মানে শ্রীলঙ্কা থেকেও পিছিয়ে দেশের বিমানবন্দর, পয়েন্ট বাড়াতে তোড়জোড়
- অডিট করতে কানাডা থেকে আসছে সিভিল অ্যাভিয়েশন টিম

সংগৃহীত ছবি
আন্তর্জাতিক অ্যাভিয়েশন সিস্টেমে একটি বিমানবন্দর চালাতে ১০০ পয়েন্ট বা স্কোরের মধ্যে কমপক্ষে ৬৫ থাকতে হয়। যেখানে বাংলাদেশের স্কোর ৬৮। সবশেষ ২০১৮ সালে এ স্কোর হিসাব করা হয়েছিল। অর্থাৎ, ন্যূনতম স্কোর থেকে মাত্র ৩ পয়েন্ট বেশি ছিল বাংলাদেশের সূচক। এখন কোন স্তরে রয়েছে, তা যাচাই করতে কানাডার মন্ট্রিল থেকে সাত সদস্যের টিম আসছে বাংলাদেশে।
অ্যাভিয়েশন নিরাপত্তায় দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে নেপাল, পাকিস্তান, ভারত ও শ্রীলঙ্কার চেয়ে পিছিয়ে রয়েছে বাংলাদেশ।
এমন প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের তিনটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নিরাপত্তাব্যবস্থা কোন স্তরে আছে, সেটি অডিট করতে অক্টোবরের শেষ নাগাদ আসছে আন্তর্জাতিক বেসামরিক বিমান চলাচল সংস্থার (আইকাও) কারিগরি বিশেষজ্ঞ দল। সরেজমিন পর্যবেক্ষণ শেষে নতুন স্কোর নির্ধারণ করবে বিশেষায়িত এই দলটি।
বাংলাদেশ অ্যাভিয়েশন সিকিউরিটিতে এবার ৭৫ পয়েন্ট পাওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে কাজ করছে। সে লক্ষ্য পূরণে আইকাও টিম দেশে পৌঁছার শেষ মুহূর্তে ‘নিরাপত্তাব্যবস্থার উন্নয়নে’ তোড়জোড় চলছে। ২৬ অক্টোবর থেকে ৬ নভেম্বর পর্যন্ত প্রথম পর্যায়ে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, দ্বিতীয় পর্যায়ে চট্টগ্রামের শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এবং তৃতীয় পর্যায়ে সিলেটের ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর সরেজমিন পরিদর্শন ও মূল্যায়ন করবে এই বিশেষজ্ঞ দল।
বৈশ্বিক অ্যাভিয়েশন ম্যাপে বাংলাদেশের অবস্থান কোন স্তরে, দেশীয় ও আন্তর্জাতিক ফ্লাইট চলাচল বাড়ানোর বিষয়টি মূলত এই অডিট স্কোরের ওপর নির্ভর করে। ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের থার্ড টার্মিনাল চালুর আগে নিরাপত্তাব্যবস্থার কোনো বড় ত্রুটি টিমের কাছে ধরা পড়ে কি না, সেটিও বেশ ভাবাচ্ছে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষকে (বেবিচক)।
বেবিচক সদস্য (নিরাপত্তা) এয়ার কমোডর মো. আসিফ ইকবাল বললেন, ‘নিরাপত্তা নিশ্চিতের সব প্রস্তুতি শেষ। যন্ত্র লাগানোর কাজও শেষদিকে। কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ প্রস্তুতি শেষ হয়েছে। এখন প্রতিটি ডিপার্টমেন্ট কীভাবে পারফর্ম করবে, তার ট্রায়াল চলছে। আশা করছি, আমরা টার্গেট পূরণ করতে পারব।’
অডিটে ন্যূনতম স্কোর অর্জনে ব্যর্থ হলে বা গুরুতর নিরাপত্তা ঘাটতি ধরা পড়লে আইকাও সরাসরি ‘রেড ফ্ল্যাগ’ বা গুরুত্বপূর্ণ সেফটি সংকেত জারি করে। এটি ঘটলে আন্তর্জাতিক রুটে নতুন ফ্লাইট অনুমোদন বন্ধ হয়ে যায়। বাংলাদেশ থেকে উড়ে যাওয়া বিমানের ক্ষেত্রে উন্নত দেশের আকাশসীমায় নিষেধাজ্ঞা দেয়। উড়োজাহাজ লিজ বা বীমার ক্ষেত্রে বাড়তি প্রিমিয়ামও গুনতে হয়।
এশিয়ায় এমন ঘটনার অন্যতম উদাহরণ থাইল্যান্ড। ২০১৫ সালে আইকাও নিরাপত্তা ও তদারকিতে ৩৩টি আন্তর্জাতিক মানদণ্ড পূরণে ব্যর্থ হওয়ায় দেশটির ওপর ‘রেড ফ্ল্যাগ’ জারি করে। ফলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন থাই এয়ারলাইনসগুলোর নতুন রুটে ফ্লাইট চলাচল স্থগিত করেছিল। পরে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করে থাইল্যান্ড শতভাগ নিরাপত্তা নিশ্চিত করে।
২০১৮ সালের আইকাও সিকিউরিটি অডিটে বাংলাদেশ সার্বিকভাবে সাড়ে ৬৮ শতাংশ কার্যকর বাস্তবায়ন (ইআই) স্কোর পেয়েছিল। এ স্কোর সে সময়ের ৬৫ শতাংশের আন্তর্জাতিক বেঞ্চমার্কের চেয়ে সামান্য বেশি। সে সময় একাধিক গুরুতর কাঠামোগত ঘাটতি চিহ্নিত করেছিল।
অডিট রিপোর্টে বিমানবন্দরের সুরক্ষিত এলাকায় শিথিল প্রবেশাধিকার নিয়ন্ত্রণ (অ্যাক্সেস কন্ট্রোল) ও দুর্বল পাস ব্যবস্থা, স্ক্রিনিং ও আধুনিক তল্লাশি সরঞ্জামের অভাব, অ্যাভিয়েশন সিকিউরিটি কর্মীদের দক্ষতা আন্তর্জাতিক মানের ঘাটতি এবং নিরাপত্তা বিধিমালা কঠোরভাবে প্রয়োগে আইনগত ভিত্তির দুর্বলতাকেও প্রধান ঘাটতি হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
আট বছরেও সেসব ত্রুটি সেরে তুলতে পারেনি বেবিচক। কারিগরি টিম আসার খবর পেয়ে এখন শুরু হয়েছে জোর প্রস্তুতি। আগের দুর্বলতা কাটিয়ে বেবিচক এবার অন্তত ৭৫-৭৬ শতাংশের বেশি নম্বর অর্জনের লক্ষ্য নির্ধারণ করে কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে। এ লক্ষ্যে সিভিল অ্যাভিয়েশন অ্যাক্ট ২০১৭-এর অধীনে বিশেষ ‘এয়ার নেভিগেশন অর্ডার’ জারি করে নিরাপত্তা প্রটোকলকে কঠোর আইনি বাধ্যবাধকতায় আনা হয়েছে।
সেই সঙ্গে বিমানবন্দরে চারটি নতুন বডি স্ক্যানার, ডুয়াল-ভিউ এক্স-রে ব্যাগেজ স্ক্যানার এবং চীন থেকে আনা ২৫টি এক্সপ্লোসিভ ট্রেস ডিটেক্টর বা বিস্ফোরক শনাক্ত যন্ত্র স্থাপন করা হচ্ছে। পাশাপাশি সাইবার ঝুঁকি মোকাবিলায় বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিলের সঙ্গে হয়েছে চুক্তি। ৩৬টি বিদেশি এয়ারলাইনসের জন্য বাধ্যতামূলক ‘সাপ্লিমেন্টারি স্টেশন প্রসিডিউরস’ কার্যকর করা হয়েছে।
চট্টগ্রামের আঞ্চলিক কানেকটিভিটি বৃদ্ধি পাওয়ায় এখানকার নিরাপত্তা প্রটোকল শতভাগ আন্তর্জাতিক মানের কি না, তাও যাচাই করবে এই টিম। তার আগে আগামী সপ্তাহে বেবিচকের একটি টিম নিরাপত্তাব্যবস্থা যাচাইয়ে ট্রায়াল রান করার কথা। চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন মোহাম্মদ নূর হোসেন বললেন, ‘নতুন করে নয়টি স্ক্যানার, ছয়টি বিস্ফোরক শনাক্তকরণ স্ক্যানার যন্ত্র স্থাপন করা হচ্ছে। বাড়তি ৮১টি অত্যাধুনিক সিসিটিভি ক্যামেরার মাধ্যমে পুরো বিমানবন্দরকে আরও বেশি নজরদারিতে নিয়ে আসা হয়েছে।’
আন্তর্জাতিক বেসামরিক বিমান চলাচল সংস্থার সিকিউরিটি ও সেফটি অডিটে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে এগিয়ে শীর্ষে রয়েছে শ্রীলঙ্কা। ২০১৮ সালের অডিটে তারা পেয়েছিল সাড়ে ৮৮ পয়েন্ট। এ ছাড়া ২০২২ সালের অডিটে ভারত ৮৬, ২০২১ সালের অডিটে মালদ্বীপ ৮৫ ও পাকিস্তান সাড়ে ৮৪ এবং ২০২২ সালের অডিটে নেপাল ৭০ পয়েন্ট অর্জন করে।



