‘লাল ফিতায়’ আটকে একমাত্র বালু গবেষণা কেন্দ্র
- ভেস্তে যেতে পারে ১৫ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান

বালু গবেষণা ও প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্রের সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৯০০ কোটি টাকা। ছবি: আগামীর সময়
ব্রহ্মপুত্রের বালুতে লুকিয়ে আছে মূল্যবান খনিজ সম্পদের বিপুল সম্ভাবনা। সেই সম্ভাবনা কাজে লাগিয়ে কুড়িগ্রামকে খনিজ গবেষণা, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও প্রযুক্তিনির্ভর শিল্পের অন্যতম কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছিল বাংলাদেশ ভূতাত্ত্বিক জরিপ অধিদপ্তর (জিএসবি)। পরিকল্পনা ছিল, প্রায় ৯০০ কোটি টাকা ব্যয়ে দেশে প্রথমবারের মতো একটি বালু গবেষণা ও প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র গড়ে তোলার। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে তৈরি হতে পারে বিপুল কর্মসংস্থান, আসতে পারে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ, খুলতে পারে নতুন শিল্পের দুয়ার। কিন্তু আট বছর পেরিয়ে গেলেও সেই উদ্যোগ আলোর মুখ দেখেনি। জমির সম্ভাব্যতা ও কার্যকারিতা যাচাই শেষ হলেও বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় এবং কুড়িগ্রাম জেলা প্রশাসনের পাল্টাপাল্টি মতামতে তৈরি হয়েছে জটিলতা। ফলে সম্ভাবনাময় প্রকল্পটির ভবিষ্যৎ নিয়ে দেখা দিয়েছে অনিশ্চয়তা।
প্রকল্পসংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, ব্রহ্মপুত্র-যমুনা নদীব্যবস্থার বালুতে থাকা খনিজ সম্পদ সঠিকভাবে শনাক্ত ও প্রক্রিয়াজাত করা গেলে দেশে নতুন শিল্পের বিকাশ ঘটবে। ইলমেনাইট, জিরকন, ম্যাগনেটাইট, রুটাইল, গারনেট ও কোয়ার্টজের মতো খনিজের শিল্পক্ষেত্রে রয়েছে নানা ব্যবহার। রং, প্লাস্টিক, সিরামিক, ধাতু, ইলেকট্রনিকস, চিকিৎসা সরঞ্জামসহ বিভিন্ন খাতে এসব খনিজ কাজে লাগে। ফলে গবেষণা ও প্রক্রিয়াজাতকরণের সক্ষমতা গড়ে তোলা গেলে আমদানি নির্ভরতা কমানোর পাশাপাশি রপ্তানির নতুন সুযোগও তৈরি হতে পারে।
প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ১৫ লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে। এমনকি বছরে প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত রাজস্ব আয়ের সম্ভাবনার কথাও তুলে ধরা হয়েছে
জিএসবির পরিকল্পনা অনুযায়ী, কুড়িগ্রামের চিলমারী উপজেলায় ১৫ একর জমিতে একটি পাইলট রিসার্চ প্ল্যান্ট এবং রাজারহাট উপজেলার টগরাইহাট এলাকায় ১০ একর জমিতে একটি গবেষণা কেন্দ্র স্থাপনের প্রস্তাব করা হয়েছে। এরইমধ্যে গণপূর্ত অধিদপ্তর প্রকল্পের জমি জরিপ ও সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কাজ শেষ করে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে প্রতিবেদন পাঠিয়েছে। পরিকল্পনায় রয়েছে আন্তর্জাতিক মানের মিনারেল স্যান্ডস রিসার্চ হাব, বিরল মৃত্তিকা মৌল নিয়ে গবেষণা ও প্রক্রিয়াজাতকরণ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও অটোমেশনভিত্তিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং একটি জিওলজিক্যাল বিগ ডাটা সেন্টার প্রতিষ্ঠা। পাশাপাশি উচ্চ বিশুদ্ধতার কোয়ার্টজ ও নিউক্লিয়ার-গ্রেড জিরকন নিয়ে গবেষণার পরিকল্পনাও রয়েছে।
প্রস্তাবিত প্রকল্পের নথিতে বলা হয়েছে, এই উদ্যোগের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদে খনিজভিত্তিক শিল্পায়ন, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির সুযোগ তৈরি হতে পারে। সংশ্লিষ্টদের ধারণা, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ১৫ লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে। এমনকি বছরে প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত রাজস্ব আয়ের সম্ভাবনার কথাও তুলে ধরা হয়েছে। তবে এসব সম্ভাবনা বাস্তবে কতটা অর্জন করা যাবে, তা নির্ভর করবে বিস্তারিত খনিজ জরিপ, পরীক্ষাগারভিত্তিক বিশ্লেষণ, অর্থনৈতিক সমীক্ষা, পরিবেশগত মূল্যায়ন ও বিনিয়োগ পরিকল্পনার ওপর।
প্রকল্পটির অগ্রগতিতে জটিলতা তৈরি হয় সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের একটি সভার পর। গত ১৯ জুলাই জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সভার কার্যবিবরণীতে বলা হয়, কুড়িগ্রাম জেলা প্রশাসকের প্রতিবেদনে প্রকল্প বাস্তবায়নের সম্ভাব্য ব্যয়ের তুলনায় সরকারের প্রাপ্তি উল্লেখযোগ্য হবে না বলে অভিমত দেওয়া হয়েছে। তবে জেলা প্রশাসন বলছে, এ ধরনের কোনো প্রতিবেদন তারা পাঠায়নি। বরং প্রকল্পের জন্য সম্ভাব্য জমির তথ্য-উপাত্ত আগেই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছিল।
কুড়িগ্রামের জেলা প্রশাসক অন্নপূর্ণা দেবনাথ জানিয়েছেন, তিনি দায়িত্ব নেওয়ার আগে সাবেক জেলা প্রশাসকদের সময়ে বালু গবেষণা কেন্দ্র স্থাপনের জন্য সম্ভাব্য জমির তথ্য কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু গত ১৯ জুলাইয়ের সভায় জেলা প্রশাসকের যে অভিমতের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, সে ধরনের কোনো প্রতিবেদন তার দপ্তর থেকে পাঠানো হয়নি।
কুড়িগ্রাম গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী আব্দুল্লাহ আল ফারুক বলেন, ব্রহ্মপুত্র নদের অববাহিকায় মূল্যবান ও বিরল খনিজ সম্পদের সম্ভাবনা থাকায় জিএসবি এই প্রকল্পের প্রস্তাব করেছে। প্রকল্পের জন্য জমির সম্ভাব্যতা ও কার্যকারিতা যাচাইয়ের কাজ শেষ করে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে প্রতিবেদন পাঠানো হয়েছে।
জিএসবির উপপরিচালক (ভূতত্ত্ব) ড. সোহেল রানা বলেন, ব্রহ্মপুত্র-যমুনা নদীর বালু প্রাকৃতিকভাবে পুনর্ভরণ হয়। এই বালু কাজে লাগানো গেলে কোয়ার্টজ, ভারী খনিজ ও হালকা খনিজ আহরণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণের সুযোগ তৈরি হতে পারে। এতে দেশীয় বিনিয়োগের পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন এবং স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থানের সম্ভাবনাও বাড়বে।
প্রকল্পটি ঘিরে অনিশ্চয়তায় হতাশ স্থানীয় উন্নয়নকর্মীরাও। জেলা উন্নয়ন ও বাস্তবায়ন পরিষদের সভাপতি শফিকুল ইসলাম বেবু বলেন, প্রকল্পের কাজই শুরু হয়নি, অথচ এর লাভ-ক্ষতি নিয়ে নেতিবাচক মতামত দেওয়া হচ্ছে। তার মতে, যথাযথ গবেষণা ও পরিকল্পনার ভিত্তিতে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা গেলে তা দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তিনি দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।
এদিকে, মন্ত্রণালয় ও জেলা প্রশাসনের মধ্যে মতামতের এই অমিলের বিষয়ে জানতে চাইলে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু জানান, বিষয়টি তার জানা নেই। তবে বালু গবেষণা কেন্দ্র স্থাপন নিয়ে কোনো জটিলতা থাকলে তা নিরসনের আশ্বাস দিয়েছেন তিনি।





