মৃত ও প্রবাসীকে শ্রমিক দেখিয়ে অর্থ আত্মসাৎ: আ লীগ নেতার বিরুদ্ধে ২ মামলা

এনায়েত হোসেন নয়ন
মীরসরাইয়ের করের হাট ইউনিয়নের পশ্চিম জোয়ার এলাকার মোহাম্মদ হারুন ২০১৮ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর মারা যান। মৃত্যুর পর ২০১৯ সালের ২৯ এপ্রিল থেকে ২০২১ সালের ২৯ জুন পযৃন্ত তার ব্যাংক হিসাব থেকে ৪০ হাজার ৫০০ টাকা উত্তোলন করা হয়। বিষয়টি জেনে স্ত্রী হাসিনা বেগম অবাক হন। একই এলাকার মোস্তফার মৃত্যুর পর উত্তোলন করা হয় ২৪ হাজার টাকা। যা তার স্ত্রী শামসুন নাহার জানেন না।
এভাবে ভুয়া শ্রমিক দেখিয়ে, তাদের নামে টাকা তুলে কিংবা শ্রমিকদের মজুরি পরিশোধ না করে ইজিপিপি প্রকল্পের ৩০ লাখ ৮৮ হাজার টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে মিরসরাই ১ নম্বর করেরহাট ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান মো. এনায়েত হোসেন নয়নের বিরুদ্ধে। এ ছাড়া প্রকল্প বাস্তবায়ন না করে ভুয়া ভাউচারে ১ শতাংশ করের অর্থে নেওয়া উন্নয়ন প্রকল্পের ৮৭ লাখ ৮০ হাজার ৫৮৩ টাকা আত্মসাত করার অভিযোগও পাওয়া গেছে উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের এই নেতা এবং তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে।
এই দুটি অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে আজ বৃহস্পতিবার দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), সমন্বিত জেলা কার্যালয়, চট্টগ্রাম-২ এ নয়ন ও সহযোগীদের বিরুদ্ধে দুটি মামলা হয়েছে। প্রথম মামলায় নয়নসহ ১২ জন এবং দ্বিতীয় মামলায় নয়নসহ ১০ জনকে আসামি করা হয়। দুদকের উপসহকারী পরিচালক মো. জসিম উদ্দিন মামলা দুটি করেন। এনায়েত উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ক সম্পাদক।
দুদকের উপ সহকারী পরিচালক জসিম উদ্দিন আগামীর সময়কে জানান, এনায়েত ও সহযোগীরা মৃত এবং প্রবাসীদের শ্রমিক দেখিয়ে তাদের নামে টাকা উত্তোলন করেছেন। দ্বিতীয় মামলায় ২০১৭ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত বাস্তবায়নের জন্য নেওয়া বিভিন্ন প্রকল্পে অনিয়ম, জাল ভাউচার তৈরি ও ব্যবহারের অভিযোগ আনা হয়েছে তাদের বিরুদ্ধে।
দুটি মামলায় উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান মো. এনায়েত হোসেন নয়ন (৫২) প্রধান আসামি। উপজেলা চেয়ারম্যানের আগে করেরহাট ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান থাকাকালে তার বিরুদ্ধে এসব দুর্নীতির অভিযোগ আনা হয়।
অপর আসামিদের মধ্যে ১০ জন সাবেক ইউপি সদস্য রয়েছেন। তারা হলেন কল্পনা রানী চক্রবর্তী (৪৯), শেলী মজুমদার (৬৫), তাহেরা বেগম (৬৩), মো. শহীদ উল্লাহ (৫৩), মো. বেলাল উদ্দিন (৫৬), পেয়ার মিয়া মিন্টু, মো. মহিউদ্দিন (৬৯), সফি আহাম্মদ (৬৫), আজাদ উদ্দিন ও কোরবান আলী। ১২ নম্বর আসামি হলেন সাবেক উপসহকারী প্রকৌশলী মিলন বড়াল (৪২)।
অপর মামলায় নয়ন ছাড়া আসামিরা হলেন ইউনিয়নের সাবেক সংরক্ষিত নারী সদস্য কল্পনা রানী চক্রবর্তী, শেলী মজুমদার ও তাহেরা বেগম এবং সাবেক ইউপি সদস্য মো. আবু তাহের (মাস্টার), মো. শহীদ উল্লাহ, মো. বেলাল উদ্দিন, পেয়ার মিয়া মিন্টু, মো. আজাদ উদ্দিন ও কোরবান আলী।
মামলার এজাহার অনুযায়ী, ২০১৭-১৮ থেকে ২০২১-২২ অর্থবছর পর্যন্ত করেরহাট ইউনিয়ন পরিষদের ১ শতাংশ করের অর্থে বাস্তবায়নের জন্য নেওয়া বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের নথিপত্র যাচাই এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য গ্রহণ করে অনিয়মের প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়া যায়।
অভিযোগে বলা হয়েছে, প্রকল্প বাস্তবায়ন না করেও ভুয়া ভাউচার তৈরি করে অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে। ভাউচারে উল্লেখ করা কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের মালিক দুদকের অনুসন্ধানকারীদের জানিয়েছেন, সেখানে থাকা লেখা ও স্বাক্ষর তাদের নয়।
এজাহারে উল্লেখ করা হয়, ১ শতাংশ করের অর্থে নেওয়া ৫৫টি প্রকল্প বাস্তবায়ন ও তদারকির দায়িত্বে ছিলেন সাবেক চেয়ারম্যান মো. এনায়েত হোসেন নয়ন এবং সংশ্লিষ্ট ইউপি সদস্যরা। তাদের পারস্পরিক যোগসাজশে প্রকল্পের অর্থ আত্মসাত করা হয়েছে বলে বাদী উল্লেখ করেন।
অন্যদিকে ইজিপিপি (দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে পরিচালিত একটি সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি) প্রকল্পে ৩০ লাখ ৮৮ হাজার আত্মসাতের সময় ভুয়া এবং মৃত মানুষদের শ্রমিক হিসেবে দেখিয়ে অর্থ আত্মসাত করা হয়েছে বলে অভিযোগ আনা হয়। এ ছাড়া এর মধ্যে প্রবাসীও রয়েছে।
দুদকের কর্মকর্তা জসিম উদ্দিন আগামীর সময়কে বলেন, অনুসন্ধানের সময় তারা ৫৮ জন শ্রমিক বা শ্রমিকের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। তাদের মধ্যে কেউ কেউ মৃত এবং কেউ কেউ বিদেশে। তাদের নামে টাকা তোলার বিষয়টি পরিবারের সদস্যরা জানেন না।
এজাহারে বলা হয়, ৪৫০ জন বা তদুর্ধ্ব উপকারডোগী শ্রমিকের মধ্য থেকে প্রায় ৫৮ জন শ্রমিকের জবানবন্দী গ্রহণ করা হয়। ঘটনাস্থল পরিদর্শন ও জবানবন্দি গ্রহণ শেষে প্রমাণিত হয় যে, উক্ত প্রকল্পের শ্রমিকদের মধ্যে মৃত, প্রবাসী, ব্যবসায়ী, রাজনৈতিক নেতা, ইউপি মহিলা সদস্য, একই শ্রমিকের দ্বৈত তালিকা এবং এক পরিবারের একাধিক সদস্য রয়েছেন।



