জীববৈচিত্র্য হুমকিতে ফেলে পার্ক

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীর বুকে জেগে ওঠা প্রকৃতির বিস্ময় ‘চর বাকলিয়া’। এটি ১৫৫ প্রজাতির উদ্ভিদ, বুনো প্রকৃতি, অসংখ্য দেশি ও পরিযায়ী পাখির মুক্ত আবাসস্থল। ১৯৩০ সালে কালুরঘাট সেতু তৈরির সময় সৃষ্টি হয় সবুজ এই চরের। ২০০ একর আয়তনের চর বাকলিয়ায় বর্জ্য শোধনাগার নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছিল চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন। কিন্তু নদীর প্রাণপ্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় পরিবেশকর্মীরা সোচ্চার হলে টনক নড়ে সরকারের। এরপর আসে উচ্চ আদালতের নিষেধাজ্ঞাও। এই প্রেক্ষাপটে জমি বরাদ্দ প্রস্তাব বাতিল করে ভূমি মন্ত্রণালয়।
সিটি করপোরেশন পিছু হটলেও দুই বছর পর চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ) সেই সবুজ চর নিয়ে নতুন স্বপ্ন দেখছে। তাদের পরিকল্পনা পরিবেশবান্ধব পর্যটন গড়া। সিডিএর প্রস্তাবিত মাস্টারপ্ল্যানে এখানে ‘প্রথম প্রাকৃতিক পার্ক’ গড়ে তোলার কথা বলা হয়েছে।
এ বিষয়ে আগামীর সময় কথা বলেছে কয়েকজন পরিবেশবিদের সঙ্গে। তারা বলছেন, প্রাকৃতিক পার্কের মোড়কে কেবল কার, সাফারি পার্ক ও রিসোর্টের মতো ভারী স্থাপনা নির্মাণ করা হলে চরের ১৫৫ প্রজাতির উদ্ভিদ ও বুনো প্রকৃতি চিরতরে হারিয়ে যাবে।
সিডিএ প্রণীত মাস্টারপ্ল্যানের ‘বাকলিয়া ও চর বাকলিয়া অ্যাকশন এরিয়া প্ল্যান’ অনুযায়ী, এই চরের ৩৮৫ একর খালি জমিকে উন্নয়নের জন্য বেছে নেওয়া হয়েছে। খসড়া নথিতে চরটিকে ‘চট্টগ্রামের প্রথম প্রাকৃতিক পার্ক’ হিসেবে গড়ে তোলার কথা বলা হলেও সেখানে প্রস্তাবিত অবকাঠামোগুলো রীতিমতো চমকে দেওয়ার মতো। মূল ভূখণ্ড থেকে চরে যাতায়াতের জন্য নদীর ওপর দিয়ে বিশাল ‘কেবল কার’ বা রোপওয়ে নির্মাণের প্রস্তাব করা হয়েছে। এ ছাড়া চরের ভেতর ‘স্কাই ডাইনিং’(শূন্যে ঝুলে থাকা রেস্তোরাঁ), প্যানোরামিক ওয়াচ টাওয়ার, বন্যপ্রাণী জাদুঘর, অ্যাকোয়ারিয়াম, ইকো-সায়েন্স সেন্টার এবং নদীমুখী ইকো-রিসোর্ট নির্মাণের কথা বলা হয়েছে। এমনকি প্রাকৃতিকভাবে গড়ে ওঠা চরের বনের পরিবর্তে সেখানে বিজ্ঞানী ও উদ্ভিদবিদদের দিয়ে একটি ‘ডিজাইন্ড ফরেস্ট’ বা কৃত্রিম বন তৈরির প্রস্তাবও রয়েছে।
নথিতে চরের বিদ্যমান প্রাণপ্রকৃতির কোনো বিস্তারিত তথ্য নেই। অথচ বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘ইকো’-এর ২০২২ সালের জরিপে সেখানে ১৫৫ প্রজাতির উদ্ভিদের সন্ধান পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ৬৪ প্রজাতির বৃক্ষ (শিরীষ, পাহাড়ি শিমুল, আম, জাম), ৭৭ প্রজাতির বিরুৎ ও গুল্ম (বেগুনি হুরহুরি, প্রাজাসেন্ট্রা, হরগোজা) এবং ১১৩ প্রজাতির মহামূল্যবান ঔষধি গাছ (আকন্দ, স্বর্ণলতা, ঘাগড়া) রয়েছে। এ ছাড়া দেশীয় ও পরিযায়ী পাখির দেখা মিলেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ‘ডিজাইন্ড ফরেস্ট’ তৈরির নামে বিদ্যমান ঝোপঝাড় ও বিরল গাছপালা কেটে পরিষ্কার করা হলে চরের দেশীয় ও পরিযায়ী পাখিরা তাদের আদি আবাসস্থল হারাবে।
মহাপরিকল্পনার নথিতেই চর বাকলিয়াকে ‘উচ্চমাত্রার বন্যা এবং নদীভাঙন ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এ ছাড়া ভূতাত্ত্বিকভাবে এই চরটি ‘সয়েল লিকুইফ্যাকশন’বা ভূমিকম্পের সময় মাটি তরল হয়ে ধসে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ওমর ফারুক রাসেল এই পরিকল্পনা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘যে নামেই পার্ক করা হোক, অবকাঠামো নির্মাণ হবে। এখানে বিপন্ন ও বিলুপ্তপ্রায় অনেক উদ্ভিদ আছে। এগুলো হুমকির মুখে পড়বে। পাশাপাশি এখানে দেশীয় প্রচুর পাখি দেখেছি। পরিযায়ী পাখিও আসে। পাখির আবাস নষ্ট হবে। মানুষের যাতায়াত হলে স্বাভাবিকভাবে যে বুনো প্রকৃতি আছে, তা অক্ষত থাকবে না।’
প্রকৃতির ক্ষতির আশঙ্কা নাকচ করে দিলেন মহাপরিকল্পনার প্রকল্প পরিচালক ও সিডিএর উপপ্রধান ৪ নগর পরিকল্পনাবিদ মো. আবু ঈসা আনছারী। তিনি বলেছেন, ‘প্রকৃতিকে বিরক্ত না করেই এখানে পার্ক প্রস্তাব করা হয়েছে। সাফারি পার্কের আদলে প্রকৃতি উপভোগ করবেন সাধারণ মানুষ। যেসব অবকাঠামো প্রস্তাব করা হয়েছে, সেগুলো বাস্তবায়নের আগে ফিজিবিলিটি স্টাডি (সম্ভাব্যতা যাচাই) করা হবে। ফিজিবল না হলে বাস্তবায়ন করা হবে না।’
এর আগে চর বাকলিয়া মৌজায় (বিএস ১ নম্বর খতিয়ানভুক্ত ৫৪৪ নম্বর দাগের ৩৫ একর জমি) একটি বর্জ্য শোধনাগার স্থাপনের জন্য জমি বরাদ্দ চেয়েছিল চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন। জমি বরাদ্দ দেওয়ার আগে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের মতামত চায় ভূমি মন্ত্রণালয়। জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের সিভিল পিটিশন নম্বর ৩০৩৯/২০১৯-এর রায়ের আদেশ উল্লেখ মতামতে বলেছে, এই রায়ে নদীর জমি বন্দোবস্ত দেওয়ার ক্ষেত্রে স্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। যেখানে বলা হয়েছে পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য ও বাস্তুসংস্থান সুরক্ষায় তুরাগ নদসহ দেশের যেকোনো নদীর তীরসহ সীমানার ভেতরের জমি সরকার কোনো অবস্থাতেই ইজারা বা বিক্রি করতে পারবে না। ফলে কর্ণফুলী নদীর চরে বর্জ্য শোধনাগার স্থাপন করা হলে নদীর পানি দূষিত হওয়ার পাশাপাশি পরিবেশ ও প্রতিবেশের মারাত্মক ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে। ২০২৪ সালের ৮ সেপ্টেম্বর ভূমি মন্ত্রণালয়ের এক চিঠিতে ওই ভূমি বরাদ্দের প্রস্তাব সরাসরি ‘নামঞ্জুর’ করা হয়।






