টেকনাফ-উখিয়ায় ২০ লাখ মানুষের নিরাপত্তায় ১৮৩ পুলিশ
- এক পুলিশ সদস্যের কাঁধে ১১০০০ মানুষের নিরাপত্তার দায়িত্ব
- মাসে ১৫০টির বেশি মামলা টেকনাফে
- জনবল সংকটে দিতে পারছে না তাৎক্ষণিক সাড়া

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
দিনেদুপুরে সড়কে ব্যারিকেড দিয়ে যাত্রীবাহী বাস থামিয়ে টাকা লুট, বাজার থেকে অস্ত্রের মুখে মানুষ অপহরণ করে পাহাড়ে নিয়ে মুক্তিপণ দাবি— কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফে নিয়মিত ঘটছে এমন অপরাধ। সীমান্ত ও পাহাড়ি এলাকায় বাড়ছে মাদক-অস্ত্র, চোরাচালান, মানব পাচার, চাঁদাবাজি ও ছিনতাইও। অথচ এসবের নিয়ন্ত্রণে তেমন ভূমিকাই রাখতে পারছে না পুলিশ। প্রায় সোয়া ২০ লাখ মানুষের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা মাত্র ১৮৩ পুলিশ সদস্যকে হিমশিম খেতে হচ্ছে।
জেলা পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, উখিয়া ও টেকনাফে স্থানীয় বাসিন্দা ৫ লাখ ৯৬ হাজার ৯৮৩ জন। ওই দুই উপজেলার ক্যাম্পে আছে প্রায় ১৪ লাখ রোহিঙ্গা। এর বাইরে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে বসবাস করছে অন্তত ১ লাখ ১৩ হাজার রোহিঙ্গা। সব মিলিয়ে ৬৫০ দশমিক ৪৮ বর্গকিলোমিটারের দুই উপজেলায় ২০ লাখের বেশি মানুষের নিরাপত্তায় রয়েছেন ১৮৩ পুলিশ সদস্য। অর্থাৎ গড়ে একজন পুলিশ সদস্যকে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হচ্ছে ১১ হাজারের বেশি মানুষের।
উখিয়া থানায় রয়েছেন দুই ইন্সপেক্টর, ১০ এসআই, ১০ এএসআই ও ৩৫ কনস্টেবল। ইনানী পুলিশ ফাঁড়িতে একজন এসআই, দুজন এএসআই ও পাঁচ কনস্টেবল এবং বালুখালী ফাঁড়িতে একজন এসআই, একজন এএসআই ও ছয় কনস্টেবল দায়িত্ব পালন করছেন। টেকনাফ থানায় চার ইন্সপেক্টর, ১৭ এসআই, ১৮ এএসআই ও ৭০ কনস্টেবল রয়েছেন। এর মধ্যে শামলাপুর তদন্ত কেন্দ্রে দায়িত্ব পালন করছেন ১৬, হোয়াইক্যং ফাঁড়িতে ১০ এবং সেন্টমার্টিন তদন্ত কেন্দ্রে ১০ জন। রোহিঙ্গা ক্যাম্পে অবশ্য আলাদা জনবল রয়েছে এপিবিএনের।
টেকনাফের সাত ক্যাম্পে দায়িত্ব পালন করছেন ১৬ এপিবিএনের ৪৬৩ জন, উখিয়ার ১১ ক্যাম্পে ৮ এপিবিএনের ৪৫০ এবং ১৪ এপিবিএনের ৪৫০ জন।
পুলিশের সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, টেকনাফ থানায় প্রতি মাসে রেকর্ড হয় ১৫০টির বেশি মামলা। একজন তদন্ত কর্মকর্তাকে একই সময়ে তদন্ত করতে হচ্ছে ৪০ থেকে ৪৫টির বেশি মামলা। এর সঙ্গে রয়েছে ওয়ারেন্টভুক্ত আসামি গ্রেপ্তার, ঘটনাস্থল পরিদর্শন, সাক্ষ্যগ্রহণ ও তদন্ত প্রতিবেদন তৈরির কাজও।
নাম প্রকাশে অনাগ্রহী টেকনাফ থানার এক পুলিশ কর্মকর্তা জানাচ্ছিলেন তার অভিজ্ঞতার কথা। তার ভাষ্য, ১২ বছরের পেশাজীবনে একসঙ্গে এত বেশি মামলার চাপ দেখেননি তিনি। বর্তমানে একাই মাসে ২০টি মামলা তদন্ত করছেন। তিনি বলছেন, এত কম জনবল দিয়ে আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ করা অত্যন্ত কঠিন।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, দুর্গম এলাকায় অপরাধ, গোলাগুলি বা দুর্ঘটনা ঘটলে নিশ্চিত করা কঠিন দ্রুত পুলিশের উপস্থিতি। ৯৯৯-এ ফোন করেও পাওয়া যায় না দ্রুত সহায়তা।
তবে পুলিশের দাবি, সীমিত জনবল ও বিস্তীর্ণ কর্ম এলাকার কারণে একই সময়ে বিভিন্ন স্থানে অভিযান ও টহল চালাতে গিয়ে সম্ভব হয় না জরুরি ঘটনায় দ্রুত পৌঁছানো।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানের সহকারী অধ্যাপক ও পিএইচডি গবেষক সারওয়ার আলম সিকদারের ভাষ্য, শুধু পুলিশ বাড়ালেই হবে না; উখিয়া-টেকনাফে প্রয়োজন প্রযুক্তিনির্ভর ও সমন্বিত নিরাপত্তাব্যবস্থা। সীমান্ত ও গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় সিসিটিভি, ড্রোন, স্বয়ংক্রিয় নম্বরপ্লেট শনাক্তকরণ, অপরাধের তথ্য বিশ্লেষণ ও জিপিএসনির্ভর টহল চালুর পাশাপাশি অতিরিক্ত থানা-ফাঁড়ি, আইনশৃঙ্খলা টাস্কফোর্স এবং সংশ্লিষ্ট বাহিনীগুলোর মধ্যে দ্রুত গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদানের পরামর্শ দেন তিনি।
১৪ এপিবিএনের অ্যাডিশনাল ডিআইজি ও কমান্ডিং অফিসার মোহাম্মদ সিরাজ আমিন আগামীর সময়কে জানালেন, রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বিশাল জনগোষ্ঠীর তুলনায় রয়েছে জনবল সংকট। আরও জনবল এবং একটি ব্যাটালিয়ন বাড়ানোর প্রস্তাব ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে উল্লেখ করে তার দাবি, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর অপরাধ অনেক কমেছে ক্যাম্পে। তবে অপরাধ দমনে নিয়মিত অভিযান ও নজরদারি চলছে জানিয়ে রোহিঙ্গা সমস্যার স্থায়ী সমাধান নিরাপদ এবং শান্তিপূর্ণ প্রত্যাবাসনের মধ্যেই নিহিত বলেও মন্তব্য করেন মোহাম্মদ সিরাজ আমিন।
উখিয়া-টেকনাফে পুলিশের বর্তমান জনবল পর্যাপ্ত নয়— অভিযোগ কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অর্থ) মোহাম্মদ সামীম কবীরের। তার ভাষ্য, রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী, অপরাধ, মেরিন ড্রাইভে পর্যটকের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় অস্ত্রধারীদের বিরুদ্ধে অভিযান— সব মিলিয়ে বেড়েছে নিরাপত্তার দায়িত্ব। জনবল সংকটের কারণে নিয়মিত অভিযান ও তদন্তে জটিলতা তৈরি হচ্ছে। ফলে কচ্ছপিয়া, হোয়াইক্যং ও ইনানীতে নতুন তদন্ত কেন্দ্র স্থাপনের প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে বলেও জানালেন তিনি।



