বেতাগী
ঘণ্টায় ঘণ্টায় লোডশেডিং: দিন কিংবা রাত, স্বস্তি নেই

ছবি: আগামীর সময়
সারা দেশের মতো বরগুনার বেতাগীতেও তীব্র আকার ধারণ করেছে বিদ্যুতের লোডশেডিং। প্রতি এক ঘণ্টা পর পর নিয়ম করে চলছে বিদ্যুৎ বিভ্রাট। দিন কিংবা রাত-কোনো সময়ই স্বস্তি মিলছে না গ্রাহকদের। ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের ফলে একদিকে যেমন শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা ব্যাহত হচ্ছে, অন্যদিকে চরম ক্ষতির মুখে পড়েছে স্থানীয় কলকারখানা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও অনলাইনভিত্তিক ফ্রিল্যান্সিং খাত। ব্যাহত হচ্ছে সরকারি-বেসরকারি অফিসের স্বাভাবিক কার্যক্রমও। জাতীয় গ্রিড থেকে চাহিদার তুলনায় অর্ধেকেরও কম বিদ্যুৎ সরবরাহ পাওয়ায় এই সংকট তৈরি হয়েছে বলে জানিয়েছে পল্লী বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ।
উপজেলার বিভিন্ন স্তরের গ্রাহকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দিন-রাত সমানতালে লোডশেডিংয়ের কারণে সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা বিপর্যস্ত। কৃষি, ব্যবসা, শিক্ষা ও গ্রামীণ অর্থনীতির প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্র বিদ্যুতের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় মানুষের আয়-রোজগার ও জীবনযাত্রায় এর প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়ছে। তীব্র গরমে বিশেষ করে শিশু ও বয়স্করা অসুস্থ হয়ে পড়ছেন।
পটুয়াখালী পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির বেতাগী সাব-জোনাল অফিস সূত্রে জানা গেছে, উপজেলার ১টি পৌরসভা ও ৭টি ইউনিয়নে মোট গ্রাহক সংখ্যা ৪২ হাজার এবং ফিডার রয়েছে ৬টি। এখানে দিনে বিদ্যুতের চাহিদা ৬ মেগাওয়াট এবং রাতে ৮ মেগাওয়াট। তবে জাতীয় গ্রিড থেকে বরাদ্দ মিলছে দিনে মাত্র আড়াই মেগাওয়াট এবং রাতে ৫ মেগাওয়াট।
উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, পৌর এলাকায় লোডশেডিং তুলনামূলক কিছুটা কম হলেও ইউনিয়নগুলোর গ্রামাঞ্চলের পরিস্থিতি বেশ ভয়াবহ। একবার বিদ্যুৎ গেলে কখন ফিরবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছেন গ্রামের মানুষ।
বিদ্যুৎ সংকটের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে শিক্ষার্থীদের ওপর। সামনে পরীক্ষা থাকলেও পড়াশোনায় মনোযোগ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
এ বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে কাউনিয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী রাকিবুল ইসলামের ভাষ্য, সারাদিন স্কুল ও প্রাইভেট শেষ করে রাতে পড়তে বসি, কিন্তু ঠিক তখনই বিদ্যুৎ চলে যায়। এক ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকলে পরের এক ঘণ্টা থাকে না। চার্জার লাইট বা মোমের আলোয় বেশিক্ষণ পড়া যায় না, গরমে টেবিলে বসাও কঠিন। এভাবে চললে আমাদের ফলাফলে মারাত্মক বিপর্যয় ঘটবে।
বিদ্যুতের এই লুকোচুরি খেলায় ধস নেমেছে স্থানীয় কাঠের মিল (স-মিল), রাইস মিল ও ক্ষুদ্র কারখানাগুলোতে। বিকল্প হিসেবে জেনারেটর চালিয়ে উৎপাদন সচল রাখতে গিয়ে মিল মালিকদের খরচ বেড়ে দ্বিগুণ হয়েছে, ফলে উৎপাদন নেমে এসেছে অর্ধেকে। বেতাগী পৌর এলাকার স-মিল মালিক মো. মনিরুল ইসলাম বললেন, আমাদের ব্যবসা সম্পূর্ণ বিদ্যুৎ নির্ভর। জেনারেটরের অতিরিক্ত জ্বালানি খরচে পোষাতে না পেরে উৎপাদন অর্ধেক করতে বাধ্য হয়েছি। কাজ না থাকলেও শ্রমিকদের হাজিরা দিতে হচ্ছে, ফলে প্রতিদিন লোকসান গুনছি।
অন্যদিকে, ইন্টারনেট ও বিদ্যুৎ না থাকায় উদীয়মান তরুণ ফ্রিল্যান্সাররা আন্তর্জাতিক ক্লায়েন্টদের নির্দিষ্ট সময়ে কাজ বুঝিয়ে দিতে পারছেন না। এতে চরম ঝুঁকিতে পড়েছে উপজেলার উদীয়মান ফ্রিল্যান্সিং খাত। খামারগুলোতে বিদ্যুৎ না থাকায় গরমে গবাদিপশু ও মুরগির বিভিন্ন রোগ দেখা দিচ্ছে।
গ্রামাঞ্চলের গ্রাহকদের অভিযোগ, পৌরসভা ও গ্রামের মধ্যে বিদ্যুৎ সরবরাহে বৈষম্য করা হচ্ছে। পৌর এলাকায় বিদ্যুৎ তুলনামূলক বেশি থাকলেও গ্রামে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ থাকছে না। সরবরাহ ঘাটতি থাকলেও লোডশেডিংয়ের ক্ষেত্রে শহর ও গ্রামের মধ্যে সুষম বণ্টন চান তারা।
এ বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে বিবিচিনি ইউনিয়নের ফুলতলা গ্রামের আব্দুল হাকিম জানালেন, পৌরসভার দিকে কিছুটা ছাড় দেওয়া হলেও গ্রামের মানুষকে একটানা অন্ধকারের মধ্যে ফেলে রাখা হচ্ছে। বিদ্যুৎ গেলে কখন আসবে তার কোনো ঠিকানা থাকে না। গরমের কষ্ট তো আছেই, সাথে দৈনন্দিন কাজ করা অসম্ভব হয়ে পড়ছে। সংকট থাকলে তা শহর ও গ্রামে সমানভাবে ভাগ করে দেওয়া হোক, আমরা এই বৈষম্য চাই না।
পরিস্থিতি নিয়ে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করে বেতাগী উপজেলা ‘সুজন’র সভাপতি সাইদুল ইসলাম মন্টু বললেন, বিদ্যুৎ মানুষের মৌলিক চাহিদার অংশ। এক ঘণ্টা পর পর বিদ্যুৎ যাওয়া মানে ২৪ ঘণ্টার অর্ধেক সময় অন্ধকারের মধ্যে থাকা।
এ বিষয়ে পটুয়াখালী পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির বেতাগী সাব-জোনাল অফিসের সহকারী জেনারেল ম্যানেজার মো. মুনতাসির-বিন-হাসিব বললেন, প্রচ- গরম ও চাহিদার বিপরীতে জাতীয় গ্রিড থেকে বরাদ্দ অর্ধেকেরও কম থাকায় বাধ্য হয়ে লোডশেডিং দিতে হচ্ছে। গ্রাহকদের ভোগান্তি কমাতে শহরের পাশাপাশি গ্রামাঞ্চলেও বিদ্যুৎ সরবরাহ সহনীয় পর্যায়ে রাখার সর্বোচ্চ চেষ্টা চলছে। জাতীয় গ্রিড থেকে বরাদ্দ বাড়লে দ্রুতই এ সমস্যার সমাধান হবে।
উপজেলা নির্বাহী অফিসার মুহ. সাদ্দাম হোসেন বললেন, চাহিদার তুলনায় বিদ্যুৎ সরবরাহ কম থাকায় এ সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে ঘাটতির বিষয়টি ইতোমধ্যে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে।





