আগুনের সঙ্গে লড়াই করে পরিবার বাঁচান আশিক

আশিকুর রহমান। ছবি: আগামীর সময়
আগুন জ্বলছে। সেই আগুনে পুড়ে লাল হয়ে আছে লোহা। লালচে হয়ে ওঠা লোহায় একটু পরপর বাতাস দিচ্ছেন আশিকুর রহমান। ঘামে ভিজে একাকার শরীর। বয়স মাত্র ২৪ বছর। তবে কাঁধে যেন বহু বছরের দায়িত্বের ভার।
ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলার প্রাণকেন্দ্রে কাঁচামাটিয়া নদীর পাশের ভাঙাচোরা একচিলতে দোকান থেকেই ভেসে আসে তার হাতুড়ির শব্দ। আগুনের লাল শিখার সামনে দাঁড়িয়ে নিরলস কাজ করে যান তিনি। কাঁধে চাপা দায়িত্ব আর জীবনের কঠিন অভিজ্ঞতার ছাপ ফুটে ওঠে আগুনে পোড়া শক্ত হাত দুটিতে। লোহার আগুনে পুড়ে, হাতের তালু শক্ত হয়ে দিনের পর দিন জীবনের সঙ্গে লড়াই করেই বড় হয়েছেন আশিক।
উপজেলার চরহোসেনপুর গ্রামের বাসিন্দা আশিক। গত ১০ বছর ধরে কামারের পেশার সঙ্গে জড়িত তিনি। বাবা মারা যাওয়ার পর সংসারের বড় ছেলে হিসেবে পরিবারের সব দায়িত্ব এসে পড়ে তার কাঁধে। যে বয়সে ছেলেরা স্কুলে যায়, বন্ধুদের সঙ্গে খেলাধুলা করে, ভবিষ্যৎ নিয়ে স্বপ্ন দেখে, সেই বয়স থেকেই তাকে মুখোমুখি হতে হয়েছে কঠিন বাস্তবতার। সংসারের হাল ধরতে গিয়ে হারিয়ে গেছে তার শৈশব।
বাবার মৃত্যুর পর দিশাহারা পরিবারটি আগলে রেখেছেন আশিক। সংসারে দুই ভাই ও চার বোন। বড় বোনকে বাবা বিয়ে দিয়ে যেতে পারলেও বাকি সবাই তখন তাকিয়ে ছিল আশিকের দিকে। অভাবের সংসারে প্রতিদিনের খাবার জোগাড় করাটাই ছিল সবচেয়ে বড় যুদ্ধ। সেই যুদ্ধ করতে করতেই দ্বিতীয় ও তৃতীয় বোনের বিয়ে দিয়েছেন তিনি। অনেক কষ্ট করে, টাকা জমিয়ে বোনদের বিয়ে দিয়েছেন এই অল্প বয়সেই। নিজের জন্য নতুন কাপড় না কিনে, ঈদের আনন্দ ত্যাগ করে দিনের পর দিন শুধু পরিবারের কথাই ভেবেছেন তিনি।
মাত্র ১৪ বছর বয়সে কামারের দোকানে কাজ শেখা শুরু করেন আশিক। শুরুতে আগুনের উত্তাপ সহ্য করতে পারতেন না। হাত পুড়ে যেত, শরীর ক্লান্ত হয়ে পড়ত। কিন্তু থেমে থাকার সুযোগ ছিল না। কারণ ঘরে ফিরে ছোট ভাই-বোনদের মুখ দেখলেই পরদিন ভোরে আবার কাজে বের হয়ে যেতে হতো।
ধীরে ধীরে হাতুড়ি, আগুন আর লোহার সঙ্গে সখ্য গড়ে ওঠে তার। এখন ১০ বছর ধরে এই কাজই করে যাচ্ছেন। কৃষকের কাস্তে, দা, কোদাল, ছুরি— সব ধরনের লোহার সরঞ্জাম তৈরি ও মেরামত করেন তিনি।
তবে এ পেশায় আয় খুব একটা স্থির নয়। মাসে আনুমানিক ১৭ থেকে ১৮ হাজার টাকা আয় হয় তার। কিন্তু সেই আয়ও সবসময় সমান থাকে না। কোরবানির ঈদের সময় চাপাতি, ছুরি ও দা তৈরির কাজ বেড়ে যায়। তখন কিছুটা বেশি আয় হয়। ধান কাটার মৌসুমে কৃষি সরঞ্জাম তৈরি ও শান দেওয়ার কাজও বাড়ে। কিন্তু বছরের বাকি সময় অনেক দিন দোকানে বসে থেকেও তেমন কাজ পান না।
আশিক বলেছেন, ‘কখনো কখনো সারা দিন বসে থাকি, একটা কাজও আসে না। কিন্তু সংসার তো বসে থাকে না। বাজার করতে হয়, ওষুধ লাগে, ছোট ভাইয়ের খরচ আছে। ছোট ভাইকে মাদ্রাসায় পড়াচ্ছি। কোনোভাবে দিন যাচ্ছে। তবে সবচেয়ে বেশি ভয় পাই প্রশাসনকে নিয়ে। উচ্ছেদের ভয়ে সবসময় থাকতে হয়। মাঝেমধ্যেই আমাদের উঠিয়ে দেওয়া হয়। আমরা গরিব মানুষ, জায়গা ভাড়া করে ব্যবসা করার মতো সামর্থ্য নেই। সরকার যদি একটি স্থায়ী দোকানের ব্যবস্থা করে দিত, তাহলে পরিবার নিয়ে নিশ্চিন্তে থাকতে পারতাম।’
সরকারি জায়গায় গড়ে তোলা আশিকের ছাপড়া ঘরটি পুরোপুরি অস্থায়ী। বর্ষাকালে টিনের চালা দিয়ে পানি পড়ে। তখন আগুন জ্বালানোও কঠিন হয়ে যায়। বৃষ্টির পানিতে ভিজে যায় কয়লা, লোহা ও কাজের সরঞ্জাম। কথা বলতে বলতে দোকানের ভাঙা চালার দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলেন তিনি।
জায়গা কিনে স্থায়ীভাবে দোকান করার স্বপ্ন আছে আশিকের। কিন্তু সেই স্বপ্ন বাস্তবতার কাছে অনেক দূরের মনে হয়। প্রতিদিনের আয় দিয়েই যেখানে সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হয়, সেখানে জমি কেনা যেন কল্পনার মতো। তবুও স্বপ্ন দেখেন তিনি। নিজের একটি ছোট, স্থায়ী দোকান হবে। টিনের চালা দিয়ে আর পানি পড়বে না। উচ্ছেদের ভয় থাকবে না। নিশ্চিন্তে কাজ করতে পারবেন। ছোট ভাইকে ভালোভাবে প্রতিষ্ঠিত করতে পারবেন। সংসারের অভাবও কিছুটা কমবে।
সেই স্বপ্ন নিয়েই প্রতিদিন আগুনের সামনে দাঁড়ান আশিক। সমাজের চোখে তিনি হয়তো একজন সাধারণ কামার। কিন্তু পরিবারের কাছে আশিকই ভরসা, আশিকই ছায়া, আশিকই পুরো সংসারের বেঁচে থাকার অবলম্বন।






