‘ওয়ান সিটি, টু টাউন’ মডেলে নতুন চট্টগ্রাম, শুরু ৬০ দিনের গণশুনানি

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
বন্দরনগরী চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা, যানজট ও অপরিকল্পিত নগরায়ণের সংকট থেকে উত্তরণের পথ খুঁজতে আরও এক পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ)। আগামী ২৫ বছরের উন্নয়ন রূপরেখা হিসেবে প্রণীত চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন মাস্টারপ্ল্যানের (২০২৫-২০৫০) সবচেয়ে আলোচিত প্রস্তাব ‘ওয়ান সিটি, টু টাউন’, যেখানে কর্ণফুলী নদীর দুই তীরকে সমন্বিত করে গড়ে তোলা হবে দুটি সমান্তরাল নগরকেন্দ্র।
আজ শনিবার থেকে শুরু হচ্ছে এই মহাপরিকল্পনার ওপর ৬০ দিনব্যাপী গণশুনানি ও জনমত গ্রহণ কার্যক্রম। চলবে আগামী ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত। সিডিএ ভবনে সরাসরি এবং অনলাইনে নাগরিকেরা নিজেদের মতামত, আপত্তি ও পরামর্শ জানাতে পারবেন।
গণশুনানির উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সিডিএ চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার বেলায়েত হোসেন বললেন, ‘বিগত কয়েক দশকের অপরিকল্পিত নগরায়ণের কারণে চট্টগ্রাম তার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, পাহাড়, খাল ও জলাধারের বড় অংশ হারিয়েছে। এবার সেই ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে পরিবেশ সংরক্ষণ, জলাবদ্ধতা নিরসন এবং পরিকল্পিত নগর ব্যবস্থাপনাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।’
মাস্টারপ্ল্যানে নতুন খাল খনন, আধুনিক ড্রেনেজ ব্যবস্থা, পাহাড় ও জলাশয় সংরক্ষণ, বিশেষ অ্যাকশন এরিয়া প্ল্যান এবং ভূমি মালিকদের অংশীদার করে উন্নয়ন বাস্তবায়নের মতো একাধিক নতুন উদ্যোগও রাখা হয়েছে। পাশাপাশি আনোয়ারা, পটিয়া, বোয়ালখালী, হাটহাজারী ও রাউজানসহ আশপাশের এলাকাকে সমন্বিত উন্নয়ন কাঠামোর আওতায় আনার প্রস্তাব রয়েছে।
সিডিএর প্রত্যাশা, নাগরিকদের সক্রিয় অংশগ্রহণে চূড়ান্ত হওয়া এই মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে আগামী দুই দশকের মধ্যে কর্ণফুলীর দুই তীরে গড়ে উঠবে একটি ভারসাম্যপূর্ণ, পরিবেশবান্ধব ও আধুনিক চট্টগ্রাম যেখানে ‘ওয়ান সিটি, টু টাউন’ হবে নগর উন্নয়নের নতুন মডেল।
২০২৫ থেকে ২০৫০ সাল পর্যন্ত মেয়াদি এই মহাপরিকল্পনায় চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের ৪১টি ওয়ার্ডসহ পার্শ্ববর্তী পৌরসভা ও উপজেলার প্রায় এক হাজার ২৫৫ বর্গকিলোমিটার এলাকা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। প্রকল্প বাস্তবায়নে ব্যয় ধরা হয়েছে তিন হাজার ৫৮৭ কোটি ৮৮ লাখ টাকা, যা সরকারি অর্থায়নে বাস্তবায়িত হচ্ছে। বর্তমানে প্রকল্পের ভৌত অগ্রগতি প্রায় ৯০ শতাংশ। আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে কাজ সম্পন্ন হওয়ার আশা করা হচ্ছে।
মহাপরিকল্পনায় ভূমি ব্যবহার, পরিবহন, জলাবদ্ধতা নিরসন, পরিবেশ সংরক্ষণ, আবাসন এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নসহ মোট ১৯টি খাতে ২৭৬টি উন্নয়ন প্রকল্প চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে পরিবহন খাতে ১০১টি এবং ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়নে ২১টি প্রকল্প রয়েছে।
সিডিএ জানিয়েছে, জনমত গ্রহণের জন্য নাগরিকরা ২ আগস্ট থেকে ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চউক ভবনে সরাসরি উপস্থিত হয়ে অথবা ডিজিটাল ওয়েব জিআইএস প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে মতামত ও আপত্তি জানাতে পারবেন।
পরিকল্পনায় পলিকেন্দ্রিক গ্রোথ মডেল বাস্তবায়নের পাশাপাশি কর্ণফুলী টানেল কেন্দ্র করে ওয়ান সিটি টু টাউন ধারণা বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে আনোয়ারার জন্য পৃথক অ্যাকশন এরিয়া প্ল্যান রাখা হয়েছে। জলাবদ্ধতা নিরসনে নগর এলাকায় ৩০ দশমিক ৪ কিলোমিটার এবং বৃহত্তর এলাকায় ১১১ দশমিক ৩ কিলোমিটার নতুন খাল খননের প্রস্তাব রয়েছে। এছাড়া ভূমি মালিকদের স্বার্থ সংরক্ষণে ট্রান্সফার অব ডেভেলপমেন্ট রাইটস (টিডিআর) গাইডেড ল্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ও ট্রাইপার্টাইট মডেল ব্যবহারের প্রস্তাব করা হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে সিডিএ চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. বেলায়েত হোসেন বললেন, ‘১৯৬১, ১৯৯৫ ও ২০০৮ সালের পর এটি চট্টগ্রামের চতুর্থ মহাপরিকল্পনা। একটি এলাকার সমস্যা সেই এলাকার মানুষই সবচেয়ে ভালো জানেন। তাই নাগরিকদের যৌক্তিক মতামত যাচাই-বাছাই করেই পরিকল্পনাটি চূড়ান্ত করা হবে।’
তিনি বললেন, ‘অতীতে উন্নয়নের নামে নগরীর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও পাহাড় ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এখন থেকে নকশার বাইরে কোনো ভবন নির্মাণ করতে দেওয়া হবে না। নতুন আইন অনুযায়ী নকশা লঙ্ঘনকারীদের বিদ্যুৎ ও পানির সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হবে। এ জন্য স্বরাষ্ট্র, আইন ও তথ্য মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে।’
‘আবাসিক এলাকায় অবৈধভাবে গড়ে ওঠা হাসপাতাল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কারণে সৃষ্ট যানজট নিরসনে ইতোমধ্যে এক মাসের সময় দেওয়া হয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ব্যবস্থা না নিলে প্রয়োজনীয় আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে’, যোগ করেন তিনি।
তিনি আশা প্রকাশ করেন, সংশ্লিষ্ট সব সেবা সংস্থার সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে চট্টগ্রামকে একটি সবুজ, নিরাপদ ও আন্তর্জাতিক মানের নান্দনিক মহানগরীতে রূপান্তর করা সম্ভব হবে।




