অনেককে ফতুর করে লাপাত্তা ব্যাংক কর্মকর্তা
- গ্রামের বাড়ি যাওয়ার কথা বললেও যাননি সেখানে
- বাড়িতে ধরনা দিচ্ছেন পাওনাদাররা

চট্টগ্রামে বেসরকারি মেঘনা ব্যাংকের উচ্চপদস্থ এক কর্মকর্তার সপরিবারে উধাও হয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। নোটিস ছাড়াই তিনি কর্মস্থলে অনুপস্থিত ১২ দিন। মোবাইল ফোন সংযোগটিও বন্ধ। এমনকি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকের অ্যাকাউন্টও ডিঅ্যাকটিভেট। পরিবারের সদস্য ও স্বজনরা বলছেন, ওই কর্মকর্তা স্ত্রী ও তিন ছেলে নিয়ে দুই সপ্তাহ আগে বাসা থেকে বের হন। এরপর আর ফেরেননি। অনেক খোঁজাখুঁজি করেও মিলছে না তাদের হদিস। বাসার দরজায় ঝুলছে বিশাল তালা।
শুধু স্বজনরাই নন, তন্ময় চৌধুরী নামের এই ব্যাংক কর্মকর্তাকে খুঁজছেন অনেক পাওনাদার। অভিযোগ উঠেছে, বিভিন্ন জনের কাছ থেকে কোটি টাকার বেশি হাতিয়ে নিয়ে তন্ময় চৌধুরী এখন উধাও। এমনকি তিনি দেশে না বিদেশে, সে তথ্যই নিশ্চিত করতে পারছে না কেউ।
ব্যাংক কর্তৃপক্ষের ভাষ্য, তন্ময়ের বিরুদ্ধে বেশ কয়েকজনের টাকা আত্মসাতের অভিযোগ ওঠে। এরপর তাকে ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের মানবসম্পদ বিভাগে সংযুক্ত করা হয়। কিন্তু তিনি সেখানে যোগ দেননি। অভিযোগের তদন্ত চলছে। সত্যতা পাওয়া গেলে তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তন্ময় চৌধুরী ব্যাংকটির চট্টগ্রামের আগ্রাবাদ শাখার ফার্স্ট ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তার বাড়ি বোয়ালখালী পৌরসভার ৪ নম্বর ওয়ার্ডের গোমদণ্ডী গ্রামে। বাবা সাবেক ব্যাংক কর্মকর্তা প্রয়াত নীতিপ্রসাদ চৌধুরী। মা অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক রীনা চৌধুরী। তন্ময় পরিবার নিয়ে নগরীর পাথরঘাটার আশরাফ আলী রোডে শ্বশুর তপন মজুমদারের বাসায় থাকতেন।
তপন মজুমদার আগামীর সময়কে জানালেন, গত ১৪ আগস্ট বিকালে তন্ময় তার স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে গ্রামের বাড়ি যাওয়ার কথা বলে বাসা থেকে বের হন। ১৬ আগস্ট দুপুর পর্যন্ত তাদের সঙ্গে যোগাযোগ ছিল। সেদিন বিকালে তিনি তন্ময় ও তার স্ত্রীর মোবাইল ফোন বন্ধ পান। পরে জানতে পারেন, তারা গ্রামের বাড়িতে যাননি। আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধবও কেউ তার খোঁজ দিতে পারছেন না।
১৬ আগস্ট তন্ময়ের ঢাকায় হেড অফিসে যোগদানের কথা ছিল। যোগ না দেওয়ায় এবং উধাও হয়ে যাওয়ার খবর জানাজানির পর ১৭ আগস্ট বিকালে ব্যাংক থেকে কর্মকর্তারা এসে তন্ময়কে দেওয়া অফিসের প্রাইভেট কার বাসা থেকে নিয়ে যান। এ সময় ব্যাংকের কর্মকর্তারা তন্ময় অনেক গ্রাহকের ‘টাকা মেরে দিয়েছেন’ বলে তার শ্বশুরকে জানান। তবে টাকার অঙ্ক তারা বলেননি।
তন্ময়ের খোঁজে দুই সপ্তাহ ধরে প্রতিদিন সকাল-বিকাল পাওনাদাররা বাসায় ধরনা দিচ্ছেন বলেও জানালেন শ্বশুর। তিনি বললেন, ‘কেউ ফোন করছে। কেউ সরাসরি আসছে। লাখ লাখ টাকা পাবে বলে আমাদের বিরক্ত করছে। টাকা না পেলে লাইফ শেষ করে দেবে বলে হুমকিও দিচ্ছে।’
তন্ময়ের চাচাতো ভাই বোয়ালখালীর কানুনগোপাড়ার হাই স্কুলের শিক্ষক চিন্ময় চৌধুরী আগামীর সময়কে বললেন, ‘নিখোঁজের চার দিন পর তন্ময়ের শ্বশুর আমাকে বিষয়টি জানিয়েছেন। ওনার মেয়েসহ পরিবারের পাঁচজন সদস্যের কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। অথচ উনি জিডি পর্যন্ত করেননি। আমাকে বলছেন জিডি করতে। এখন পাওনাদাররা আমাকেও নানাভাবে বিরক্ত করছেন। অনেকে ফোন দিচ্ছেন। অনেকে বাড়িতেও আসছেন। ছেলের জন্য তার মা কাঁদতে কাঁদতে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন।’
চিন্ময়ের দাবি, তিনি নিজেও তন্ময়ের কাছে ১১ লাখ টাকা পান, যা ধার হিসেবে দিয়েছিলেন। আর মোট পাওনাদারের সংখ্যা ও তাদের দাবি হিসাব করলে কোটি টাকার বেশি হবে।
ব্যাংকটির প্রধান কার্যালয়ের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট (ব্র্যান্ড অ্যান্ড কমিউনিকেশন) এস এম আবুল কালাম আজাদ আগামীর সময়কে বললেন, ‘তন্ময় সুনির্দিষ্টভাবে কোনো গ্রাহকের টাকা আত্মসাৎ করেছেন— এমন প্রমাণ এখনো মেলেনি। তবে অনেকে তার বিরুদ্ধে টাকা আত্মসাতের অভিযোগ নিয়ে ব্যাংকে আসছেন। এর মধ্যে গ্রাহকও থাকতে পারেন। এ অভিযোগের ভিত্তিতে তাকে হেড অফিসে অ্যাটাচমেন্টে রাখা হয়েছিল। কিন্তু তিনি যোগ দেননি। তার অবস্থান কোথায়, সেটিও আমরা জানি না।’ তন্ময়ের নিকটাত্মীয়দের ধারণা, শ্বশুর তপন মজুমদারের জ্ঞাতসারেই তন্ময় পরিবার নিয়ে আত্মগোপন করেছেন। হয়তো বা এর মধ্যেই তিনি দেশ ছেড়ে গেছেন।
তপন মজুমদার জানালেন, ২০২৩ সালে সপরিবারে ইউরোপের একটি দেশে চলে যাওয়ার জন্য আবেদনসহ প্রাথমিক প্রক্রিয়া শুরু করেছিলেন তন্ময়। তপনের কাছ থেকে ২১ লাখ টাকা ধার নিয়ে আরেকটি ব্যাংকে নিজের অ্যাকাউন্টে ডিপোজিট হিসেবে রেখেছিলেন।
তিনি বললেন, ‘আমার সেই টাকাও আর ফেরত পাইনি। কোটি টাকার ওপরে তার লোন হয়েছে বলে আমাদের জানিয়েছিল। ব্যাংকে সে ভালো অঙ্কের বেতন পেত। আমার ধারণা ছিল সে আস্তে আস্তে টাকা শোধ করে দেবে। কিন্তু এভাবে আমাদের পথে বসিয়ে দিয়ে উধাও হয়ে যাবে ভাবতে পারিনি।’
পরিবারের পাঁচ সদস্য নিখোঁজের পরও থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) না করার বিষয়ে তপনের ভাষ্য, ‘কোতোয়ালি থানায় করব নাকি বোয়ালখালী করব, সেটা বুঝতে পারছিলাম না। আজ-কালের মধ্যে করে ফেলব।’







