ঈদের ছুটিতে রূপসী পদ্মার পাড়ে ভিড়

ছবি: আগামীর সময়
পদ্মা নদীর উত্তাল ঢেউয়ের শব্দ, গায়ে জুড়িয়ে যাওয়া স্নিগ্ধ বাতাস আর গোধূলিলগ্নে আকাশের বুকে সূর্যাস্তের লাল আভা—সব মিলিয়ে ঈদের ছুটিতে এক মায়াবী রূপ ধারণ করেছে পদ্মাপাড়। পবিত্র ঈদুল আজহার দীর্ঘ ছুটিতে মাদারীপুরের শিবচরের পদ্মা সেতু সংলগ্ন নদীপাড়ে এখন ভ্রমণপিপাসু মানুষের উপচে পড়া ঢল। সকাল থেকে শুরু করে গভীর রাত পর্যন্ত উৎসবমুখর মানুষের পদচারণায় মুখর হয়ে উঠছে চারপাশ।
সরেজমিনে দেখা যায়, কাওড়াকান্দি পুরাতন ফেরিঘাট থেকে শুরু করে কাঁঠালবাড়ী হয়ে পদ্মা সেতুর জাজিরা প্রান্ত পর্যন্ত প্রায় ১০ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে এখন তিল ধারণের ঠাঁই নেই। কেউ এসেছেন পরিবার-পরিজন নিয়ে, কেউ বন্ধুদের আড্ডায় মেতেছেন, আবার কেউবা বন্ধুদের সাথে মোটরসাইকেলের বহর নিয়ে ছুটে এসেছেন প্রমত্তা পদ্মার রূপ দেখতে। মূলত পদ্মা সেতু চালুর পর থেকেই শিবচরের এই নদীপাড় এলাকাটি পর্যটকদের অন্যতম প্রিয় গন্তব্যে পরিণত হয়েছে। ঈদ বা যেকোনো সরকারি ছুটিতে এখানে ভিড় বাড়ে কয়েক গুণ।
পদ্মাপাড়ের এই নির্মল পরিবেশ দর্শনার্থীদের মনে এনে দিচ্ছে অন্যরকম এক প্রশান্তি। নদীতে ছোট ছোট নৌকায় ঘুরে বেড়ানো, জেলেদের জাল ফেলে মাছ ধরার দৃশ্য কিংবা নদীর হাঁটু পানিতে পা ডুবিয়ে বসে থাকা—সবকিছুই যেন শহুরে ক্লান্তি ভুলিয়ে দেয়। ভাঙ্গার মালিগ্রাম থেকে ঘুরতে আসা দর্শনার্থী মোঃ সোহেল মিয়া নিজের অনুভূতি প্রকাশ করে বলেন, “এখানে ঘুরতে আসলে প্রকৃতির সঙ্গে মিশে যাওয়া যায়। নদীর ধারে বসে মন খুলে নিশ্বাস নেওয়া যায়। ছোট নৌকায় ভেসে বেড়ানোর আনন্দই আলাদা, আর জেলেদের মাছ ধরার দৃশ্য দেখলে মন ভরে যায়।”
শুধু আশেপাশের জেলাই নয়, রাজধানী ঢাকা ও দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকেও প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ কেবল বিকেল ও সন্ধ্যার সময়টুকু উপভোগ করতে এখানে ছুটে আসছেন। যাতায়াত ব্যবস্থাও বেশ সহজ। ঢাকা থেকে জাজিরা টোল প্লাজা দিয়ে নেমে কাঁঠালবাড়ী ফেরিঘাট সড়ক ধরে সহজেই পৌঁছানো যায় এই পাড়ে। আবার দক্ষিণাঞ্চল থেকে আসা দর্শনার্থীরা কাওড়াকান্দি পুরাতন ঘাট কিংবা কাঁঠালবাড়ী ঘাট হয়ে সহজেই নদীপাড়ে চলে আসতে পারছেন।
দর্শনার্থীদের এই আনন্দকে আরও জমজমাট করতে পদ্মাপাড়জুড়ে বসেছে হরেক রকমের মুখরোচক খাবারের অস্থায়ী দোকান। ফুচকা, চটপটি, ঝালমুড়ি, আচার, তালশাঁস আর তালের রসের পাশাপাশি এখানে সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হলো পদ্মা নদীর তাজা ইলিশ। সন্ধ্যার পর নদীর পাড়ে বসে গরম খিচুড়ির সাথে ইলিশ ভুনার স্বাদ নেওয়া যেন দর্শনার্থীদের জন্য এক বাড়তি পাওনা। এছাড়া শিশুদের বিনোদনের জন্য রয়েছে ছোট নৌকা, ট্রলার ও স্পিডবোটে নদী ভ্রমণের দারুণ সুযোগ।
দর্শনার্থীদের এত বড় সমাগমে যাতে কোনো ধরনের অপ্রীতিকর পরিস্থিতি তৈরি না হয়, সেজন্য প্রশাসনও বেশ তৎপর। জাজিরা ও পদ্মা সেতু এলাকায় নৌপুলিশ, হাইওয়ে পুলিশ এবং স্থানীয় থানা পুলিশের টহল জোরদার করা হয়েছে। শিবচর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. কামাল হোসেন বললেন, 'ঈদুল আজহার ছুটিতে প্রতিদিন প্রচুর মানুষ এখানে ঘুরতে আসছেন। দর্শনার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশের টিম সার্বক্ষণিক সজাগ রয়েছে।'
স্থানীয়দের মতে, ঢাকা-ভাঙ্গা এক্সপ্রেসওয়ে আর পদ্মা সেতুর কল্যাণে শিবচর অঞ্চলে পর্যটনের এক বিশাল সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। তবে পদ্মাপাড়ের পাশাপাশি শিবচরে ঘুরতে আসা মানুষদের জন্য আরও একটি দারুণ আকর্ষণ রয়েছে। সেটি হলো এক্সপ্রেসওয়ে সংলগ্ন সূর্যনগর এলাকায় অবস্থিত দৃষ্টিনন্দন ‘ইলিয়াশ আহমেদ চৌধুরী বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ জামে মসজিদ’। নান্দনিক ও সুদৃশ্য এই মসজিদটি দূর-দূরান্তের যাত্রী ও দর্শনার্থীদের দারুণভাবে আকৃষ্ট করছে এবং ঈদের ছুটিতে সেখানেও ভিড় জমাচ্ছেন বহু মানুষ।
প্রকৃতির সান্নিধ্য, নান্দনিক স্থাপত্য আর জিভে জল আনা ইলিশের স্বাদ—সব মিলিয়ে শিবচরের পদ্মাপাড় যেন এখন আনন্দ আর প্রাণচাঞ্চল্যের এক অনন্য মিলনমেলা।






