যে ভেলায় ভাসে সীমান্তের লাশ

ওপাড়ে বিএসএফের গুলিতে নিহত বাংলাদেশিদের মরদেহ ভেলায় তুলে নিজের নৌকার সঙ্গে বেঁধে বাংলাদেশের সীমানায় নিয়ে আসেন আব্দুর রহমান। ছবি: আগামীর সময়
সীমান্তে গুলির শব্দ থেমে গেলেই শুরু হয় একটি কঠিন দায়িত্ব। ওপারে পড়ে থাকা বাংলাদেশির মরদেহ আনতে হবে ফিরিয়ে। দায়িত্বটি সরকারের দেওয়া নয়। তবুও দুই দশক ধরে মানবিক দায়বোধ থেকে এই কাজ করছেন ঠাকুরগাঁওয়ের আব্দুর রহমান।
ঠাকুরগাঁওয়ের রাণীশংকৈল উপজেলার ধর্মগড় সীমান্তে মরদেহ উদ্ধারের প্রয়োজন হলেই সবার আগে তার নাম মনে পড়ে বিজিবি ও স্থানীয়দের।
ধর্মগড় ইউনিয়নের জগদল এলাকায় বাড়ি আব্দুর রহমানের। জগদল রাজবাড়ীর সামনে ছোট একটি দোকান চালান তিনি। সরকারি খাসজমিতে তোলা ছোট বাড়িতে স্ত্রী ও দুই ছেলেকে নিয়ে তার সংসার। সাধারণ এই জীবনের আড়ালে রয়েছে ২০ বছরের এক অনন্য অভিজ্ঞতা গল্প।
রহমান জানিয়েছেন, প্রায় ২০ বছর আগে জগদল সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে নিহত হন এরশাদ নামে এক বাংলাদেশি। তার দেহ পড়ে ছিল শূন্যরেখায়। আইনি জটিলতা, সীমান্ত উত্তেজনা ও আতঙ্কে মরদেহ আনতে যাচ্ছিল না কেউ। তখন নিহতের স্বজনদের আহাজারি নাড়া দেয় তাকে।
সেদিনই প্রথম তিনি মরদেহ ফিরিয়ে আনতে যান। এরপর থেকে সীমান্তবর্তী নদী বা জলাশয়ে কোনো বাংলাদেশির মরদেহ উদ্ধারের প্রয়োজন হলেই ডাকা হয় তাকে।
মরদেহ উদ্ধারে একটি বিশেষ পদ্ধতি অনুসরণ করেন তিনি। কলাগাছ কেটে তৈরি করেন একটি মজবুত ভেলা। তাতে দেহ তুলে নিজ নৌকার সঙ্গে বেঁধে নিয়ে আসেন বাংলাদেশের সীমানায়। আইনি প্রক্রিয়া শেষে মরদেহ হস্তান্তর করা হয় স্বজনদের কাছে।
মরদেহ উদ্ধারের পাশাপাশি আব্দুর রহমান বিজিবির পক্ষে সীমান্তে পতাকা বৈঠকের বার্তাসহ বহন করেন বিভিন্ন আনুষ্ঠানিক যোগাযোগের চিঠিপত্রও।
দীর্ঘ ২০ বছরের অভিজ্ঞতায় সীমান্তের অসংখ্য ট্র্যাজেডির সাক্ষী হয়েছেন তিনি। তার ভাষ্য, সীমান্তে নিহতদের বেশিরভাগই পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। কেউ কৃষক, কেউ খেতমজুর, কেউ জেলে, আবার কেউ গরুর রাখাল। তাদের মৃত্যুর পর অনিশ্চয়তা ও অভাবের মধ্যে পড়ে পরিবারগুলো।
তিনি বলেছেন, ‘সীমান্তে হত্যার ঘটনায় কার্যকর বিচার না হওয়ায় মানুষের মধ্যে তৈরি হয়েছে হতাশা। একই সঙ্গে নিহতদের পরিবারের পুনর্বাসন ও আর্থিক সহায়তায় আরও সক্রিয় ভূমিকা প্রয়োজন রাষ্ট্রের।’
বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে বাংলাদেশি নিহতের ঘটনা আলোচনায় আসে প্রায়ই। উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে সীমান্ত হত্যা শূন্যে নামিয়ে আনার দেওয়া হয় প্রতিশ্রুতিও। সীমান্ত এলাকার মানুষের মতে, বাস্তবে তার প্রতিফলন দেখা যায় না খুব একটা।
নিজের ছোট দোকানে বসে এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে আব্দুর রহমান বলেছেন, ‘২০ বছর ধরে এই কাজ করছি। এখন শুধু চাই, সীমান্তে আর কোনো মায়ের বুক খালি না হোক। আমার তৈরি কলাগাছের ভেলায় যেন আর কোনোদিন কোনো মানুষের লাশ টানতে না হয়।’





