বরিশালে সমবায় সমিতির নিবন্ধন বাতিলের হিড়িক

ছবি : এআই
নানা অনিয়ম ও কার্যক্রম না থাকায় বরিশাল বিভাগে ১৬৪টি সমবায় সমিতির নিবন্ধন বাতিল করেছে সমবায় কার্যালয়।
২০২৫ সালের জুলাই থেকে চলতি বছরের জুন পর্যন্ত এসব সমিতির নিবন্ধন বাতিল করা হয়।
একই সময়ে বিভাগজুড়ে আরও প্রায় ২২০টি সমবায় সমিতিকে নিবন্ধন বাতিলের সম্ভাব্য তালিকায় রাখা হয়েছে।
বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন বরিশাল বিভাগীয় সমবায় কার্যালয়ের যুগ্ম নিবন্ধক (ভারপ্রাপ্ত) আতিকুল ইসলাম।
তিনি জানান, সমবায় সমিতিগুলোর ওপর জোরালো অডিট ও নজরদারি চালানো হচ্ছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে অসাধু ও নিষ্ক্রিয় সমবায় সমিতিগুলোর নিবন্ধন বাতিল করা হচ্ছে।
বরিশাল বিভাগীয় সমবায় কার্যালয়ের মহিলা পরিদর্শক বীনা পানি হালদার জানান, গত বছরের জুলাই থেকে চলতি বছরের জুন পর্যন্ত বরগুনায় ৪৩টি, বরিশালে ৪০টি এবং পিরোজপুরে ৮১টি সমবায় সমিতির নিবন্ধন বাতিল করা হয়েছে। এছাড়া ঝালকাঠিতে ৫০ থেকে ৬০টি, বরিশালে ৩০টি, পটুয়াখালীতে ২০টি, বরগুনায় ৬০টি এবং ভোলায় ৫০টি সমবায় সমিতি নিবন্ধন বাতিলের তালিকায়।
তিনি বললেন, ‘এসব সমবায় সমিতি শুধু নামে রয়েছে, কোনো কার্যক্রম নেই। কোনো গ্রাহকও নেই। এগুলোর মাধ্যমে গ্রাহক ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাই নিবন্ধন বাতিল করা হয়েছে। আরও প্রায় ২২০টি সমিতি নিবন্ধন বাতিলের সম্ভাব্য তালিকায় রয়েছে।’
বীনা পানি হালদার আরও জানান, বরিশাল বিভাগের ৩৫১টি সমবায় সমিতিকে অবসায়নে ন্যস্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে বরিশাল জেলায় ৩৫০টি এবং পিরোজপুরে একটি। এসব সমিতি পুরোপুরি সমবায় কার্যালয়ের নজরদারিতে। গ্রাহকদের অর্থ ফেরত দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে। গ্রাহকদের দেনা-পাওনা পরিশোধের পর এসব সমিতির আইনি অস্তিত্ব সম্পূর্ণভাবে বিলুপ্ত করার চূড়ান্ত প্রক্রিয়া চলছে।
বরিশাল বিভাগীয় সমবায় কার্যালয়ের যুগ্ম নিবন্ধক (ভারপ্রাপ্ত) আতিকুল ইসলাম বলেছেন, ‘বরিশাল বিভাগে বর্তমানে ৬ হাজার ৭৮৩টি সমবায় সমিতি রয়েছে। এর মধ্যে বরগুনায় ৭৪৫টি, বরিশালে ১ হাজার ৮০৬টি, ভোলায় ১ হাজার ৪৫১টি, ঝালকাঠিতে ৫৩৩টি, পটুয়াখালীতে ১ হাজার ২৭৬টি এবং পিরোজপুরে ৯৭২টি। আমাদের নজরদারি সব সমবায় সমিতিতেই রয়েছে। আমাদের কর্মকর্তারা অডিটও করেন, তবে আমি বলব সমস্যাটা সেখানেই। আমাদের মধ্যে যেমন সবাই সৎ লোক নয়, তেমনি যারা সমবায় সমিতি খোলেন, তারাও সবাই সৎ নয়।’
তিনি উদাহরণ দিয়ে বললেন, ‘সম্প্রতি বরিশাল বিভাগের মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত সমবায় সমিতি পিরোজপুরের নেছারাবাদে ‘আরামকাঠি সঞ্চয় ও ঋণদান সমিতি’।
৫২ কোটি টাকার গ্যাড়াকলে পড়ে গেছে এই সমবায় সমিতি। এর মালিক কিন্তু পালায়নি, তিনি জেল খেটেছে। আমাদের সঙ্গে যোগাযোগও রেখেছে। তার ৫২টি জমির দলিল আমরা জব্দ করেছি। তাছাড়া তার গরুর ফার্মসহ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানও রয়েছে, যা এই সমবায় সমিতির অর্থে করা হয়েছে।’
আতিকুল ইসলাম বলেন, ‘এই সমবায় সমিতির মালিক আটকে গেছেন বড় অংকের সুদ দিতে গিয়ে। তিনি গ্রাহকদের কাছ থেকে ১ লাখ টাকা নিয়ে মাসে ৫ হাজার বা ১০ হাজার টাকা সুদ দিতেন। তার সমিতিতে অনেক মানুষ টাকা লগ্নি করত। কিন্তু এই টাকা মালিক রহমতুল্লাহ লস প্রজেক্টে ইনভেস্ট করেছে। এখন তার জমি বিক্রি করে যে গ্রাহকদের অর্থ আমরা ফিরিয়ে দেব, সেই সুযোগও নেই। কেননা তিনি যে জমিগুলো কিনেছেন, সেগুলোর দাম উঠছে না।’
‘অন্যদিকে এই সমিতি থেকে যারা লোন নিয়েছেন, তারাও লোন পরিশোধ না করার বিশাল সুযোগ পেয়ে গেছেন। তারাও এই সমবায় সমিতি বন্ধ করে দেওয়ার জন্য দাবি তুলছেন। সমিতি বন্ধ করে দিলে তো গ্রাহকদের অর্থ আমরা পরিশোধ করতে পারব না। এই সমিতির কাগজে তাদের গ্রাহক সংখ্যা ১ হাজার ৩০০ দাবি করা হলেও মূল গ্রাহকের সংখ্যা ৫ হাজারের বেশি। এই সমিতি বাদে বরিশাল বিভাগে তেমন কোনো ঝামেলা নেই। এর আগে বরিশালের বানারীপাড়ায় শাপলা সঞ্চয় ঋণ সমিতি নিয়ে ঝামেলা ছিল’— যোগ করেন বরিশাল বিভাগীয় সমবায় কার্যালয়ের যুগ্ম নিবন্ধক।
সমবায় সমিতি পরিচালনার প্রক্রিয়া তুলে ধরে আতিকুল ইসলাম বললেন, ‘একটি সমবায় সমিতি সর্বনিম্ন ২০ জন লোকের সমন্বয়ে খুলতে হয়। সেটির একটি কমিটি থাকে। প্রতিনিয়ত অডিট হয়। এর মধ্যেই নানা ধরনের অসঙ্গতি থাকে, যার সঙ্গে আমাদের লোকজনও জড়িত থাকে, সেটি আমি অস্বীকার করব না। আমার জানা মতে, সমবায় সমিতি নিয়ে সবচেয়ে বেশি সমস্যা পিরোজপুরে। চলতি অর্থবছরের মধ্যে আরও অনেক সমবায় সমিতির নিবন্ধন বাতিল হবে। একটি সমিতির নিবন্ধন বাতিলের আগে ৫ থেকে ৬বার নোটিশ দেওয়া হয়।’
গ্রাহকদের সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়ে আতিকুল ইসলাম মন্তব্য করেন, ‘গ্রাহকদের সচেতন হওয়া উচিত। অতিরিক্ত লাভের আশায় বিতর্কিত কিছু সমবায় সমিতিতে অর্থ লগ্নি করে বিপদে পড়েছেন অনেকে। আমাদের অফিসে এসে আমাদের সঙ্গে আলোচনা বা পরামর্শ নিতে পারেন গ্রাহকরা।’
বরিশালের গবেষক দেবাশীষ চক্রবর্তী মনে করেন, শহর পর্যায়ে সমবায় সমিতিগুলো পুরোপুরি আস্থা হারিয়েছে। তবে গ্রাম পর্যায়ে এসব সমিতির কার্যক্রম চলছে।
তিনি বলেন, ‘কিছু প্রতারক ও টাউট প্রকৃতির লোক সমিতির নিবন্ধন নিয়ে অপকর্ম করছে। সমিতি বন্ধ না হলেও গ্রাহকদের টাকা নিয়ে উধাও হচ্ছে। গ্রাহকদের মধ্যে চরম অসন্তোষ ও নেগেটিভিটি তৈরি হচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে সমবায় সমিতির ওপর আর কারও ভরসাই থাকবে না। তাই এসব বিষয়ে আরও জোরালো নজরদারি করা হলে গ্রাম পর্যায়ের মানুষ উপকৃত হবে।’



