সিআরবি ৭ রাস্তার গোলকধাঁধা আরও আছে প্রকৃতির রূপের আধার

সিআরবি এখনও প্রকৃতির রূপের আধার। ছবি: রনি দে
চট্টগ্রাম শহরের কোলাহল, যানজট আর যান্ত্রিক জীবনের মাঝখানে সবুজে ঘেরা সিআরবি। শতবর্ষী গাছ, ছোট-বড় টিলা, পাখির কলতান আর মানুষের পদচারণায় কোলাহলমুখর এই সিআরবি চট্টগ্রামের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিচর্চার এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।
‘সেন্ট্রাল রেলওয়ে বিল্ডিং’ সংক্ষেপে সিআরবি। পাহাড়ের ভাঁজে ব্রিটিশ আমলে প্রতিষ্ঠিত এই এলাকা বর্তমানে বাংলাদেশ রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলীয় সদর দপ্তর হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। নগরীর একমাত্র গোলকধাঁধা সড়ক সাত রাস্তার মোড়ও এখানে। একদিকে যাবেন স্টেডিয়াম, অন্যদিকে কদমতলী।
রয়েছে টাইগারপাস যাওয়ার রাস্তা। যেতে পারবেন গোয়ালপাড়া রেলওয়ে কলোনিতে। পলোগ্রাউন্ড মাঠে যাওয়ার পথও রয়েছে। আরেকটি দিয়ে উঠতে পারবেন সিআরবির প্রধান গেটে। সবশেষ রাস্তাটি উঠেছে পাহাড়চূড়ায়, যেখানে রেলের শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের আবাসস্থল। এই সিআরবি চট্টগ্রামবাসীর কাছে ‘নগরীর ফুসফুস’ হিসেবে পরিচিত।
ভোরের আলো ফুটতেই সিআরবিতে শুরু হয় মানুষের পদচারণা। পাখির কিচিরমিচির শব্দে এলাকাটি হয়ে ওঠে স্বপ্নের বাগান। ঘুমভাঙা মানুষের কলকাকলীতে প্রাণচঞ্চল হয়ে ওঠে পথঘাট।
ফজরের নামাজের পর বিভিন্ন বয়সী মানুষ এখানে হাঁটতে ও শরীরচর্চা করতে আসেন। স্বাস্থ্য সুরক্ষার পাশাপাশি কেউ কেউ সকালের নির্মল বাতাসে একটু স্বস্তির শ্বাস নিতে সিআরবির নৈসর্গিক প্রকৃতির টানে ছুটে যান। নাগরিক জীবনের দুশ্চিন্তা ও ক্লান্তি ভুলে অনেকে খুঁজে পান মানসিক শান্তি-প্রশান্তি।
সিআরবির সৌন্দর্যের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এর প্রাণ-প্রকৃতি। ছোট ছোট টিলা আর চারপাশজুড়ে সবুজের সমারোহ। পথের দুধারে মাথা উঁচিয়ে দাঁড়িয়ে আছে শত শত গাছ। যার মধ্যে রয়েছে একশ বছরের পুরোনো শিরীষ, গর্জন, সেগুন ও কড়ই।
শুধু সকাল নয়, বিকেলেও প্রকৃতিপ্রেমী আর আড্ডাবাজদের ভিড় থাকে এখানে। শিশুরা খেলাধুলা করে। স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা ক্লাস শেষে কিংবা ফাঁকে এখানে এসে আড্ডা দেয়। প্রেমিকযুগলের দেখাও মেলে হরহামেশা। গাছের ছায়ায়, প্রকৃতির আড়ালে-আবডালে হাতে হাত রেখে চলে প্রেমের কথোপকথন।
ভাসমান দোকানেরও শেষ নেই। ভ্যানে বিক্রি হচ্ছে নানা খাবার। ফুচকা, চটপটি, বাদাম, কেক, চা-কফি, আইসক্রিম। পথের ধারে রয়েছে ছোট ছোট ফুলের দোকানও। চলে ড্রাইভিং শেখানোর ক্লাস। প্রাইভেট কার, মোটরসাইকেল ও স্কুটি চালানো শিখছেন অনেকে গভীর মনোযোগে।
মহসিন কলেজের শিক্ষার্থী তাসলিমা আক্তার জানান, অনেক নিরিবিলি, এখানকার প্রকৃতিও সুন্দর। ক্লাস শেষে সময় পেলেই বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিতে আসি।
আরেক শিক্ষার্থী রায়হান উদ্দিন বলেছেন, ‘এটি আমার বাসার কাছেই। তাই সুযোগ পেলেই আসা হয়। বিশেষ করে বিকেলে বন্ধুদের সঙ্গে ফুটবল খেলি।’
প্রকৃতির পাশাপাশি সিআরবি চট্টগ্রামের সাংস্কৃতিক পরিচয়ও বহন করে। শিরীষতলা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের অন্যতম কেন্দ্র। প্রতিবছর বাংলা নববর্ষকে স্বাগত জানাতে এখানে বর্ষবরণ অনুষ্ঠান হয়, যা অনেকের কাছে ঢাকার রমনার বটমূলে আয়োজিত ছায়ানটের অনুষ্ঠানের মতোই আকর্ষণীয়। প্রতিবছর ১৪ ফেব্রুয়ারি ভালোবাসা দিবসেও প্রমা আবৃত্তি সংগঠন এখানে বসন্ত উৎসবের আয়োজন করে। সিনেমা, নাটক কিংবা বিজ্ঞাপনের শুটিংও চলে সিআরবির এই মনোরম সবুজ পরিবেশে।
শুধু মানুষের জন্য নয়, সিআরবি নগরের পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষায়ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। বিশালাকৃতির পুরোনো গাছগুলো প্রতিনিয়ত কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণ করে অক্সিজেন সরবরাহ করছে। ক্রমবর্ধমান নগরায়ন, পাহাড় কাটা, খাল ভরাট, নদী দখল ও বৃক্ষনিধনের কারণে নগরীতে সবুজ এলাকা কমে যাচ্ছে। এমন বাস্তবতায় সিআরবি মানেই প্রকৃতির কাছাকাছি থাকার শেষ আশ্রয়, যা নগরবাসীর কাছে আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক।


