পশুর রাজকীয় গয়না!

সোনালি সুতা ও চুমকির নিখুঁত নকশায় তৈরি নীল মখমলের মুখপট্টি (ফেস মাস্ক)। যেন রাজকীয় মুকুট। গলায় ঝলমল করছে সোনালি রঙের চেইন। আর পিঠের বিশাল কুঁজ থেকে গলার নিচ পর্যন্ত নেমে এসেছে বাহারি সুতা ও পুঁতির তৈরি ঝুলন্ত ঝালর। রাজপ্রাসাদের কোনো ঘোড়া বা হাতি নয়, চাটগাঁর লাল বিরিষকে (রেড চিটাগং কাউ) এমন রাজকীয় ভঙ্গিতে সাজিয়েছেন তরুণ তানভীর সিদ্দিকী। শুধু তানভীর নন, ঈদ সামনে রেখে কোরবানির জন্য কেনা প্রিয় প্রাণীটিকে নানা অলংকারে সাজিয়ে তোলার হিড়িক পড়েছে চট্টগ্রামে। গড়ে উঠেছে অনলাইন-অফলাইনে গরুর গয়নার প্রতিষ্ঠান।
পশুর গয়নার এ বাজারটি কিন্তু মোটেও ছোট নয়। বিক্রেতারা জানিয়েছেন, কোরবানির মৌসুমে একেকজন বিক্রেতা ৫ থেকে ৬ লাখ টাকার গয়না বিক্রি করেন। তাদের একজন তানজীর উদ্দিন। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে এমবিএ পড়ুয়া এ যুবক ছয় বছর ধরে শখের বশে করছেন এই ব্যবসা। গরুর হাটের পাশাপাশি বিক্রি করেন অনলাইনেও।
জানালেন ব্যবসার আদ্যোপান্ত, ‘কোরবানির পশু কেনার পর শৌখিন তরুণরা প্রাণীটিকে অভিজাত রূপ দিতে মরিয়া হয়ে ওঠেন। কিনে নেন মুখপট্টি, বাজু, গলার মালা-বেল্ট বা চেইন, ঝালোয়ার, পালক। রাজকীয়ভাবে সাজিয়ে ঘোরান পাড়াময়। তোলেন ছবি। করেন ভিডিও। নিয়ে যান কোরবানির পশুর র্যালিতেও।’
ক্রেতাদের রুচি ও চাহিদার ওপর ভিত্তি করে এ গয়নাগুলোর দাম নির্ধারিত হয়। কাপড়ের তৈরি সাধারণ গলার মালা বা ঘুঙুর মিলছে ১০০ থেকে ৪০০ টাকার মধ্যে। বাজু ২৫০ টাকা। তবে রাজকীয় রূপ দিতে মখমলের ওপর জরি-চুমকির কাজ করা মুখপট্টি বা ফেস মাস্কের দাম ২০০ থেকে ৫০০ টাকা। গলার মেটালিক সোনালি চেইন ও কুঁজ থেকে ঝুলিয়ে দেওয়া ঝালোয়ারের সেটের দাম ৫০০ থেকে দেড় হাজার টাকা।
গরুকে সাজানোর এ রীতি নতুন নয়। প্রাচীনকাল থেকেই বাংলায় নবান্ন, পৌষসংক্রান্তি বা কোরবানিতে গরুর শিংয়ে তেল মাখানো, রঙ মাখানো ও গলায় ঘুঙুর বা ঘণ্টার মালা পরানোর রেওয়াজ ছিল। ড. ওয়াকিল আহমদ তার ‘বাংলার লোকসংস্কৃতি’ গ্রন্থে বিভিন্ন পূজা-পার্বণে গরুকে সাজানোর রীতির কথা উল্লেখ করেছেন।
নগরীর বাকলিয়ায় বেড়ে ওঠা গায়ক শাহরিয়ার খালেদ বলেন, ‘আমাদের ছোটবেলায় কোরবানি দিতেন বিত্তবানরা। যারা কোরবানি দিতেন, তাদের বাড়ির শিশুরা উৎসবে মেতে উঠত। গোসল করাত। মালা পরাত। শিংয়ে তেল মাখাত।’
মোগল দরবারের ইতিহাস ও বিভিন্ন চিত্রকর্ম থেকে জানা যায়, রাজপরিবারের কোরবানির পশুকে রেশমি কাপড়, সোনা-রুপার সুতো দিয়ে তৈরি ঝালর এবং গলায় দামি ঘণ্টার মালা পরানো হতো। পশুর শিংয়ে মাখানো হতো সুগন্ধি তেল এবং রঙ। এটি ছিল মূলত পশুর প্রতি রাজকীয় সম্মান ও আভিজাত্যের প্রতীক।
ইসলামি গবেষকদের মতে, কোরবানির পশুকে যত্ন করা, তাকে উত্তম খাবার দেওয়া এবং পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা পশুর প্রতি মমত্ববোধের অংশ।
এ প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক আ ন ম আব্দুল মাবুদ বলেছেন, ‘কোরবানি শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য। কোরবানির পশু সুন্দর ও ত্রুটিমুক্ত হতে হবে। এটিকে পরিচ্ছন্ন ও যত্নে রাখতে হবে। ঘরের আঙিনায় সুন্দরের জন্য মালা পরানো দোষের কিছু নয়। তবে অহংকার প্রকাশের জন্য প্রদর্শনী করা যাবে না।’
অতীতে গ্রামবাংলায় পাটের রঙিন দড়ি, কাপড়ের মালা এসবে প্রকাশ পেত পশুর প্রতি মায়া। কংক্রিটের শহরে তা রূপ নিয়েছে মখমল আর সোনালি চেইনে। মাধ্যম বদলেছে। কিন্তু ভেতরের আবেগ ও মমত্ববোধ একই। শখের এ রাজকীয় সাজ আসলে শুধুই লোকদেখানো বা দেখনদারি নয়। আল্লাহর নামে উৎসর্গ করার আগে নিজের প্রিয় পশুকে সর্বোচ্চ যত্নে সাজিয়ে তোলার এক চিরন্তন রূপ এটি।






