চট্টগ্রাম নগর
বিএনপিতেও হাইব্রিড!
- দুঃসময়ে রাজপথের দলীয় কর্মসূচিতে না থাকা অনেকেই এখন ক্ষমতাবলয়ে
- পাড়া-মহল্লায় নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সঙ্গে থাকা একটি অংশ বিএনপির বিভিন্ন স্তরে ভিড়ে জড়াচ্ছে অপরাধে
- কোথাও দখল, কোথাও চাঁদাবাজি, আবার কোথাও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে জড়াচ্ছে বিতর্কে
- বিএনপির কিছু নেতাকর্মী ‘গ্রুপ’ ভারী করার জন্য তাদের দিচ্ছেন আশ্রয়-প্রশ্রয়

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
গণআন্দোলনে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের শাসনামলে দলটির ভেতরে অন্য দলের নেতাকর্মীর আশ্রয় বা অনুপ্রবেশের ঘটনা ছিল বেশ আলোচিত। বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ দলটির নেতাদের মুখে মুখে তখন ‘হাইব্রিড’, ‘কাউয়া’— এসব শব্দ উচ্চারিত প্রায়ই হতো। সেই থেকে সাধারণ মানুষের মুখেও হাইব্রিড-কাউয়া শব্দগুলো হাস্যরস কিংবা উপমা হিসেবে ব্যবহার হয়ে আসছিল।
দীর্ঘ বিরতি শেষে রাষ্ট্রক্ষমতায় আসার পর চট্টগ্রামে বিএনপিও এখন একই ‘হাইব্রিড’ সংকটের মুখে। সর্বশেষ নগরীর বায়েজিদ বোস্তামী এলাকায় আবু ইউসুফ জীবন নামে এক যুবদল কর্মী খুনের পর অনুপ্রবেশকারী কিংবা হাইব্রিডের বিষয়টি আরও জোরেশোরে আলোচিত হচ্ছে। যিনি একসময় দাপুটে যুবলীগ নেতা ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের সাবেক কাউন্সিলর মোবারক আলীর কর্মী হিসেবে পরিচিত ছিলেন। জীবনের বিরুদ্ধেও অপরাধ কর্মকাণ্ডের বিস্তর অভিযোগ।
রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর পাড়া-মহল্লায় নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সঙ্গে থাকা একটি অংশ বিএনপির বিভিন্ন স্তরে ভিড়ে অপরাধে জড়াচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। কোথাও দখল, কোথাও চাঁদাবাজি, আবার কোথাও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে জড়াচ্ছে বিতর্কে। বিএনপির কিছু নেতাকর্মী ‘গ্রুপ’ ভারী করার জন্য তাদের দিচ্ছেন আশ্রয়-প্রশ্রয়।
নগর বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের কয়েকজন নেতা আলাপে বলছিলেন, গত ২০ অক্টোবর দুর্গাপূজা পরিদর্শনে আসা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান চট্টগ্রামের নেতাদের নিয়ে সাংগঠনিক বৈঠকে বসেছিলেন। বৈঠকে দলের ভেতরে চিহ্নিত অপরাধী কিংবা নেতিবাচক ভাবমূর্তির লোকজনকে আশ্রয় না দেওয়ার বিষয়টি আলোচিত হয়। বিএনপি চেয়ারপারসন তারেক রহমান স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে দলের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয় এমন কোনো কর্মকাণ্ডের বিষয়ে সতর্ক থাকতে পরামর্শ দেন নেতাদের।
অনুপ্রবেশ নিয়ে বিব্রতকর পরিস্থিতির বিষয়টি অস্বীকার না করলেও একধরনের ব্যাখ্যা দিয়েছেন চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির সদস্য সচিব নাজিমুর রহমান। আগামীর সময়কে বললেন, ‘বিএনপি একটি গণমানুষের দল। কেউ দলে যোগ দিতে চাইলে আমরা তো বাধা দিতে পারি না। কিন্তু চিহ্নিত অপরাধী, গুপ্ত কেউ যাতে দলে অনুপ্রবেশ করতে না পারে, সেটি দেখবেন থানা-ওয়ার্ড লেভেলের নেতারা। আমাদের কাছে অনুপ্রবেশকারী কিংবা হাইব্রিড হচ্ছে তারাই যারা ক্রিমিনাল। ভালো মানুষ সেটি যে দলেরই হোক, এমনকি নিষিদ্ধ দলের হলেও তাদের বাধা দেওয়ার কিছু নেই বলে আমার ব্যক্তিগত মত।’
তারেক রহমানের উপস্থিতিতে সাংগঠনিক বৈঠকের এক সপ্তাহের মাথায় নগরীর বায়েজিদ বোস্তামী থানার কুঞ্জছায়া আবাসিক এলাকায় যুবদল কর্মী আবু ইউসুফ জীবন অন্তর্দ্বন্দ্বে খুন হওয়ার ঘটনা ঘটল। এ ঘটনায় চট্টগ্রাম মহানগর যুবদলের প্রচার সম্পাদক জিল্লুর রহমান জুয়েলকে প্রধান আসামি করে মামলা করেন তার মা। জীবনের মৃত্যুর পর তার সঙ্গে সাবেক কাউন্সিলর মোবারক আলীর বিভিন্ন ছবি ফেসবুকে ঘুরছে।
বায়েজিদ বোস্তামী থানার ওসি ইখতিয়ার উদ্দিন বললেন, ‘জীবনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অপরাধের অভিযোগ থানায় আছে। এলাকার লোকজন বলছেন, আগে সে আওয়ামী লীগের কর্মী পরিচয় দিত। দুই বছর আগে যুবদলের সঙ্গে যুক্ত হয়। তবে হত্যাকাণ্ড রাজনৈতিক বিরোধের জেরে হয়েছে কি না এখনো আমরা নিশ্চিত নই।’
নগর যুবদলের এক নেতা বলছিলেন, ‘জীবন ছিল পলাতক মোবারক আলীর ক্যাডার। চব্বিশের আগস্টের পর যুবদলে ভিড়েছে। এলাকাভিত্তিক ছেলেদের মধ্যে বন্ধুত্ব থাকে। ঘনিষ্ঠতা থাকে। কে কার সাথে এসে দলের পরিচয় দিচ্ছে সেটা নেতা নিজেও জানে না। এমন অনেক তরুণ, যুবক নতুন করে দলে ঢুকে পড়েছে। বাকলিয়া, বায়েজিদ বোস্তামী, স্টেশন রোড, রিয়াজউদ্দিন বাজার, চকবাজার, হালিশহর এলাকায় সবচেয়ে বেশি। এর ফলে তৃণমূলে সাংগঠনিক শৃঙ্খলা নষ্ট হচ্ছে।’
নগর স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্য সচিব জমির উদ্দিন নাহিদের ভাষ্য, ‘বিগত সময়ে ফ্যাসিবাদী দলের সঙ্গে থাকা কেউ কেউ গুপ্ত-সুপ্ত হয়ে আমাদের দলে ঢুকে যাচ্ছে। আবার আমাদের কিছু নেতার ভাই-ব্রাদারও আছেন যারা একসময় ফ্যাসিবাদী দলের সঙ্গে ছিলেন। নেতাদের কেউ কেউ তাদের শেল্টার দিচ্ছেন। এগুলো একেবারেই অনভিপ্রেত। এসব অনুপ্রবেশকারী, হাইব্রিডরা আমাদের দলে ঢুকে গ্রুপিং তৈরি করছে। বিভিন্ন অপরাধ করে ভাবমূর্তি নষ্ট করছে। স্বেচ্ছাসেবক দল থেকে কঠোর বার্তা দেওয়া আছে তাদের বিরুদ্ধে। প্রচলিত আইনেও তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।’
২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে নগরীর চান্দগাঁও থানা এলাকায় যুবদলের দুই গ্রুপের সংঘর্ষে নিহত হয়েছিলেন জুবায়ের নামে এক যুবদল কর্মী। এর জেরে বিলুপ্ত করা হয়েছিল নগর যুবদলের কমিটি। সেই কমিটির সাধারণ সম্পাদক মুহাম্মদ শাহেদ তখন জানিয়েছিলেন, যুবলীগের কর্মী ছিলেন জুবায়ের। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পরপরই নিজেকে যুবদল কর্মী বলে পরিচয় দেওয়া শুরু করেছিলেন।
২০২৫ সালের ২৭ অক্টোবর রাতে নগরীর বাকলিয়া থানার সৈয়দ শাহ রোডে যুবদলের দুই গ্রুপে দফায় দফায় গোলাগুলির ঘটনা ঘটে। এতে মোহাম্মদ সাজ্জাদ (২৩) নামে এক ছাত্রদলকর্মী নিহত হন। সংঘাতে একপক্ষে নেতৃত্বদাতা যুবদল নেতা বোরহান উদ্দিন আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে নিজেকে বাকলিয়া থানা যুবলীগের নেতা হিসেবে পরিচয় দিতেন। আলোচিত ছিলেন চিহ্নিত মাদক কারবারি ও কিশোর গ্যাং লিডার হিসেবে। সাজ্জাদ হত্যাকাণ্ডের পর তখনকার সিটি মেয়র শাহাদাত হোসেন অভিযোগ করেছিলেন, বোরহান ও তার সহযোগীরা যুবদলের পরিচয় দিলেও তারা একসময় ছাত্রলীগ-যুবলীগ করতেন। তাদের নেতৃত্বে বাকলিয়া এক্সেস রোডসহ আশপাশের এলাকায় বিশাল একটি সন্ত্রাসী গ্রুপ গড়ে ওঠার অভিযোগ করেছিলেন মেয়র।
গত ১২ ফেব্রুয়ারির সংসদ নির্বাচনের পর থেকে আট মাসে চট্টগ্রাম নগরীতে অন্তত আটটি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। যার নেপথ্যে রয়েছে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা। নগর পুলিশের একজন উপকমিশনার বলছিলেন, ‘নগরীর রিয়াজউদ্দিন বাজার, নিউ মার্কেট, বহদ্দারহাট, বাকলিয়া এক্সেস রোড, আগ্রাবাদ এক্সেস রোড, বায়েজিদসহ বিভিন্ন এলাকায় ফুটপাত ও ব্যবসা দখল, পরিবহন স্ট্যান্ড নিয়ন্ত্রণ, চাঁদাবাজি ও অভ্যন্তরীণ মহড়ায় ব্যবহৃত হচ্ছে কিশোর গ্যাং সদস্যরা। তাদের অনেকেই আগে যুবলীগ-ছাত্রলীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে চলত।’
নগর পুলিশের সহকারী কমিশনার (মিডিয়া) আমিনুর রশিদ আগামীর সময়কে বললেন, ‘যেকোনো ঘটনার পর মামলা নেওয়া হচ্ছে। জড়িতদের গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। কারও রাজনৈতিক পরিচয় প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে না।’
দলে অনুপ্রবেশকারী নিয়ে আওয়ামী লীগ আমলে মামলা-গ্রেপ্তারের শিকার বিএনপি নেতাকর্মীদের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে। দলের ভাবমূর্তি রক্ষা ও অপরাধীদের লাগাম টানতে অনুপ্রবেশকারীদের চিহ্নিত করে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি উঠেছে।
চট্টগ্রাম মহানগর যুবদলের সাধারণ সম্পাদক মুহাম্মদ শাহেদ আগামীর সময়কে বললেন, ‘আমাদের প্রত্যেক সাংগঠনিক মিটিংয়ে আমরা কঠোরভাবে বলে দিই, যেকোনো হাইব্রিড, অনুপ্রবেশকারীকে সংগঠনে জায়গা দেওয়া যাবে না। নতুন কাউকে সংগঠনের পরিচয় ব্যবহার করতে দেওয়া যাবে না। প্রয়োজনে পাঁচজন নিয়ে সংগঠন করব। যারা ফ্যাসিস্ট আমলে একসঙ্গে ছিলাম তারাই সংগঠন করব। কিন্তু সুসময়ে নতুন কাউকে এনে সংগঠনের ভাবমূর্তি আমরা ক্ষুণ্ন হতে দেব না।’
যাদের দুঃসময়ে রাজপথের দলীয় কর্মসূচিতে দেখা যায়নি তাদের অনেকেই এখন ক্ষমতাবলয়ে জানিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করলেন নগর ছাত্রদলের সাবেক সহসভাপতি সৌরভপ্রিয় পাল। বললেন, ‘২০২৩ সালের ২৮ অক্টোবর পুলিশের গুলির মুখে জীবনবাজি রেখে ঢাকার রাজপথে ছিলাম। সেদিন মৃত্যু হলে এখন তৃতীয় মৃত্যুবার্ষিকী হতো। দুঃখের বিষয় সেদিন যাদের আমরা রাজপথে দেখিনি তাদের অনেকে এখন ক্ষমতার অনেক কাছে। আর আমরা এখনো রাজপথে। আমাদের ১৭ বছরের সবকিছু এখন হাইব্রিডদের দখলে।’





