চট্টগ্রাম
বাঁচার আশায় আইসিইউর অপেক্ষায় শিশুরা

ছবি: আগামীর সময়
স্বজন ত্রিপুরার বাড়ি চট্টগ্রামের ফটিকছড়িতে। পেশায় তিনি কাঠমিস্ত্রি। শিশুদের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের (পিআইসিইউ) সামনে দাঁড়িয়ে আছেন। ভেতরে তার সাড়ে ৮ মাস বয়সী ছেলে আর্য ত্রিপুরা চিকিৎসাধীন। একটু পরপর স্ত্রী ভেতর থেকে এসে এটা লাগবে, ওটা লাগবে বলে জানিয়ে যাচ্ছেন। স্ত্রীর ফরমায়েশ পেয়ে স্বজন ত্রিপুরা ছুটছেন।
২০ দিন আগে ছেলেকে সুস্থ করে এই হাসপাতাল থেকে খুশি মনে বাড়ি ফিরেছিলেন স্বজন ত্রিপুরা। আবার অসুস্থ হয়ে পড়ায় গত শনিবার তাকে হাসপাতালে নিয়ে আসেন। চিকিৎসকরা হামে আক্রান্ত শিশুটিকে আইসিইউতে ভর্তি করানোর পরামর্শ দেন। রবিবার তারা আইসিইউ পান।
স্বজন ত্রিপুরা বলেছেন, ‘আমাকে আইসিইউর জন্য বেশি অপেক্ষা করতে হয়নি। রাতে বলার পর সকালেই পেয়ে গেছি।’
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের পিআইসিইউতে হাম রোগীদের জন্য শয্যা রয়েছে ১৫টি। হাসপাতালটিতে চিকিৎসাধীন প্রায় ১৪০ জন হাম রোগীর জন্য ১৫টি আইসিইউ প্রয়োজনের তুলনায় একেবারেই কম। এ কারণে অন্তত ৭ থেকে ৮ জন রোগীকে সবসময় আইসিইউর জন্য এক থেকে দুদিন অপেক্ষার তালিকায় থাকতে হয়। আইসিইউতে কোনো শিশু কিছুটা সুস্থ হয়ে সাধারণ শয্যায় গেলে একটি শয্যা খালি হয়। নতুবা কেউ মারা গেলে শয্যা খালি হয়।
হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ তসলিম উদ্দিনের সঙ্গে এ বিষয়ে কথা হয়। তিনি জানালেন, ‘এখনো হাম রোগী কমেনি। প্রতিদিন গড়ে ২৫ থেকে ৩০ জন ভর্তি হচ্ছে। আমাদের আইসিইউ শয্যা ১৫টি। শয্যা খালি থাকে না। কাউকে আইসিইউ থেকে নামিয়েও দেওয়া যায় না। তাই অপেক্ষা করতে হয়।’
চিকিৎসক ও স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সাধারণত এক থেকে দুই দিন শিশুদের আইসিইউর জন্য অপেক্ষা করতে হয়। হাম বা হামের উপসর্গ নিয়ে প্রতিদিনই ১ থেকে ৩ জন মারা যায়। এসব রোগী সাধারণত আইসিইউতেই মারা যায়। তখন অন্য রোগীকে সেখানে দেওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়। আইসিইউর অপেক্ষায় থাকতে থাকতে অনেক রোগী আরও সংকটাপন্ন হয়ে পড়ে।
হালিশহরের পায়েল উদ্দিনের দেড় বছর বয়সী ছেলে জায়েফ এতদিন আগ্রাবাদ মা ও শিশু জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিল। সেখানে তাকে আইসিইউতে দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। আইসিইউ না পেয়ে রবিবার বিকালে জায়েফকে চমেক হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়। শিশুটি আজ সোমবার সকালে হাম ব্লকে ছিল। পায়েল উদ্দিন বলেছেন, ‘ওখানে আইসিইউর জন্য বলা হয়েছিল। এখানে আজ সকালে ডাক্তার দেখবেন। এরপর সিদ্ধান্ত দেবেন।’
শিশুদের আইসিইউর এক নারী চিকিৎসক নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানালেন, সেখানে কোনো শয্যা খালি নেই। সবসময় অন্তত ৭ থেকে ৮ জন রোগী অপেক্ষায় থাকে।
চিকিৎসকরা জানালেন, হাসপাতালে তারা রোগী ফেরত দিতে পারেন না। মেঝেতে শয্যা পেতে হলেও রোগীদের রাখতে হয়। কিন্তু আইসিইউতে কাউকে বের করে শয্যা দেওয়ার সুযোগ নেই। তখন ওয়ার্ডে অক্সিজেন কিংবা হাই-ফ্লো ন্যাজাল ক্যানুলার মাধ্যমে তাদের চিকিৎসা দেওয়া হয়।
চমেক হাসপাতালে প্রতিদিন গড়ে ১৩০ থেকে ১৪০ জন হামে আক্রান্ত রোগী ভর্তি থাকে। এর বেশিরভাগই শিশু। হাসপাতালের ৯ নম্বর শিশুস্বাস্থ্য বিভাগের দুটি কাচঘেরা ব্লকে ১৭টি শয্যায় রাখা হয়েছে ৪০ জনের বেশি আক্রান্ত শিশুকে। বেড না থাকায় কেউ মেঝেতে চিকিৎসা নিচ্ছে। এ ছাড়া নিচতলার হাম ব্লকেও দেখা গেছে আরও ৮০ থেকে ৯০ জন রোগী।
একটি বিষয় উল্লেখ করা প্রয়োজন। সমগ্র চট্টগ্রামে হাম রোগীর হিসাব সংরক্ষণ করে সিভিল সার্জন কার্যালয়। তাদের তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত প্রায় তিন হাজার রোগী হাম বা হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। এ পর্যন্ত ১৩ জন মারা গেছে। তবে বেসরকারি হিসাবে হাম ও হামের উপসর্গে আক্রান্ত এবং মৃত্যুর সংখ্যা কয়েক গুণ বেশি।




