যেন যুদ্ধক্ষেত্র পরিদর্শনে এলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী!

রবিবার সকালে কড়া নিরাপত্তায় জঙ্গল সলিমপুরে যান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী— আগামীর সময়
চট্টগ্রাম নগরীর বায়েজিদ-ফৌজদারহাট লিংক রোড সংলগ্ন জঙ্গল সলিমপুর পেরিয়ে আলীনগর পর্যন্ত ৪ কিলোমিটারের একটি সড়ক। এর দুপাশে পাহাড় কেটে বানানো হয়েছে অসংখ্য ঘরবাড়ি, দোকানপাট ও মার্কেট। পাহাড়ের ভাঁজে ভাঁজে গড়ে তোলা বসতিতে বসবাসকারীদের আসা-যাওয়ার সরু রাস্তা যোগ হয়েছে মূল সড়কের সঙ্গে। এমন রাস্তার সংখ্যাও শ’খানেকের কম নয়।
আজ রবিবার সকালে এই এলাকা পরিদর্শনে এসেছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। মন্ত্রীর নিরাপত্তায় এলাকাটি ঘিরে ফেলেছিলেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাজারখানেক সদস্য। পুলিশ-বিজিবির সাঁজোয়া যান, সোয়াট টিম, বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিট, ভারী অস্ত্রে সজ্জিত র্যাব— সবই ছিল। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর অবস্থানের পুরো সময় জুড়ে কার্যত অবরুদ্ধ ছিল ওই এলাকার বাসিন্দারা। ঘর থেকে বের হতে দেওয়া হয়নি কাউকে।
কড়া নিরাপত্তা বলয়ে সকাল সাড়ে ৯টার দিকে আলীনগর পৌঁছান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। সামনে-পেছনে ছিল পুলিশ, র্যাব, বিজিবি, ফায়ার সার্ভিস, জেলা প্রশাসনসহ আরও কয়েকটি সংস্থার শতাধিক গাড়ি। যেন কোনো যুদ্ধক্ষেত্র পরিদর্শনে এসেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী! গত দেড় যুগ ধরে ‘রাষ্ট্রের ভেতরে আরেকটি রাষ্ট্র’ কিংবা ‘ভূমিদস্যু-অপরাধীদের অভয়ারণ্য’ হিসেবে পরিচিতি পাওয়া জঙ্গল সলিমপুরে এই প্রথম প্রবেশ করলেন কোনো স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
এদিন সকালে ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। সেখান থেকে সরাসরি যান জঙ্গল সলিমপুরে। সঙ্গে ছিলেন ভূমি ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন, পুলিশের আইজি মোহাম্মদ আলী হোসেন ফকিরসহ বিভিন্ন বাহিনী ও স্থানীয় প্রশাসনের ঊর্দ্ধতন কর্মকর্তারা। সরকারি সূচিতে মন্ত্রীর পরিদর্শনের সময় ১০টা উল্লেখ থাকলেও এর আধাঘণ্টা আগেই পৌঁছান তিনি।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর যাওয়া-আসার সড়কেও কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করে পুলিশ। সড়কে আটকে রাখা হয় সাধারণ গাড়ি। অথবা বিকল্প পথে যেতে বাধ্য করে পুলিশ। কিছু সময়ের জন্য যানবাহন চলাচল বন্ধ ছিল ফ্লাইওভারেও।
ছিন্নমূল হয়ে আলীনগর পর্যন্ত সড়কের দুপাশে ছিল আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিরাপত্তা বেষ্টনী। মূল সড়কের সঙ্গে যুক্ত হওয়া পাহাড়ের বসতিগুলোর সরু প্রবেশপথে মোতায়েন ছিল ৪-৫ জন করে পুলিশ সদস্য। সড়কে স্থানীয়দের হাঁটাচলাও বন্ধ ছিল সাময়িকভাবে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আলীনগর উচ্চ বিদ্যালয়ে স্থাপিত র্যাব-পুলিশের অস্থায়ী ক্যাম্পে গিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে প্রায় একঘণ্টা বৈঠক করেন। এরপর সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলে আবারও শত গাড়ির বহর নিয়ে বেরিয়ে যান জঙ্গল সলিমপুর থেকে।
সীতাকুণ্ড থানার ওসি মাহিনুল ইসলাম জানালেন, জেলা পুলিশের নিরাপত্তা পরিকল্পনা অনুযায়ী সিএমপি, র্যাব, জেলা পুলিশ, বিজিবি, এপিবিএন, স্পেশাল ফোর্স, রিজার্ভ ফোর্স মিলিয়ে মোতায়েন করা হয়েছিল আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ৭০০ সদস্য। এর বাইরেও দায়িত্ব পালন করেছেন থানার টিম, গোয়েন্দা ইউনিটের সদস্যরা।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী চলে যাওয়ার পর পাহাড়ের বিভিন্ন ঘর থেকে দলে দলে বেরিয়ে আসতে থাকেন বাসিন্দারা। আলীনগর স্কুলের সামনে কয়েকজন নারী কথা বলেছেন সাংবাদিকদের সঙ্গে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর আগমনে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে এক নারী বললেন, ‘আমাদেরকে পুলিশ সকাল থেকে বের হতে দেয়নি। কাজকর্মেও যেতে পারিনি আমরা। তারপরও মন্ত্রী এসেছেন। আমরা খুশি। আমরা বারবার পুলিশের-র্যাবের হয়রানি থেকে মুক্তি চাই।’
প্রায় ৩১০০ একর পাহাড়ি খাস জমি দখল করে গড়ে তোলা জনবসতির মূল নিয়ন্ত্রক ভূমিদস্যু ইয়াসিন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সেখানে বসবাসরত সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে অভিযান চালাতে গিয়ে বারবার প্রতিরোধের মুখে পড়েছে। এমনকি প্রাণ হারাতে হয়েছে র্যাবের এক কর্মকর্তাকে। অবৈধ দখল উচ্ছেদ করতে গিয়েও কয়েকবার হামলার মুখে পড়ে জেলা প্রশাসন।
গত ৯ মার্চ সেনাবাহিনী, বিজিবি, র্যাব ও পুলিশ মিলে যৌথ অভিযান চালিয়ে ওই এলাকা নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার ঘোষণা দেয়। পরে সেখানে স্থাপন করা হয় যৌথবাহিনীর দুটি অস্থায়ী ক্যাম্প। সম্প্রতি সেখানে আরেকটি ক্যাম্প নির্মাণ করা হয়, যা আজ উদ্বোধন করার কথা ছিল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর। কিন্তু গত ২৫ মে মধ্যরাতে সশস্ত্র হামলা করে সেই ক্যাম্পটি গুঁড়িয়ে দেয় সন্ত্রাসীরা।









