রংপুর থেকে ঢাকাগামী বাসের যাত্রীরা বিড়ম্বনায়

ছবি: আগামীর সময়
বাসের টিকিট না পাওয়ায় কর্মস্থলে ফিরে যেতে পারছেন না রংপুরে ঈদ করতে আসা হাজারো মানুষ। এছাড়া রংপুর-ঢাকা রুটে বাসের টিকেটের দাম বাড়ানো হয়েছে দ্বিগুণেরও বেশি। ঈদ ঘিরে কোনো নিয়ম নীতি না থাকায় যাত্রীরা বাসের কাউন্টারগুলোর কর্মচারীদের কাছে হয়ে পড়েছেন জিম্মি।
ঢাকায় ফিরতে সাধারণ বাসের অগ্রিম টিকিট বিআরটিএ কর্তৃক নির্ধারিত ৯১০ টাকার স্থলে কালোবাজারে কমপক্ষে ১২০০ থেকে ১৫০০ টাকায় হচ্ছে বিক্রি। এছাড়া বিলাসবহুল গাড়ির ক্ষেত্রেও বাস মালিকরা ঈদ পরবর্তী ১০ দিন ভাড়া বাড়িয়ে দিয়েছেন।
পুরনো এসি বাসের টিকিট ১০০০ টাকার স্থলে ২০০০ টাকা এবং ১৫০০ টাকার হুন্দাই বাসের টিকিট করা হয়েছে ২৪০০ টাকা এবং অত্যাধুনিক নতুন গাড়িগুলোর ভাড়া করা হয়েছে ৩০০০ টাকা
কাউন্টারগুলোতে ঝোলানো টিকিটের মূল্য তালিকায় দেখা যায়, পুরনো এসি বাসের টিকিট ১০০০ টাকার স্থলে ২০০০ টাকা এবং ১৫০০ টাকার হুন্দাই বাসের টিকিট করা হয়েছে ২৪০০ টাকা এবং অত্যাধুনিক নতুন গাড়িগুলোর ভাড়া করা হয়েছে ৩০০০ টাকা। যা সাধারণ যাত্রীদের সাধ্যের বাইরে। আজ শুক্রবার ও শনিবার সাধারণ বাসের কোনো টিকিট মিলছে না কাউন্টার থেকে। তবে কাউন্টারের বাইরে কালোবাজারে দ্বিগুণ টাকায় টিকিট কিনতে হচ্ছে যাত্রীদের।
আজ সকালে রংপুর নগরীর কামারপাড়াস্থ ঢাকা কোচস্ট্যান্ডে বিভিন্ন বাস কাউন্টারে চরম নৈরাজ্যকর অবস্থা লক্ষ করা গেছে। যাত্রীদের অভিযোগ, বেশিরভাগ কাউন্টারে টিকিট বিক্রি না করে কালোবাজারে বিক্রির মাধ্যমে যাত্রীদের জিম্মি করে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
ভোরবেলা কাউন্টারে এসে টিকিট পাওয়ার আশায় অপেক্ষা করতে দেখা গেছে অনেক যাত্রীকে। ঢাকায় একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা এনামুল হক স্ত্রীসহ ঈদ করতে রংপুরে এসেছিলেন। এখন বাসে ঢাকায় ফেরার টিকিট পাচ্ছিলেন না। অথচ সব ছুটি শেষ করে শনিবার তাকে কর্মস্থলে যোগদান করতেই হবে। সবগুলো বাস কাউন্টারে ঘুরেও মেলেনি টিকিট। বাধ্য হয়ে তিনি শ্যামলী পরিবহনের দুটি টিকিট কালোবাজারে ৩০০০ টাকায় কিনে সকাল ১০টার গাড়িতে ওঠেন। যদিও সাধারণ বাসের প্রতিটি টিকিটের মূল্য ৯১০ টাকা।
এনামুল বললেন, ঈদের পর ঢাকায় ফিরতে অনলাইনে কোনো বাসের টিকিট মিলছে না। সকাল ৮টায় কোচস্ট্যান্ডে এসেও কোনো বাসের টিকিট মেলেনি। কাউন্টার থেকে জানানো হচ্ছে শনিবার পর্যন্ত অগ্রিম টিকিট শেষ হয়েছে। অথচ নির্ধারিত সময়ে বাস ছাড়ার প্রাক্কালে কাউন্টারের বাইরে দ্বিগুণ দামে কালোবাজারে টিকিট মিলছে।
এসআর ট্রাভেলসের কাউন্টারে গাড়ির অপেক্ষায় বসে থাকা জেসমিন আক্তার বললেন, ‘ঈদ করতে এসে বিপাকে পড়েছি। ছেলের কলেজ খুলবে রবিবার। কিন্তু শনিবার পর্যন্ত কোনো বাসের টিকিট মিলছে না ‘
একই ধরনের কথা জানান এনা পরিবহনের কাউন্টারে অপেক্ষমান ঢাকাগামী যাত্রী হালিমা বেগম ও নয়নতারা।
ঈদের পর রংপুর থেকে ঢাকাগামী এসআর ট্রাভেলস, শাহ আলী পরিবহন, হানিফ এন্টারপ্রাইজ, আগমনী এক্সপ্রেস, নাবিল পরিবহন, শ্যামলী পরিবহন, শাহ ফতেহ আলী পরিবহন, এনা পরিবহনসহ কোনো গাড়ির কাউন্টারেই টিকিট মিলছে না বলেও জানান তারা।
এ ব্যাপারে নাবিল পরিবহনের কাউন্টার ম্যানেজার সাখাওয়াত হোসেন বললেন, ‘শনিবার পর্যন্ত সাধারণ বাসের টিকিট নাই এটা ঠিক, তবে এসি বাসের টিকিট থাকলেও ঈদ উপলক্ষে মালিক পক্ষ দাম বাড়িয়েছে। আমাদের কিচ্ছু করার নাই।’
বর্ধিত দাম কাউন্টারের নোটিশ বোর্ডে টাঙানো হয়েছে বলেও জানান সাখাওয়াত।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, রাজধানী ঢাকাসহ আশে পাশের এলাকায় রংপুরের প্রায় চার লাখ মানুষ লেখাপড়া, চাকরি, ব্যবসাসহ বিভিন্ন পেশায় নিয়োজিত রয়েছেন। তাদের অর্ধেকই বিভিন্ন গার্মেন্টসে কর্মরত নারী শ্রমিক। ঈদের সময় এই বিপুল সংখ্যক মানুষ স্বজনদের সঙ্গে ঈদ উদযাপন করতে রংপুরে আসেন। কিন্তু ঈদের পর তাদের কর্মস্থলে ফিরে যেতে পড়তে হয় চরম বিড়ম্বনায়। এবারও ঈদের পর ঢাকায় ফিরে যাওয়া যাত্রীদের দুর্ভোগে পড়তে হয়েছে।
যাত্রীদের অভিযোগ, প্রতি বছর ঈদের পর রংপুর থেকে ঢাকায় যাওয়ার অগ্রিম টিকিট বিক্রি হলেও এবারে ঈদের অনেক আগেই বাসের কাউন্টারগুলোতে কোনো টিকিট নেই বলে ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। তার ওপর টিকিটের দাম বাড়ানো হয়েছে দ্বিগুণ।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, রংপুরের কামারপাড়াস্থ ঢাকা কোচস্ট্যান্ড থেকে ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেটসহ দেশের বড় বড় শহরগুলোতে প্রতিদিন দুই শতাধিক এসি-ননএসি বাস চলাচল করে। ঈদ শেষে ফিরে যাওয়ার জন্য টিকিট না পেয়ে চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন যাত্রীরা।
ঈদের পরে যাত্রীদের চাপ বেশি থাকে, অনেক ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সময়ে ঢাকা থেকে বাস এসে না পৌঁছানোর কারণে রংপুর থেকে ছেড়ে যেতেও দেরি হচ্ছে- মো. শফি
এসআর পরিবহনের কাউন্টার ম্যানেজার মো. শফি জানান, ঈদের পরে যাত্রীদের চাপ বেশি থাকে, অনেক ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সময়ে ঢাকা থেকে বাস এসে না পৌঁছানোর কারণে রংপুর থেকে ছেড়ে যেতেও দেরি হচ্ছে।
এনা পরিবহনের সুপারভাইজার লিমন মিয়া জানান, প্রতি ঈদে এমনিতে যাত্রী পরিবহনে হিমশিম খেতে হয়। তার ওপর অগ্রিম টিকিট অনেক আগে বিক্রি হয়ে যাওয়ায় হঠাৎ আসা যাত্রীরা কিছুটা বিড়ম্বনায় পড়েছেন। শনিবার পর্যন্ত কোনো গাড়িরই টিকিট নেই। তবে কালোবাজারে দ্বিগুণ বাসের ভাড়া প্রসঙ্গে সদুত্তোর দিতে পারেননি তিনি।
এ ব্যাপারে যোগাযোগ করা হলে এসআর ট্রাভেলসের মালিক গোলাম মোহাম্মদ সিরাজের পক্ষে তার ম্যানেজার আব্দুস সোবহান জানান, ঈদের সময় গাড়ি ভাড়া কিছুটা বাড়ে তা ঠিক। কিন্তু অগ্রিম টিকিট আগেই বিক্রি হয়ে গেলে কারো কিছু করার থাকে না।
এ ব্যাপারে যোগাযোগ করা হলে বিআরটিএ রংপুরের সহকারী পরিচালক শফিকুল আলম সরকার জানান, শুধু সাধারণ পরিবহন (নন এসি) গাড়ির টিকিটের মূল্য (রংপুর-ঢাকা) ৯১০ টাকা নির্ধারণ করেছে সরকার। যাত্রী সাধারণের হয়রানি ঠেকাতে বিএরটিএ নিয়মিত মনিটরিং করছে, বসানো হচ্ছে ভ্রাম্যমাণ আদালত। নির্ধারিত দামের বেশি নেওয়ার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে অবশ্যই ব্যবস্থা নেবে বিআরটিএ। এছাড়া বিলাসবহুল গাড়ির টিকিটের মূল্য নির্ধারণ করে মালিক সমিতি। সেখানেও বেশি দাম রাখার বিষয়টি দেখা হবে বলে জানান তিনি।






