিতে গিয়ে কমপক্ষে ২০ জন আহত হয়েছেন। খবর পেয়ে, সেনাবাহিনী, বিজিবি ও পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে সাউন্ড বোমা ও রাবার বুলেট ও লাঠিচার্জ করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে। শনিবার (১৪ ফেব্রুয়ারি) সকাল ৮ থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত ময়েনদিয়া ও পরমেশ্বরদী গ্রামে এসব সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।
পুলিশ সূত্রে জানা যায়, সকাল সাড়ে ৮টার দিকে পার্শ্ববর্তী সালথা উপজেলার খারদিয়া গ্রামের বিএনপি নেতা মুশফিক বিল্লাহ জিহাদের সমর্থকরা দেশীয় অস্ত্র সজ্জিত হয়ে ময়েনদিয়া বাজারে আধিপত্য বিস্তারের লক্ষ্যে সংঘবদ্ধ আক্রমণ চালায়। আক্রমণকারীরা প্রতিপক্ষের অন্তত ৩টি বসতবাড়িতে অগ্নিসংযোগ করে ও ১০টি বাড়িঘরে ভাঙচুর ও লুটপাট চালায়। এ সময় মসজিদসহ বেশ কয়েকটি বাড়ি লক্ষ্য করে পেট্রোল বোমা ও ককটেলের বিস্ফোরণ ঘটানো হয়।
এ ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্তরা হলেন— ময়েনদিয়া গ্রামের দেলোয়ার মহলদার, জাকির খান, খোকন মহলদার, রাজ্জাক মহলদার, হাসিব খান, আলামিন শিকদার, মুরসালিম শিকদার, ফরিদ মুন্সী, সাগর মিয়া, বিল্লাল, নুর ইসলাম ও শাওন তালুকদার।
অপরদিকে পরমেশ্বরদী চরপাড়া ও কাজীপাড়ায় পূর্ব শত্রুতার জের ধরে ও নির্বাচনে দাঁড়িপাল্লা এবং ফুটবল প্রতীকে ভোট দেওয়াকে কেন্দ্র করে ২০টি বাড়িতে আক্রমণ চালায় প্রতিপক্ষ। ভেঙে ফেলা হয় পাকা দেয়াল, বারান্দা, দরজা-জানালা। আক্রান্ত বাড়িগুলোয় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে ধান, চাল, নানা ফসল, আসবাবপত্র, বিছানা, লেপ, তোশক, জামা-কাপড়। ভেঙে তছনছ করা হয়েছে বৈদ্যুতিক মিটার, টিভি-ফ্রিজ ইলেক্ট্রনিক সামগ্রী।
ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সদস্যরা জানান, হামলাকারীরা হঠাৎ করেই দেশীয় অস্ত্র নিয়ে বাড়িতে ঢুকে ভাঙচুর ও লুটপাট চালায়। গরু বাছুরসহ মূল্যবান জিনিসপত্র লুট করে নিয়ে গেছে তারা। এতে ক্ষতিগ্রস্তরা হলেন— পরমেশ্বরদী চরপাড়ার মোকসেদ শেখের ছেলে মাসুদ শেখ, হারুন শেখ, রুবেল শেখ, খোরশেদ শেখের ছেলে রাসেল শেখ, সোহেল শেখ, ওলিয়ার শেখের ছেলে ফয়সাল শেখ, ফরিদ উদ্দিন, খলিল মিয়া, শিপন শেখ, ইব্রাহিম, রিপন মিয়া, সুজন মিয়া, জামাল হোসেন, কামাল হোসেন, রজো, সাজ্জাদ হোসেন ও আকমল মোল্যা।
স্থানীয়রা জানান, সালথা উপজেলার খারদিয়া এলাকার বিএনপি নেতা মুশফিক বিল্লাহ জিহাদ মিয়ার সমর্থকদের সাথে পরমেশ্বরদী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আব্দুল মান্নান ও তার সমর্থকদের মধ্যে দীর্ঘদিন যাবত বিরোধ চলে আসছিল। আজ সেই বিরোধ সংঘাতে রূপ নেয়।
সরেজমিনে জানা যায়, নির্বাচন পরবর্তী ময়েনদিয়া বাজারের আধিপত্য বিস্তার নিয়ে এ সংঘর্ষের সূত্রপাত। বিগত সরকারের আমলে উপজেলার পাট ও পেঁয়াজের বৃহৎ বাণিজ্যিক কেন্দ্র ময়েনদিয়া বাজার ও আশপাশের এলাকার নিয়ন্ত্রণ করতেন ইউনিয়ন চেয়ারম্যান এবং সম্প্রতি বিএনপিতে যোগদানকারী আওয়ামী লীগ নেতা আব্দুল মান্নান মাতুব্বর। ৫ আগস্টের পর তিনি গা-ঢাকা দিলে বাজারটি নিয়ন্ত্রণ করে পার্শ্ববর্তী উপজেলার খারদিয়া গ্রামের বিএনপি নেতা মুশফিক বিল্লাহ জিহাদের ছত্রছায়ায় যুবদল নেতা সজিব।
সংশ্লিষ্টরা জানান, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আব্দুল মান্নান মাতুব্বর বিএনপিতে যোগ দেন। অপর দিকে জিহাদ মিয়ার সমর্থক গোষ্ঠী ধানের শীষের বিপরীত স্বতন্ত্র প্রার্থী আবুল বাসার খাঁনের ফুটবল প্রতীকে ও একটি অংশ জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীকে সমর্থন দিয়ে ভোটের মাঠে লড়াই করেন। ফরিদপুর-১ আসনে জামায়াতে ইসলামী মনোনীত প্রার্থী জয় পেলেও সারাদেশে বিএনপির জয়ের পর দুই গ্রুপের মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। তবে দুটি পক্ষের সাথে একাধিক বার যোগাযোগের চেষ্টা করেও অভিযুক্তদের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
স্থানীয়রা জানিয়েছেন, সংঘর্ষের পর থেকে পুরো এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। আতঙ্কে অনেক পরিবার ঘরবাড়ি ছেড়ে আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছে। পুনরায় সংঘর্ষ এড়াতে প্রশাসন স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সঙ্গে বৈঠক করার উদ্যোগ নিয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
ফরিদপুর জেলা পুলিশের সহকারী পুলিশ সুপার মো. আজম খান বলেন, গতরাতে খবর পেয়ে আমরা ময়েনদিয়াতে অবস্থান নিই। সকালে খারদিয়া বাহিনী অতর্কিত গ্রামের দিকে আক্রমণ করে। পুলিশ ও সেনাবাহিনী দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। এ ঘটনায় কয়েকজনকে আটক করা হয়েছে এবং দেশীয় অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এ ঘটনায় এখনো পর্যন্ত কোনো মামলা দায়েরের তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।



