সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়
শহরে শিক্ষকের ভিড়, গ্রামে ফাঁকা!

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
চট্টগ্রামের সন্দ্বীপ উপজেলার কারগিল সরকারি পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ে অনুমোদিত শিক্ষক পদ রয়েছে ১৫টি। এর মধ্যে ১২টি পদই শূন্য। বিদ্যালয়ে বাংলা, ইংরেজি ও গণিতের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের প্রতিটিতে দুটি করে অনুমোদিত পদ থাকলেও বর্তমানে কোনো শিক্ষক কর্মরত নেই। অন্যদিকে চট্টগ্রাম শহরের কলেজিয়েট স্কুলে ইংরেজির আটটি অনুমোদিত পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন ১০ জন শিক্ষক। এক জেলার দুটি পৃথক সরকারি বিদ্যালয়ের চিত্র এটি।
মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) চট্টগ্রাম অঞ্চলের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, দুর্গম ও প্রত্যন্ত এলাকার বিদ্যালয়গুলোতে অনুমোদিত পদের বড় অংশই দীর্ঘদিন শূন্য। বিপরীতে শহরের কয়েকটি বিদ্যালয়ে অনুমোদিত পদের চেয়েও বেশি শিক্ষক কর্মরত।
দুর্গম এলাকায় শূন্য পদের বেশি
মাউশি চট্টগ্রাম অঞ্চলের অধীনে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি, বান্দরবান, ফেনী ও নোয়াখালী জেলা রয়েছে। এই সাত জেলার ৫২টি সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ১ হাজার ৫৫৫ অনুমোদিত শিক্ষক পদের মধ্যে ৫৫৮ পদই শূন্য। মোট পদের ৩৫ দশমিক ৮৮ শতাংশ ফাঁকা।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সবচেয়ে বেশি শিক্ষকস্বল্পতা পার্বত্য তিন জেলা খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি ও বান্দরবানে। এসব জেলার তালিকাভুক্ত সরকারি বিদ্যালয়গুলোতে প্রায় অর্ধেক শিক্ষক পদ শূন্য। সমতলের জেলাগুলোর মধ্যে নোয়াখালীর ১২টি সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ৩০৩টি অনুমোদিত পদের বিপরীতে ১৩০টি শূন্য। অর্থ্যাৎ ৪৩ শতাংশ শিক্ষক পদ শূন্য এ জেলায়। কক্সবাজারের ছয়টি বিদ্যালয়ে ১৬৮ পদের মধ্যে ৬৪টি (৩৮ দশমিক ১ শতাংশ) এবং ফেনীর দুটি বিদ্যালয়ে ৯৮ পদের মধ্যে ৩৩ (৩৩ দশমিক ৭ শতাংশ) পদ ফাঁকা রয়েছে। চট্টগ্রাম জেলার সার্বিক চিত্র কিছুটা ভালো হলেও এখানকার ১৩টি বিদ্যালয়ে ৪৬৩টি পদের মধ্যে ৭৫ শূন্য রয়েছে।
শহরের বিদ্যালয়ে অতিরিক্ত শিক্ষক
প্রত্যন্ত অঞ্চলে যখন শিক্ষকের অভাবে পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে, তখন চট্টগ্রাম শহরের কয়েকটি সরকারি বিদ্যালয়ে ভিন্ন চিত্র দেখা গেছে। চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুলের পাশাপাশি সরকারি মুসলিম হাই স্কুলে গণিতে ছয়টি পদের বিপরীতে আটজন এবং সামাজিক বিজ্ঞানে চারটির বিপরীতে শিক্ষক কর্মরত আছেন পাঁচজন।
একইভাবে চট্টগ্রাম সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে ইংরেজিতে আটটি পদের বিপরীতে নয়জন এবং গণিতে ছয়টির বিপরীতে নয়জন শিক্ষক আছেন। নাসিরাবাদ সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে সামাজিক বিজ্ঞানের চারটি অনুমোদিত পদের বিপরীতে আটজন শিক্ষক কর্মরত আছেন।
পাঠদানে সংকট ও ফলাফলে প্রভাব
শিক্ষক শূন্যতার সরাসরি প্রভাব পড়ছে শিক্ষার্থীদের পাঠদান ও ফলাফলে। বিদ্যালয়গুলোতে ইংরেজি, গণিত, ভৌত বিজ্ঞান, জীববিজ্ঞান ও সামাজিক বিজ্ঞানের মতো বিষয়গুলোতে শিক্ষকের পদ সবচেয়ে বেশি খালি। অনেক বিদ্যালয়ে একজন শিক্ষককে একাধিক বিষয়ের ক্লাস নিতে হচ্ছে।
বাংলাদেশ শিক্ষাতথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) ২০২৪ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গণিত ও ইংরেজি বিষয়ের ৮০ শতাংশের বেশি শিক্ষকের সংশ্লিষ্ট বিষয়ে স্নাতক বা স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নেই।
শিক্ষকস্বল্পতা ও বিষয়ভিত্তিক শিক্ষকের অভাবের চিত্রটি সর্বশেষ ২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষার ফলাফলেও প্রতিফলন হয়েছে। এই বছর চট্টগ্রাম বোর্ডে পাসের হার ছিল ৫৯ দশমিক ৪৮ শতাংশ। এর মধ্যে শুধু ইংরেজি ও গণিতেই অকৃতকার্য হয়েছে ৪৭ শতাংশ শিক্ষার্থী। শতভাগ পাস করতে পারেনি এমন আটটি বিদ্যালয়ের সবগুলোই পার্বত্য ও দুর্গম উপকূলীয় অঞ্চলে অবস্থিত।
যা বলছেন সংশ্লিষ্টরা
শিক্ষকদের এমন অসম বণ্টনের বিষয়ে মাউশি চট্টগ্রাম অঞ্চলের সহকারী পরিচালক (কলেজ) মোহাম্মদ সোহরাব হোসাইন বললেন, ‘সবকিছু শহরকেন্দ্রিক হয়ে যাওয়ার কারণে শিক্ষকরা শহরেই থাকতে চান। পার্বত্য অঞ্চল বা প্রত্যন্ত এলাকায় এখনো কোনো কোনো ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত নাগরিক সুবিধা পেতে বেগ পেতে হয়। এ কারণে শিক্ষকরা ওই অঞ্চলগুলোতে যেতে চান না।’
শূন্য পদে নিয়োগ পাওয়ার পর অনেক শিক্ষক রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে শহরে বদলি হয়ে চলে আসেন বলে মনে করেন একুশে পদকপ্রাপ্ত শিক্ষাবিদ আবুল মোমেন। তিনি বলেছেন,‘শিক্ষকেরা দুর্গম এলাকায় থাকতে চান না। সরকার থেকে যদি তাদের নাগরিক জীবন সহজ করতে বিশেষ কোনো ভাতা চালু করা যায়, তাহলে শহর ও পার্বত্য অঞ্চলে শিক্ষক বণ্টনে একটি ভারসাম্য আসতে পারে। এতে শিক্ষার্থী এবং পুরো শিক্ষাব্যবস্থা লাভবান হবে।’



