গুপ্তছড়া ঘাটে ফেরি আটকে বারবার ভোগান্তি, এবার ১৪ ঘণ্টা পর গন্তব্যে

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
গতবছরের ২৪ মার্চ আনুষ্ঠানিকভাবে চালু হয়েছিল সীতাকুণ্ডের বাঁশবাড়িয়া–সন্দ্বীপের গুপ্তছড়া নৌপথে ফেরি চলাচল। তখন থেকেই নৌপথের নাব্যতা ধরে রাখতে ড্রেজিংয়ের বিষয়ে ছিল আলোচনা। কিন্তু দেড় বছর না পেরোতেই সেই নৌপথে বারবার আটকে পড়ছে ফেরি। ড্রেজিং করে পলি কাটা হলেও কয়েক দিনের মধ্যেই আবার ভরাট হয়ে যাচ্ছে চ্যানেল।
সবশেষ বুধবার (২ সেপ্টেম্বর) আবহাওয়া সতর্কতার কারণে টানা চার দিন বন্ধ থাকার পর ফেরি কপোতাক্ষ আবার চলাচল শুরু করে। সন্ধ্যা ৭টা ১০ মিনিটে গুপ্তছড়া ঘাট থেকে সীতাকুণ্ডের বাঁশবাড়িয়ার উদ্দেশে ছেড়ে যায় ফেরি। যদিও ভাটা পড়ার আগেই বিকেল ৪টায় যাত্রীদের ফেরিতে তোলা হয়। ছেড়ে যাওয়ার মাত্র ১০ মিনিটের মাথায় পলিমাটিতে আটকে যায় ফেরিটি। এরপর তিন শতাধিক যাত্রী নিয়ে সেখানে আটকে থাকে। ১৪ ঘণ্টা পর বৃহস্পতিবার সকাল সোড়ে ১০টার দিকে বাঁশবাড়িয়া ঘাটে পৌঁছান তারা।
ফেরিতে থাকা যাত্রীদের মধ্যে শিশু ও বয়স্ক ব্যক্তিও ছিলেন। ছিল দুটি বাস, একটি খালি অ্যাম্বুলেন্স, সাতটি ট্রাকসহ বেশ কয়েকটি ব্যক্তিগত যানবাহন। দীর্ঘ সময় আটকে থাকায় দেখা দেয় খাবার ও সুপেয় পানির সংকট। চারদিকে পানি ও কাদা থাকায় ঘাটে নেমে যাওয়ারও সুযোগ ছিল না। যাত্রী আরমান জারিফ অভিযোগ করেন, ১০ টাকার চানাচুর ২৫ টাকায় বিক্রি করা হয়েছে।
পরে স্থানীয়ভাবে যাত্রীদের খাবারের ব্যবস্থা করা হয়। সন্দ্বীপের সংসদ সদস্য মোস্তফা কামাল পাশার পক্ষ এবং ইসলামী আন্দোলনের পক্ষ থেকে রান্না করে খাবার দেওয়া হয়।যাত্রীদের গন্তব্যে পৌঁছাতে পরে বাসেরও ব্যবস্থা করা হয়।
ড্রেজিংয়ের সুফল নেই
সন্দ্বীপ চ্যানেলে ফেরি আটকে পড়ার ঘটনায় সামনে এসেছে পুরোনো সেই সমস্যা নাব্যতাসংকট। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চ্যানেলে নিয়মিত পলি জমে। ড্রেজিং করে তা সরানোর উদ্যোগ নেওয়া হলেও সেই কার্যক্রম ধারাবাহিক নয়। আবার ড্রেজিং করে তোলা মাটি কোথায় রাখা বা সরানো হবে, সেটিও বড় সমস্যা।
বিআইডব্লিউটিএর নির্বাহী প্রকৌশলী রেজাউর রশিদ খন্দকার বলেন, সন্দ্বীপ চ্যানেল স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি পরিবর্তনশীল। আগস্ট মাসেও সেখানে ড্রেজিং করা হয়েছে। কিন্তু কয়েক দিনের মধ্যেই আবার পলি জমে যাচ্ছে।
তিনি বলেন, ‘আমরা ড্রেজিং করলে মাটিগুলো কোথায় ফেলব? জায়গা তো নেই। আগের মাটিগুলোও উপজেলা প্রশাসন সরায়নি।’
রেজাউর রশিদ খন্দকার জানান, এ সমস্যা সমাধানে একটি সমীক্ষা চলছে। শুধু বারবার পলি কেটে ফেলার বদলে কীভাবে টেকসইভাবে চ্যানেল সচল রাখা যায়, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট অংশীজন ও পরামর্শকদের নিয়ে কাজ চলছে।
অর্থাৎ সমস্যা শুধু ড্রেজিং না হওয়ার নয়। ড্রেজিং করার পর তোলা পলি অপসারণের ব্যবস্থাও পুরোপুরি কার্যকর নয়। ফলে একদিকে চ্যানেলে নতুন করে পলি জমছে, অন্যদিকে আগের কাটা মাটিও পড়ে থাকছে।
নতুন ড্রেজিংয়ের অপেক্ষা
সন্দ্বীপের সংসদ সদস্য মোস্তফা কামাল পাশার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তার ফোন ধরেন ব্যক্তিগত সহকারী আবুল কাসেম। কাসেম বলেন, স্যার ব্যস্ত আছেন। ড্রেজিংয়ের বিষয়টা আমি জানি। আগের ড্রেজিং ঠিকাদারের মেয়াদ শেষ হয়েছে। নতুন করে টেন্ডার আহ্বান করা হয়েছে। এতে ২৪টি প্রতিষ্ঠান অংশ নিয়েছে। এক সপ্তাহের মধ্যে নতুন ড্রেজিং কার্যক্রম শুরু হওয়ার কথা রয়েছে।
সন্দ্বীপ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আমজাদ হোসেন বলেন, ড্রেজিং করে সরানো পলি বিক্রির প্রক্রিয়া চলছে। মাটির মূল্য নির্ধারণের জন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরে চিঠি দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এখনো বিআইডব্লিউটিএর কাছ থেকে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। মূল্য নির্ধারণের পর টেন্ডারের মাধ্যমে পলি বিক্রি করার কথা রয়েছে।
এখানে তৈরি হয়েছে আরেক জট। বিআইডব্লিউটিএ বলছে, ড্রেজিংয়ের মাটি ফেলার জায়গা নেই এবং আগের মাটিও সরানো হয়নি। অন্যদিকে উপজেলা প্রশাসন বলছে, সেই মাটি সরাতে মূল্য নির্ধারণের জন্য বিআইডব্লিউটিএকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। দুই পক্ষের এই প্রক্রিয়ার মধ্যেই আটকে আছে পলি অপসারণ।
এদিকে, বুধবারের ফেরি আটকে যাওয়ার ঘটনায় বিআইডব্লিউটিএর উপপরিচালক (পোর্ট অফিসার) নয়ন শীল ফেরি মাস্টারের গাফিলতিকে দায়ী করেছেন।
ফেরি চালু হওয়ার দেড় বছরের মধ্যে একই স্থানে একাধিকবার ফেরি আটকে পড়ার ঘটনা থেকে বোঝা যাচ্ছে দেখিয়ে দিচ্ছে, শুধু একবার পলি কেটে দিলেই এই নৌপথ সচল রাখা সম্ভব নয়। প্রয়োজন নিয়মিত ড্রেজিং, কাটা পলি অপসারণ এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর কার্যকর সমন্বয়।






