হাঁটেন ৬০ শতাংশ মানুষ, গাড়ির পেছনে ব্যয় ৯৮ শতাংশ
- সড়কে নিহতদের ৫৬ শতাংশই পথচারী
- প্রয়োজনের ৯০% ফুটপাত নেই নগরে

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
চট্টগ্রাম নগরের ৬০ শতাংশ মানুষই প্রতিদিন কর্মস্থলে যান হেঁটে। গত ১৬ বছরে সড়ক অবকাঠামো উন্নয়নে ১৮ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দের মাত্র ২ শতাংশ খরচ হয়েছে তাদের জন্য। অথচ গাড়িতে যাতায়াতে সুবিধার জন্য ব্যয় হয়েছে বাদবাকি ৯৮ শতাংশ। এতে সড়কে বেড়েছে গাড়ির গতি। বিপরীতে পথচারীদের জন্য অনিরাপদ হয়ে উঠেছে এই নগর। পরিসংখ্যান বলছে, নগরের সড়কে গাড়িচাপায় প্রাণ হারানোদের ৫৬ শতাংশই পথচারী।
সড়কে হাঁটতে গিয়ে গাড়ির সঙ্গে হচ্ছে সংঘাত। প্রাণ হারাচ্ছেন সাধারণ মানুষ।
যুক্তরাষ্ট্রের ব্লুমবার্গ ফিলানথ্রপিস ইনিশিয়েটিভ ফর গ্লোবাল রোড সেফটি (বিআইজিআরএস) প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, ২০১৭ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত চট্টগ্রাম নগরের সড়কে নিহত হয়েছেন ৭৬২ জন। এর মধ্যে পথচারী ৪২৭ জন। ২০১৭ সালে যেখানে পথচারী নিহত হন ৩৫ জন, সেখানে ২০২৫ সালে মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়ায় ৫৯ জনে। আট বছরের ব্যবধানে সড়কে পথচারী মৃত্যুর হার বেড়েছে ৬৯ শতাংশ।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নগরের সড়কে সবচেয়ে ঝুঁকিতে আছেন পথচারীরা। কারণ, তাদের হাঁটার মতো নিরবচ্ছিন্ন কোনো ফুটপাত নেই। চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) মাস্টারপ্ল্যান অনুযায়ী, যেটুকু ফুটপাত আছে তার ৭১ শতাংশই বেদখল। বাধ্য হয়ে মূল সড়কে গাড়ির ফাঁকফোকর দিয়ে হাঁটতে গিয়ে পিষ্ট হচ্ছেন সাধারণ মানুষ। পথচারীদের কাছে এই নগর যেন এখন হাঁটলেই মারাত্মক দুর্ঘটনায় আহত-নিহত হওয়ার শঙ্কা।
সিডিএ ট্রাফিক ও পরিবহন মাস্টারপ্ল্যান তৈরি করতে গিয়ে ১২ ধরনের জরিপ পরিচালনা করেছে নগরের সড়কে। এর মধ্যে প্রায় ১১ হাজার পরিবারের যাতায়াতের তথ্য সংগ্রহ করেছে সংস্থাটি। সেখানে দেখা গেছে, যাতায়াতের জনপ্রিয় মাধ্যম হাঁটা। প্রায় ৬০ শতাংশ মানুষ গন্তব্যে যাতায়াত করেন হেঁটে। এর বাইরে অটোরিকশায় ১২ শতাংশ, রিকশায় ১১, গণপরিবহনে ১০, মোটরসাইকেলে ৩, বাইসাইকেলে ২, কার এবং অন্যান্য পরিবহনে ১ শতাংশ করে মানুষ যাতায়াত করেন।
২০১০-১১ থেকে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন সড়ক অবকাঠামো উন্নয়নে খরচ করেছে ৫ হাজার ২৩৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে ফুটওভার ব্রিজ এবং ফুটপাত নির্মাণ ও পুনর্নির্মাণে ব্যয় করেছে মাত্র ২৭৪ কোটি টাকা। গাড়ি যাতায়াতের জন্য ব্যয় ৪ হাজার ৯৬১ কোটি টাকা।
একই সময়ে আরেক প্রতিষ্ঠান সিডিএ এক্সপ্রেসওয়ে, ফ্লাইওভার, ওভারপাস, সড়ক নির্মাণ ও সম্প্রসারণে ব্যয় করেছে ১২ হাজার ৪৮৭ কোটি টাকা। বিপরীতে ফুটপাত নির্মাণে সংস্থাটি ব্যয় করেছে মাত্র ৫৮ কোটি টাকা। দুই সংস্থা মিলে মোট ব্যয় করেছে ১৭ হাজার ৭২২ কোটি টাকা। এর মধ্যে যানবাহনের যাতায়াত সুবিধা নিশ্চিতে খরচ করেছে ১৭ হাজার ৩৯৪ কোটি টাকা, যা মোট খরচের ৯৮ দশমিক ১৩ শতাংশ। আর পথচারীদের যাতায়াত সুবিধা নিশ্চিতে ব্যয় মাত্র ৩৩২ কোটি টাকা, যা মোট খরচের মাত্র ১ দশমিক ৮৭ শতাংশ। মাস্টারপ্ল্যানে বিস্ময় প্রকাশ করে এ খাতে গুরুত্ব ও সহায়তা বাড়ানোর কথা তুলে ধরা হয়েছে।
সিটি করপোরেশনের হিসাবে চট্টগ্রাম নগরে সড়ক আছে ১ হাজার ৪২০ কিলোমিটার। বিপরীতে ফুটপাত আছে মাত্র ২৮১ কিলোমিটার। মাস্টারপ্ল্যান বলছে, ২০০ কিলোমিটার ফুটপাতই দোকান, নির্মাণসামগ্রী ও ভাসমান হকারের দখলে। মাঠপর্যায়ের গবেষকরা বলছেন, বাকি ৮১ কিলোমিটার ফুটপাতও নিরবচ্ছিন্ন নয়। কোথাও ভবন ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের গাড়ি ঢোকা ও বের হওয়ার জন্য ঢালু করে রাখা হয়েছে। কোথাও আবার ভাঙা এবং উঁচু-নিচু। তাতে স্বাচ্ছন্দ্যে হাঁটা যায় না। বাধ্য হয়ে সড়ক দিয়ে হাঁটেন পথচারীরা।
বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড (বিএনবিসি) ২০২০-এর মানদণ্ড অনুযায়ী, নগরের ১ হাজার ৪২০ কিলোমিটার সড়কের উভয় পাশেই ফুটপাত থাকা প্রয়োজন। সে হিসাবে চট্টগ্রামে ২ হাজার ৮৪০ কিলোমিটার ফুটপাত থাকার কথা। কিন্তু সিটি করপোরেশনের তথ্য বলছে, নগরে বর্তমানে ফুটপাত আছে মাত্র ২৮১ কিলোমিটার, যা মোট চাহিদার মাত্র ৯ দশমিক ৮৯ শতাংশ। চাহিদার তুলনায় ফুটপাত কম আছে ২ হাজার ৫৫৯ কিলোমিটার।
২০১৪ সালে ৪০ কোটি ৩৯ লাখ টাকা ব্যয়ে নগরের পাঠানঠুলী রোডের সম্প্রসারণ করেছিল সিডিএ। সম্প্রতি সেখানে দেখা যায়, কদমতলী থেকে আগ্রাবাদ চৌমুহনী পর্যন্ত ৮৫০ মিটার দৈর্ঘ্যের এই সড়কটির দুপাশের ফুটপাত দোকানিদের দখলে। সড়ক দিয়ে হাঁটছেন মানুষ। এই পথ দিয়ে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিত হেঁটে যাতায়াত করেন আসিফ চৌধুরী। তিনি বলছিলেন, ‘দোকানগুলোর পণ্যের একাংশ থাকে ফুটপাত জুড়ে। যে কারণে ফুটপাত দিয়ে হাঁটা যায় না। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বাধ্য হয়ে সড়কে হাঁটতে হয়।’
২৪ কোটি টাকায় সম্প্রসারণ করা হয়েছিল নগরের সিরাজউদ্দৌলা রোডের। সেই সড়কের একপাশ জুড়ে এখন বাজার, অন্যপাশ অবৈধ পার্কিংয়ের দখলে। দোকানিদের দখলে চলে গেছে সড়কের পাশের ফুটপাতও। ফলে সড়কের সম্প্রসারিত অংশ কাজে আসছে না পথচারী কিংবা যাত্রীদের। মাস্টারপ্ল্যানের তথ্য বলছে, শুধু ফুটপাত নয়, নগরের ৯৭ শতাংশ সড়কের একাংশ দখল হয়ে গেছে।
২০২৫ সালের নভেম্বরে ব্লুমবার্গ ফিলানথ্রপিসের প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, চট্টগ্রাম নগরের ১০টি ঝুঁকিপূর্ণ সড়কের একটি সিডিএ অ্যাভিনিউ (বহদ্দারহাট থেকে টাইগারপাস)। গত তিন বছরে এখানে নিহত হয়েছেন ২০ জন। গত বুধবার সকাল ৭টা থেকে ৮টা পর্যন্ত সড়কটির লালখানবাজার মোড় সরেজমিনে পর্যবেক্ষণ করে দেখা যায়, নেই কোনো জেব্রাক্রসিং কিংবা সিগন্যাল বাতি। কোনো ট্রাফিক পুলিশও নেই। দ্রুতগতির গাড়ির সামনে হাত উঁচিয়ে রাস্তা পার হচ্ছেন সাধারণ মানুষ। এই সড়ক পার হয়ে প্রতিদিন শিশুসন্তানকে স্কুলে আনা-নেওয়া করেন গৃহিণী সানজিদা লিনা। তার ভাষ্য, ‘প্রতিদিন আতঙ্ক নিয়ে রাস্তাটা পার হই। সকালবেলা এমনিতে গাড়ি দ্রুত চলে। এর মধ্যে কোনো সিগন্যাল বাতি বা জেব্রাক্রসিং না থাকায় রাস্তা পার হতে বেগ পেতে হয়।’
এদিকে নগরের কোনো মোড়ে অস্তিত্ব নেই সিগন্যাল বাতির। অথচ প্রতি বছর স্বয়ংক্রিয় সিগন্যাল বাতি রক্ষণাবেক্ষণ খাতে সিটি করপোরেশন ব্যয় করছে বিপুল টাকা। গত ১৪ বছরে ব্যয় করেছে ৩ কোটি ৩২ লাখ টাকা।
সিটি করপোরেশনের প্রধান হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা হুমায়ুন কবির চৌধুরী বললেন, নগরের মধ্যে যাওয়া রেললাইন এলাকায় কিছু স্বয়ংক্রিয় সিগন্যাল বাতি আছে। এগুলো মেরামতে রেলওয়ের বরাদ্দ থাকে না। দুর্ঘটনা এড়াতে মেরামত করে সচল রাখে সিটি করপোরেশন।
সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে চট্টগ্রাম নগরে পাঁচ বছর ধরে কাজ করছে ব্লুমবার্গ ফিলানথ্রপিস। সিটি করপোরেশন ও চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশকে সম্পৃক্ত করে এরই মধ্যে চারটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে আন্তর্জাতিক এই সংস্থাটি। প্রতিবেদনগুলোতে নগরকে শুধু গাড়িনির্ভর না করে হাঁটা এবং সাইকেল চালানোর উপযোগী করে গড়ে তোলার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
প্রতিবেদনের সুপারিশে বলা হয়েছে, পথচারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে ফুটপাত চওড়া ও নিরবচ্ছিন্ন করতে হবে। পাশাপাশি উঁচু জেব্রাক্রসিং (রেইজড ক্রসওয়াক), পথচারী আইল্যান্ড ও কার্ব এক্সটেনশন নির্মাণ করতে হবে। গাড়ির বেপরোয়া গতি নিয়ন্ত্রণ এবং পথচারীদের পারাপার নির্বিঘ্ন করতে গাড়ির লেনের সংখ্যা ও প্রশস্ততা কমানোরও দেওয়া হয়েছে পরামর্শ। এ ছাড়া শহরের গুরুত্বপূর্ণ সড়ক, মোড় ও প্লাজাগুলোকে সম্পূর্ণ পথচারীবান্ধব (পেডেস্ট্রিয়ান জোন) হিসেবে গড়ে তোলার সুপারিশ করা হয়েছে ওই প্রতিবেদনে।
বিআইজিআরএস চট্টগ্রামের সার্ভেইল্যান্স কো-অর্ডিনেটর ও বুয়েটের দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক কাজী মো. সাইফুন নেওয়াজ বলছিলেন, পুলিশের উদ্যোগে দুর্ঘটনার ডেটাবেজ তৈরির কাজ অনেক এগিয়েছে। কিন্তু এই ডেটা ব্যবহার করে সিটি করপোরেশন যে অবকাঠামোগত উন্নয়ন বা ফুটপাত নির্মাণ করবে, সেই চর্চাটি এখনো শুরু হয়নি। এখনো বিনিয়োগ হচ্ছে গাড়িকেন্দ্রিক। পথচারীকেন্দ্রিক বিনিয়োগ খুবই কম।
সড়ক নির্মাণে পথচারীদের নিরাপত্তার বিষয়টি উপেক্ষিত থাকার দায় নিতে রাজি নন সিডিএর প্রধান প্রকৌশলী আহমেদ আনোয়ারুল নজরুল। তিনি বললেন, ‘সিডিএ মূলত সড়ক নির্মাণের কাজ করে। ফুটপাত নির্মাণ বা রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব সিটি করপোরেশনের। তাই এ বিষয়ে আমরা কিছু বলতে পারব না। তা ছাড়া আমরা নগরের ভেতরে নতুন কোনো সড়ক তৈরি করছি না, যা হচ্ছে শহরের বাইরে।’
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের প্রধান প্রকৌশলী আনিসুর রহমান সোহেলের ভাষ্য, ‘ফুটপাত দখলমুক্ত রাখতে অভিযান চালানো হচ্ছে নিয়মিত। এ ছাড়া এখন আমরা ফুটপাত নির্মাণে কাজ করছি। যেখানে নালায় স্ল্যাব নেই, সেখানে স্ল্যাব বসানো হচ্ছে।’ আসছে ডিসেম্বরের পর নগরের ফুটপাত ও হাঁটার পরিবেশে আমূল পরিবর্তন দেখা যাবে— এমন আশাবাদের কথাও শোনালেন চসিকের প্রধান প্রকৌশলী।



