আঙুল হারানো শ্রমিক থেকে চার বারের প্রেসিডেন্ট, লুলার হার না মানা গল্প

ব্রাজিলের সাও পাওলোতে সাও পাওলো আন্তর্জাতিক মোটর শোর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিচ্ছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা। ফাইল ছবি / রয়টার্স
একসময় কারখানার যন্ত্রে চাপা পড়ে বাঁ হাতের কনিষ্ঠ আঙুল হারিয়েছিলেন। সামরিক শাসনের সময় শ্রমিকদের অধিকার চাইতে গিয়ে জেলেও গিয়েছিলেন। প্রেসিডেন্ট হতে গিয়ে টানা তিনবার হেরেছেন।
তারপর দুইবার ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট হয়েছেন। ক্ষমতা ছাড়ার কয়েক বছর পর দুর্নীতির মামলায় আবার জেলে গেছেন। ৫৮০ দিন কাটিয়েছেন কারাগারে। তখন অনেকেই ধরে নিয়েছিলেন, লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের শেষ অধ্যায় লেখা হয়ে গেছে।
কিন্তু লুলা ফিরেছেন। জেল থেকে বেরিয়ে আবার নির্বাচনে দাঁড়িয়েছেন। ২০২২ সালে জাইর বলসোনারোকে হারিয়ে তৃতীয়বার প্রেসিডেন্ট হয়েছেন। আর এবার ৮০ বছর বয়সে আরও একবার অসম্ভবকে সম্ভব করেছেন।
প্রথম দফার ভোটে পিছিয়ে পড়েছিলেন। জরিপও খুব একটা আশা দেখাচ্ছিল না। প্রতিপক্ষ ফ্লাভিও বলসোনারো এগিয়ে ছিলেন ২২ লাখের বেশি ভোটে। কিন্তু তিন সপ্তাহের মধ্যে সেই ব্যবধান ঘুরিয়ে দিয়েছেন লুলা।
রবিবার দ্বিতীয় দফায় ৫১ দশমিক ৭৯ শতাংশ ভোট পেয়ে ফ্লাভিও বলসোনারোকে হারিয়েছেন তিনি। ব্যবধান ৪৪ লাখের মতো ভোট। ব্রাজিলে গণতন্ত্র ফেরার পর প্রথম দফায় দ্বিতীয় হওয়া কোনো প্রার্থী এই প্রথম দ্বিতীয় দফায় ঘুরে দাঁড়িয়ে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলেন।
আর লুলা হলেন ব্রাজিলের ইতিহাসে প্রথম ব্যক্তি, যিনি চারবার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলেন।
পরাজয়, জেল, অপমান ও রাজনৈতিক মৃত্যুর ভবিষ্যদ্বাণী—সবকিছুর পরও বারবার ফিরে আসা এই মানুষটির গল্প শুরু হয়েছিল ব্রাজিলের দরিদ্র উত্তর-পূর্বাঞ্চলে।
আট সন্তানের সংসারে জন্ম
লুলার জন্ম ১৯৪৫ সালের ২৭ অক্টোবর। ব্রাজিলের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় পেরনামবুকো অঙ্গরাজ্যের গারানহুনসে।
পুরো নাম লুইজ ইনাসিও দা সিলভা। ‘লুলা’ ছিল তার ডাকনাম। পরে জনপ্রিয় এই নামটি আইনিভাবে নিজের নামের অংশ করে নেন তিনি।
আট ভাইবোনের মধ্যে তিনি ছিলেন সপ্তম। পরিবার ছিল অত্যন্ত দরিদ্র। বাবা আরিস্তিদেস ইনাসিও দা সিলভা কাজের সন্ধানে পরিবার ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন সাও পাওলো অঙ্গরাজ্যের বন্দরনগরী সান্তোসে। পাঁচ বছর বয়সের আগে বাবাকে দেখেননি লুলা।
ভালো জীবনের আশায় ১৯৫২ সালে সন্তানদের নিয়ে পেরনামবুকো ছাড়েন তার মা ইউরিদিস ফেরেইরা দে মেলো।
যাত্রাটিও সহজ ছিল না। একটি ট্রাকের পেছনে চড়ে ১৩ দিনের পথ পাড়ি দিয়ে তারা পৌঁছান সাও পাওলো অঙ্গরাজ্যে। প্রথমে আশ্রয় হয় উপকূলীয় গুয়ারুজার একটি দরিদ্র এলাকায়।
পরিবারকে সাহায্য করতে ছোটবেলাতেই কাজে নামেন লুলা। রাস্তায় বাদাম, ট্যাপিওকা ও কমলা বিক্রি করেছেন। জুতা পালিশ করেছেন। কাপড় পরিষ্কারের দোকানের জন্য জিনিসপত্র পৌঁছে দেওয়ার কাজও করেছেন।
১৪ বছর বয়সে নিয়মিত পড়াশোনা ছেড়ে দেন। প্রথমে গুদামে, পরে স্ক্রু তৈরির কারখানায় কাজ নেন।
যে শিশুর পরিবার ভালো জীবনের খোঁজে ট্রাকে চড়ে হাজার কিলোমিটার পাড়ি দিয়েছিল, সেই শিশুই কয়েক দশক পর বিশ্বের অন্যতম বড় অর্থনীতির দেশটির প্রেসিডেন্ট হবেন—তখন সেটি কল্পনা করারও উপায় ছিল না।
কারখানায় হারালেন আঙুল
কারখানার জীবন লুলার রাজনৈতিক পরিচয়েরও ভিত্তি তৈরি করে।
কৈশোরেই তিনি ধাতব শিল্পে কাজ শুরু করেন। পাশাপাশি কারিগরি প্রশিক্ষণ নিয়ে দক্ষ লেদ মেশিন অপারেটর হন।
১৯৬৪ সালে একটি কারখানায় কাজ করার সময় ঘটে বড় দুর্ঘটনা। যন্ত্রে চাপা পড়ে তার বাঁ হাতের কনিষ্ঠ আঙুল মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পরে আঙুলটি কেটে ফেলতে হয়।
শ্রমিক হিসেবে সেই অভিজ্ঞতা লুলার জীবনে গভীর ছাপ ফেলে।
ষাটের দশকের শেষ দিকে বড় ভাই ফ্রেই চিকোর মাধ্যমে শ্রমিক ইউনিয়নের সঙ্গে যুক্ত হন তিনি। ১৯৬৯ সালে সাও বেরনার্দো দো কাম্পো ও দিয়াদেমার ধাতব শ্রমিক ইউনিয়নের নেতৃত্বে প্রথম জায়গা পান। ১৯৭৫ সালে হন ইউনিয়নের সভাপতি। তখন প্রায় এক লাখ শ্রমিকের প্রতিনিধিত্ব করতেন তিনি।
এই সময় ব্রাজিলে চলছিল সামরিক শাসন।
শ্রমিক নেতা থেকে সামরিক শাসনের প্রতিপক্ষ
সত্তরের দশকের শেষ দিকে সাও পাওলোর শিল্পাঞ্চলে বড় বড় ধর্মঘট শুরু হয়। সামনে থেকে নেতৃত্ব দেন লুলা।
বেতন বৃদ্ধি, শ্রমিকের অধিকার ও ভালো কর্মপরিবেশের দাবিতে হাজার হাজার শ্রমিক কারখানা ছেড়ে রাস্তায় নামেন। সামরিক সরকারের জন্য এসব ধর্মঘট বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়।
১৯৮০ সালে আরেকটি বড় ধর্মঘটের সময় লুলা ও অন্য শ্রমিক নেতাদের গ্রেপ্তার করে সরকার। জাতীয় নিরাপত্তা আইনে ৩১ দিন জেলে ছিলেন তিনি।
তবে কারাগার তার রাজনৈতিক উত্থান থামাতে পারেনি। বরং শ্রমিক আন্দোলনের অভিজ্ঞতা তাকে একটি নতুন সিদ্ধান্তের দিকে নিয়ে যায়। তিনি মনে করেন, শুধু ইউনিয়ন দিয়ে শ্রমিকদের দাবি পূরণ করা সম্ভব নয়। তাদের নিজস্ব রাজনৈতিক শক্তিও প্রয়োজন।
জন্ম নিল ওয়ার্কার্স পার্টি
১৯৮০ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি অন্য শ্রমিক নেতা, বুদ্ধিজীবী, সামাজিক আন্দোলনের কর্মী এবং ধর্মীয় নেতাদের সঙ্গে নিয়ে ওয়ার্কার্স পার্টি বা পিটি প্রতিষ্ঠা করেন লুলা।
দুই বছরের মধ্যেই দলটি ব্রাজিলজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। ১৯৮৩ সালে দেশটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শ্রমিক সংগঠনগুলোর একটি সেন্ট্রাল ইউনিকা দোস ত্রাবালহাদোরেস বা সিইউটি প্রতিষ্ঠাতেও ভূমিকা রাখেন তিনি।
সামরিক শাসনের শেষ দিকে সরাসরি প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের দাবিতে ‘দিরেতাস জা’ আন্দোলনেরও গুরুত্বপূর্ণ মুখ ছিলেন লুলা।
১৯৮৬ সালে সাও পাওলো থেকে পার্লামেন্ট সদস্য নির্বাচিত হন। ওই নির্বাচনে ব্রাজিলের যেকোনো প্রার্থীর চেয়ে বেশি ভোট পেয়েছিলেন তিনি। কিন্তু তার লক্ষ্য তখন আরও বড়।
তিন বার হার, চতুর্থ বারে জয়
১৯৮৯ সালে প্রায় তিন দশক পর সরাসরি প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ভোট দেন ব্রাজিলের মানুষ। প্রার্থী হন লুলা। হেরে যান। ১৯৯৪ সালে আবার দাঁড়ান। আবার হারেন।
১৯৯৮ সালে তৃতীয়বার চেষ্টা করেন। এবারও পরাজয়।
তিনটি ব্যর্থ নির্বাচনেও থামেননি লুলা।
২০০২ সালে চতুর্থবার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে দাঁড়ান। এবার নিজেকে আগের চেয়ে মধ্যপন্থী নেতা হিসেবে তুলে ধরেন। ব্যবসায়ী ও মধ্যবিত্তদের আশ্বস্ত করার চেষ্টা করেন।
এবার আর তাকে থামানো যায়নি।
দ্বিতীয় দফায় ৬১ শতাংশের বেশি ভোট পেয়ে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন সাবেক এই কারখানা শ্রমিক।
২০০৩ সালের ১ জানুয়ারি ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেন তিনি।
দরিদ্র মানুষের লুলা
লুলার প্রথম দুই মেয়াদ ছিল তার রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে সফল সময়।
ক্ষমতায় এসে আগের সরকারের অনেক অর্থনৈতিক নীতি বজায় রাখেন। একই সঙ্গে দরিদ্র মানুষের জন্য সামাজিক কর্মসূচি ব্যাপকভাবে বাড়ান।
সবচেয়ে পরিচিত কর্মসূচি হয়ে ওঠে ‘বোলসা ফামিলিয়া’। দরিদ্র পরিবারগুলোকে অর্থ দেওয়া হতো। বিনিময়ে সন্তানদের স্কুলে পাঠানো এবং প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার মতো শর্ত মানতে হতো।
বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, ২০০৩ থেকে ২০০৯ সালের মধ্যে প্রায় দুই কোটি মানুষকে দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে আসতে সহায়তা করেছে এই কর্মসূচি। ২০১০ সালের মধ্যে প্রায় পাঁচ কোটি মানুষ এর আওতায় আসে।
ন্যূনতম মজুরিও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ে। কর্মসংস্থান বাড়ে। আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রাজিলের পণ্যের চাহিদা বৃদ্ধি অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করে।
বিশ্বব্যাংক ২০০৩ থেকে ২০১০ সময়কে ব্রাজিলের জন্য অর্থনৈতিক ও সামাজিক অগ্রগতির গুরুত্বপূর্ণ সময় হিসেবে বর্ণনা করেছে। ওই সময়ে দারিদ্র্য ও আয়বৈষম্য উল্লেখযোগ্যভাবে কমে।
লুলাও বদলে যান।
একসময় যিনি কারখানার গেটে দাঁড়িয়ে শ্রমিকদের ধর্মঘটের ডাক দিতেন, তিনিই তখন বিশ্বের বড় বড় নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করছেন। ব্রাজিলকে উন্নয়নশীল বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ কণ্ঠ হিসেবে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছেন।
২০০৬ সালে দ্বিতীয়বার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন তিনি।
২০১০ সালে যখন ক্ষমতা ছাড়েন, তখন তার জনপ্রিয়তা ছিল প্রায় ৮০ শতাংশ।
সাফল্যের মধ্যেই দুর্নীতির ছায়া
তবে লুলার প্রথম দুই মেয়াদ বিতর্কমুক্ত ছিল না।
তার দল ওয়ার্কার্স পার্টির কয়েকজন শীর্ষ নেতা বড় দুর্নীতি কেলেঙ্কারিতে জড়িয়ে পড়েন। আইনপ্রণেতাদের সমর্থন কেনার অভিযোগে ‘মেনসালাও’ কেলেঙ্কারি লুলার প্রথম মেয়াদেই বড় রাজনৈতিক সংকট তৈরি করেছিল।
পরবর্তী সময়ে ‘অপারেশন কার ওয়াশ’ নামে বিশাল দুর্নীতিবিরোধী তদন্ত ব্রাজিলের রাজনীতি কাঁপিয়ে দেয়।
লুলার বিরুদ্ধেও দুর্নীতি ও অর্থপাচারের অভিযোগ আনা হয়।
২০১৭ সালে একটি মামলায় দোষী সাব্যস্ত হন তিনি। পরের বছর কারাগারে যেতে হয়।
সেই সময় ২০১৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনেও অংশ নিতে চেয়েছিলেন লুলা। কিন্তু দণ্ডের কারণে তাকে নির্বাচনে দাঁড়াতে দেওয়া হয়নি।
৫৮০ দিন কারাগারে
২০১৮ সালের এপ্রিলে কারাগারে যান লুলা।
সাবেক প্রেসিডেন্ট। একসময় বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় রাজনৈতিক নেতাদের একজন। অথচ এবার তার ঠিকানা ব্রাজিলের পারানায় ফেডারেল পুলিশের একটি কক্ষ।
সেখানে কাটে ৫৮০ দিন।
রাজনৈতিকভাবে লুলার গল্প শেষ—এমনটাই তখন মনে করেছিলেন অনেকে।
২০১৮ সালের নির্বাচনে জয়ী হন ডানপন্থী জাইর বলসোনারো। লুলার দল ক্ষমতা হারায়।
কিন্তু কয়েক বছরের মধ্যে পরিস্থিতি আবার পাল্টে যায়।
২০২১ সালে ব্রাজিলের সুপ্রিম কোর্ট লুলার বিরুদ্ধে দেওয়া সাজাগুলো বাতিল করে। আদালত বলেন, যে আদালতে মামলাগুলোর বিচার হয়েছিল, সেগুলো বিচারের যথাযথ এখতিয়ার ছিল না।
আরেক সিদ্ধান্তে সুপ্রিম কোর্টের বিচারকেরা বলেন, একটি মামলার বিচারক সের্জিও মোরো নিরপেক্ষ ছিলেন না।
লুলার রাজনৈতিক অধিকার ফিরে আসে। দরজাও খুলে যায় আরেকটি প্রত্যাবর্তনের।
জেল থেকে আবার প্রেসিডেন্ট প্রাসাদে
২০২২ সালের নির্বাচন ছিল ব্রাজিলের ইতিহাসের সবচেয়ে তীব্র রাজনৈতিক লড়াইগুলোর একটি।
একদিকে ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্ট জাইর বলসোনারো। অন্যদিকে কয়েক বছর আগেও কারাগারে থাকা লুলা।
দ্বিতীয় দফায় লুলা পান ৫০ দশমিক ৯ শতাংশ ভোট। বলসোনারো পান ৪৯ দশমিক ১ শতাংশ।
মাত্র কয়েক বছর আগে যে মানুষটির রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ শেষ বলে মনে হয়েছিল, সেই লুলা ২০২৩ সালের ১ জানুয়ারি তৃতীয়বার প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেন।
তবে এবার তিনি পেয়েছিলেন ভিন্ন এক ব্রাজিল।
দেশ ছিল তীব্রভাবে বিভক্ত। শপথ নেওয়ার মাত্র এক সপ্তাহ পর বলসোনারোর সমর্থকেরা ব্রাসিলিয়ায় কংগ্রেস, সুপ্রিম কোর্ট ও প্রেসিডেন্ট প্রাসাদে হামলা চালান।
তৃতীয় মেয়াদে সাফল্য, তারপরও অসন্তোষ
তৃতীয় মেয়াদে আবার সামাজিক কর্মসূচি বাড়ান লুলা। বোলসা ফামিলিয়াকে নতুন করে শক্তিশালী করা হয়। ন্যূনতম মজুরির প্রকৃত মূল্য বাড়ানোর নীতি ফেরে।
অর্থনীতিও অনেক পূর্বাভাসের চেয়ে ভালো করে।
২০২৩ সালে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ছিল ৩ দশমিক ২ শতাংশ। পরের বছর ৩ দশমিক ৪ শতাংশ। ২০২৫ সালে তা কমে ২ দশমিক ৩ শতাংশে আসে।
বেকারত্ব নামে ঐতিহাসিকভাবে নিচু পর্যায়ে। প্রকৃত মজুরি বাড়ে। দারিদ্র্যও কমে। আমাজনে বন উজাড়ের হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমানোর সাফল্যও পায় তার সরকার।
কিন্তু ভালো অর্থনৈতিক সূচক মানেই সবাই সন্তুষ্ট ছিলেন না।
খাদ্য ও নিত্যপণ্যের দাম সাধারণ মানুষের বড় উদ্বেগ হয়ে ওঠে। অপরাধ নিয়েও অসন্তোষ ছিল। উচ্চ সুদের কারণে পরিবার ও ব্যবসার ঋণের চাপ বাড়ে।
একসময় ৮০ শতাংশের কাছাকাছি জনপ্রিয়তা নিয়ে ক্ষমতা ছাড়া লুলার জনপ্রিয়তাও তৃতীয় মেয়াদে অনেক কমে যায়।
আর সেই অসন্তোষই ২০২৬ সালের নির্বাচনে তাকে বড় বিপদের সামনে দাঁড় করায়।
প্রথম দফায় হার
এবার জাইর বলসোনারো নিজে লুলার প্রতিপক্ষ ছিলেন না। তার ছেলে, ডানপন্থী সিনেটর ফ্লাভিও বলসোনারো মাঠে নামেন।
৪ অক্টোবর প্রথম দফার ভোটে বড় ধাক্কা খান লুলা।
ফ্লাভিও পান ৪৭ দশমিক ০৩ শতাংশ ভোট। লুলার ভোট ছিল ৪৫ দশমিক ১৬ শতাংশ।
ব্যবধান ২২ লাখের বেশি।
১৯৮৯ সালে ব্রাজিলে সরাসরি প্রেসিডেন্ট নির্বাচন ফেরার পর কখনো প্রথম দফায় দ্বিতীয় হওয়া কোনো প্রার্থী দ্বিতীয় দফায় ঘুরে দাঁড়িয়ে প্রেসিডেন্ট হতে পারেননি।
লুলার বয়স ৮০। সামনে অপেক্ষাকৃত তরুণ প্রতিদ্বন্দ্বী। সাম্প্রতিক জরিপও ফ্লাভিওকে কিছুটা এগিয়ে রাখছিল।
আরও একবার প্রশ্ন ওঠে—এবার কি সত্যিই শেষ হচ্ছে লুলার রাজনৈতিক জীবন?
তিন সপ্তাহে ঘুরে দাঁড়ানো
দুই দফার মাঝের তিন সপ্তাহে প্রচারণার ধরন বদলে দেন লুলা।
যারা প্রথম দফায় ভোট দিতে যাননি, তাদের কেন্দ্রে আনার ওপর জোর দেওয়া হয়। জীবনযাত্রার ব্যয় ও সামাজিক কর্মসূচি রক্ষার বার্তা সামনে আনা হয়। তরুণদের কাছে পৌঁছাতে ডিজিটাল প্রচারণাও বাড়ানো হয়।
এই প্রচারণার একটি মুহূর্ত আবার লুলার পুরোনো পরিচয় সামনে নিয়ে আসে।
শেষ দিকের এক টেলিভিশন বিতর্কে কারখানার দুর্ঘটনায় লুলার আঙুল হারানোর বিষয়টি নিয়ে ব্যঙ্গ করেন ফ্লাভিও বলসোনারো। জবাবে লুলা ফিরে যান নিজের শৈশবে। দরিদ্র পরিবার, শ্রমিকের জীবন এবং নিজের সংগ্রামের গল্প বলেন।
যে পরিচয় দিয়ে কয়েক দশক আগে তার রাজনৈতিক যাত্রা শুরু হয়েছিল, শেষ মুহূর্তের প্রচারণায় আবার সেই শ্রমিক লুলাকেই সামনে আনা হয়।
আর রবিবার ভোট গণনায় শুরুতে এগিয়েও যান ফ্লাভিও।
পরে ফল আসতে থাকে লুলার শক্ত ঘাঁটি উত্তর-পূর্বাঞ্চল থেকে।
চিত্র বদলে যায়।
আবার ফিরলেন লুলা
সব ভোট গণনার পর লুলা পেয়েছেন ৫১ দশমিক ৭৯ শতাংশ। ফ্লাভিও বলসোনারো পেয়েছেন ৪৮ দশমিক ২১ শতাংশ।
প্রথম দফার ২২ লাখ ভোটের ঘাটতি ঘুচিয়ে দ্বিতীয় দফায় প্রায় ৪৪ লাখ ভোটে এগিয়ে যান লুলা।
ব্রাজিলের ইতিহাসে নিশ্চিত হয় তার চতুর্থ মেয়াদ।
জয়ের পর সমর্থকদের উদ্দেশে লুলা বলেছেন, সবাই নির্বাচিত প্রেসিডেন্টকে পছন্দ করতে বাধ্য নয়। কিন্তু নির্বাচিত প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব সবার জন্য দেশ পরিচালনা করা।
ফ্লাভিও অবশ্য ফল মেনে নেননি। ভোট গ্রহণের সময় বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলে ফল বাতিলের আবেদন করার কথা জানিয়েছেন তিনি। তবে ভোটের ব্যবধান এবং তার নিজের প্রচারণাও সময় বাড়ানোর অনুরোধ করেছিল—এই দুই কারণে ফল উল্টে যাওয়ার সম্ভাবনা কম বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
চতুর্থ মেয়াদই হয়তো সবচেয়ে কঠিন
আরেকটি নির্বাচন জিতেছেন লুলা। কিন্তু তার সামনে এবার সম্ভবত আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে কঠিন শাসনকাল অপেক্ষা করছে।
সরকারি ঋণ জিডিপির ৮২ শতাংশ ছাড়িয়েছে। সুদের হার ১৩ দশমিক ৭৫ শতাংশ। মূল্যস্ফীতি ৪ দশমিক ৬ শতাংশ।
প্রায় ৮ কোটি ৪০ লাখ ব্রাজিলিয়ান ঋণের কিস্তি পরিশোধে পিছিয়ে রয়েছেন। একই সমস্যায় রয়েছে ৯৩ লাখ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান।
লুলা সামাজিক কর্মসূচি ধরে রাখতে চান। ন্যূনতম মজুরি মূল্যস্ফীতির চেয়ে বেশি হারে বাড়াতে চান। কিন্তু একই সঙ্গে সরকারি ঋণও নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।
আর সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক সমস্যা কংগ্রেস।
নির্বাচনে লুলা প্রেসিডেন্ট পদে জিতলেও আইনসভায় ডানপন্থীরা শক্তিশালী হয়েছে। বলসোনারোর লিবারেল পার্টি ও মিত্ররা দুই কক্ষেই বড় প্রভাব রাখবে।
অর্থাৎ লুলা প্রেসিডেন্ট হলেও নিজের অর্থনৈতিক ও সামাজিক কর্মসূচি বাস্তবায়নে প্রতিটি বড় পদক্ষেপে তাকে বিরোধীদের সঙ্গে লড়তে অথবা সমঝোতা করতে হবে।
যে গল্প বারবার শেষ হয়েও শেষ হয় না
লুলার বয়স মঙ্গলবার ৮১ বছর হবে।
জন্মদিনের দুই দিন আগে ব্রাজিলের মানুষ তাকে চতুর্থবারের মতো প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত করল।
তার রাজনৈতিক জীবনের প্রতিটি অধ্যায় যেন আগেরটির চেয়ে বেশি নাটকীয়।
দরিদ্র পরিবারের সন্তান। ট্রাকে চড়ে নতুন জীবনের সন্ধানে যাত্রা। রাস্তায় বাদাম বিক্রি। কারখানায় শ্রমিকের কাজ। যন্ত্রে আঙুল হারানো। শ্রমিক নেতা। সামরিক শাসনে কারাবাস। নতুন দল গঠন। প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে তিনবার পরাজয়। তারপর দুইবার প্রেসিডেন্ট। দুর্নীতির অভিযোগ। আবার কারাগার। ৫৮০ দিনের বন্দিজীবন। সাজা বাতিল। ২০২২ সালে প্রেসিডেন্ট প্রাসাদে প্রত্যাবর্তন।
আর ২০২৬ সালে প্রথম দফায় পিছিয়ে পড়েও আবার জয়।
লুলার সমর্থকদের কাছে এই জীবন সংগ্রাম ও ফিরে আসার গল্প। সমালোচকদের কাছে তার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবন দুর্নীতির বিতর্ক, সরকারি ব্যয় এবং বামপন্থী রাজনীতিরও প্রতীক।
তবে একটি বিষয় নিয়ে দ্বিমত করা কঠিন।
আধুনিক ব্রাজিলের রাজনৈতিক ইতিহাস লিখতে গেলে লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভাকে পাশ কাটানোর আর কোনো উপায় নেই।
কারখানার যে শ্রমিক একদিন নিজের একটি আঙুল হারিয়েছিলেন, সেই মানুষটিই এখন চতুর্থবারের মতো লাতিন আমেরিকার সবচেয়ে বড় দেশের প্রেসিডেন্ট।










