হাম প্রাদুর্ভাব
৭ মৃত্যুতে আতঙ্ক, জ্বর হলেই ছাড়ছে পাড়া

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন লেংটং পাড়ার এক শিশু, পাশে মা। ছবি ও গ্রাফিক্স - আগামীর সময়
বান্দরবানের রুমা উপজেলা থেকে আরও ১৬ কিলোমিটার পাহাড়ি পথ পেরিয়ে লেংটংপাড়া। সেখানে একের পর এক শিশু ভুগছে হাম উপসর্গে। পাড়ার ২৬ পরিবারের মধ্যে অন্তত ১৫টি পরিবারের শিশুরা আক্রান্ত। চিকিৎসা নিচ্ছে বান্দরবান, রুমা ও চট্টগ্রামের বিভিন্ন হাসপাতালে। শিশুদের পাশাপাশি বড়দের অনেকেরও জ্বর, গায়ে র্যাশের মতো উপসর্গ।
আক্রান্তদের সঙ্গে হাসপাতালে দিন কাটাচ্ছেন তাদের অভিভাবকরাও। ফলে খুমি পাড়াটি এখন ধীরে ধীরে জনশূন্য হয়ে পড়ছে। পাড়াবাসীর মধ্যে ভর করছে আতঙ্ক।
দুই সপ্তাহের বেশি আগে দুর্গম পাড়াটিতে হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়। এরমধ্যে মারা যায় ৭ শিশু। তাদের মধ্যে ৪ জন একই পরিবারের। অপরদিকে শুধু লেংটংপাড়া নয়, পুরো রুমা উপজেলায় হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে বলে জানিয়েছে সিভিল সার্জন কার্যালয়। জেলার মোট হাম আক্রান্তের বেশিরভাগ বর্তমানে ওই উপজেলার বাসিন্দা। বেশি আক্রান্ত লেংটংপাড়ায়। তারা টিকা নেয়নি বলেও সিভিল সার্জন জানান।
জেলা সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ শাহীন হোসাইন চৌধুরী আগামীর সময়কে বলছিলেন, ‘দুই সপ্তাহ ধরে রুমাতে হাম আক্রান্ত হচ্ছে বেশি। উপজেলাটিতে বর্তমানে আক্রান্ত আছে ১৫৩ জন। এর মধ্যে রুমা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ২০ জন এবং বান্দরবান সদর হাসপাতালে ২২ জন চিকিৎসা নিচ্ছে। এ ছাড়া চট্টগ্রামেও চিকিৎসাধীন রয়েছে। লেংটংপাড়ায় বেশি আক্রান্ত হয়েছে। ওখানে মারাও গেছে কয়েকজন।’
লেংটংপাড়ায় নতুন নতুন শিশু হাম আক্রান্ত হচ্ছে। এর মধ্যে গতকাল শুক্রবার নতুন করে দুজনকে ফৌজদারহাটের বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ট্রপিক্যাল অ্যান্ড ইনফেকশাস ডিজিজেস (বিআইটিআইডি) হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। তারা এই হাসপাতালে আগে থেকে চিকিৎসা নেওয়া যতং খুমির (৩) খালাতো ভাই। তাদের বাবার নাম হৈচাই খুমি। তাদের আপন আরও দুই ভাই আগে থেকে এখানে চিকিৎসা নিচ্ছিল।
বর্তমানে বিআইটিআইডিতে লেংটংপাড়ার ৬ জন চিকিৎসাধীন। এর মধ্যে লৈসাং খুমির বয়স ১৭ বছর। এ ছাড়া যতং খুমির মা নাংখৈ খুমিও হাম উপসর্গে ভুগে এখানে চিকিৎসা নিচ্ছেন। তৈসং-নাংখৈ খুমি দম্পতির এক ছেলে সপ্তাহখানেক আগে হাম উপসর্গে মারা গেছে।
এ ছাড়া এই পাড়ার হাম আক্রান্ত ৫ জন রুমা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আছে। লেংটংপাড়ার আরও ৯ জন বান্দরবান হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। ওই পাড়ার বাসিন্দা এবং রুমা মিঞ্জিরিপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক থাংকু খুমি বলেন, ‘পাড়ার অর্ধেক পরিবারে হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। এরমধ্যে গত দুই সপ্তাহে সাত শিশু মারা গেছে। এর পর থেকে আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। জ্বর হলেই সবাই পাড়া থেকে হাসপাতালে চলে যাচ্ছেন। ফলে অনেক ঘর এখন শূন্য।’
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন সাত মাসের লিংথং এ্যা খুমিকে নিয়ে আজ বান্দরবান চলে গেছে অভিভাবকরা। চিকিৎসকদের না জানিয়ে তারা হাসপাতাল ত্যাগ করেন। লিংথং খুমির দুই ভাইসহ ওই পরিবারের চার শিশু এরই মধ্যে মারা গেছে।
লিংথংয়ের দাদু ও পাড়াটির কার্বারি শৈলুং খুমি বলেন, ‘ওখানে আমাদের থাকা-খাওয়ার অসুবিধা হচ্ছে। এ ছাড়া কথাবার্তা বুঝতে পারি না। তাই নাতনিকে নিয়ে চলে এসেছি। এখন একটু ভালো আছে।’
যদিও চিকিৎসকেরা জানাচ্ছেন, দুর্গম পাড়াটির বাসিন্দারা দরিদ্র। তারা অপুষ্টিতে ভুগে থাকে। টিকা নেয় না। যার কারণে শিশুদের পাশাপাশি বড়রা হাম আক্রান্ত হচ্ছে।
এ বিষয়ে সিভিল সার্জনের মন্তব্য, ‘হামের প্রাদুর্ভাবের পর তাদের টিকা দেওয়ার চেষ্টা করেও আমরা দিতে পারিনি। সেনাবাহিনীসহ অনেক কাউন্সিলিং করেছি। তারা অসচেতন।’






