শ্রমবাজারের নতুন ঠিকানা ছোট্ট মালদ্বীপ

সংগৃহীত ছবি
বিদেশের শ্রমবাজারে বাংলাদেশিদের নতুন গন্তব্য হয়ে উঠেছে দক্ষিণ এশিয়ার ছোট্ট দ্বীপরাষ্ট্র মালদ্বীপ। আগে বাংলাদেশিদের প্রধান গন্তব্য ছিল মধ্যপ্রাচ্যের সৌদি আরব, কাতার, ওমান, আরব-আমিরাত, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়ায়। কয়েক বছর ধরে মধ্যপ্রাচ্যনির্ভর সেই শ্রমবাজারের ধারা পাল্টেছে। বেশ ভালোভাবেই জায়গা করে নিয়েছে শ্রীলঙ্কার পাশের দেশ ভারত মহাসাগরের মালদ্বীপ।
মালদ্বীপ মূলত অসংখ্য দ্বীপ নিয়ে একটি পর্যটননির্ভর অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের দেশ। চারদিকে সমুদ্রবেষ্টিত নীল জলরাশি। দেশটির মোট জিডিপির ২৮ শতাংশ আসে বৈদেশিক মুদ্রায় বিদেশি পর্যটক থেকে। পর্যটন খাত থেকে মালদ্বীপের আয় এখন আড়াই বিলিয়ন ডলার, যা বাংলাদেশি টাকায় ৩১ হাজার ২৫০ কোটি টাকা। ছোট দেশ হলেও পর্যটনশিল্পের কল্যাণে দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে মালদ্বীপের মাথাপিছু আয় সবচেয়ে বেশি ১৩ হাজার ২১৬ মার্কিন ডলার, যা বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় থেকে প্রায় পাঁচ গুণ।
২০২৪ সালেও শ্রমবাজারের তালিকায় মালদ্বীপের অবস্থান ছিল নবম। সেই বছর বাংলাদেশ থেকে কর্মী গিয়েছিলেন সাত হাজার। ২০২৫ সালে এসে সেই চিত্র চলে গেছে একেবারে ওপরের দিকে, নবম থেকে চতুর্থ স্থানে। কর্মী গেছেন ৪০ হাজার ১৫৯ জন।
আর চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ১৭ জুন সাড়ে ৫ মাসে মালদ্বীপে কর্মী গেছেন ১৩ হাজারের বেশি। তালিকায় আছে চতুর্থ স্থানে। এত বেশিসংখ্যক বাংলাদেশি কর্মী চাকরি নিয়ে মালদ্বীপ যাচ্ছেন , বছর শেষে তালিকার ২ নম্বরে উঠে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার এবং মালদ্বীপের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, মালদ্বীপ থেকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পাঠানো মোট রেমিট্যান্সের প্রায় ৭২ শতাংশ পাঠান প্রবাসী বাংলাদেশিরা।
২০২৪ সালে মালদ্বীপ থেকে ব্যাংকিং চ্যানেলে বাংলাদেশে রেমিট্যান্স এসেছে প্রায় ১১৫ দশমিক ৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার (বাংলাদেশি মুদ্রায় ১ হাজার ২৫০ কোটি টাকার বেশি)।
২০২৫ সালে রেমিট্যান্স ৯০ কোটি টাকা থেকে বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ১২১ দশমিক ৮ মিলিয়ন মার্কিন ডলার (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১ হাজার ৩৪০ কোটি টাকা)।
২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে মে মাস পর্যন্ত (প্রথম পাঁচ মাসে) মালদ্বীপ থেকে ৪৮ দশমিক ২ মিলিয়ন মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স বাংলাদেশে এসেছে।
মালদ্বীপের ফোর স্টার একটি রিসোর্টে ১২ বছর কাজ করছেন কুমিল্লার রবিউল হোসাইন। তিনি জানালেন, ‘রিসোর্টের চাকরিতে খাওয়া
আর থাকার কোনো খরচ নেই, পুরোটাই কোম্পানির। বেতন যা পাই, তার চেয়ে বেশি আসে ট্যুরিস্টদের দেওয়া ‘সার্ভিস চার্জ’ আর টিপস (বকশিশ) থেকে। সিজন ভালো থাকলে মাসে বাংলাদেশি টাকায় ৮০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা দেশে পাঠানো যায়।’
রবিউল হোসাইন সতর্ক করেছেন, যারা ফ্রি ভিসা বা চাকরির নিশ্চিত ভিসা না নিয়ে কনস্ট্রাকশন কোম্পানিতে কাজ করতে আসেন, তারা বিপদে পড়েন। না পারেন দেশে ফেরত যেতে, না পারেন চাকরি বদলাতে। বাধ্য হয়ে নিম্ন আয়ের চাকরি করেন।
সরকারের জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর উপপরিচালক (প্রশাসন) জহিরুল আলম মজুমদার দীর্ঘদিন শ্রমবাজারের এই ধারা পর্যবেক্ষণে রাখেন। তিনি বললেন, ‘বিদেশের নতুন ও ছোট গন্তব্যগুলো দুঃসময়ে আমাদের জন্য আশীর্বাদ। বড় গন্তব্যগুলো যখন হঠাৎ বন্ধ হয়ে যায়, তখন মালদ্বীপের মতো দেশগুলো বিদেশে শ্রমবাজারের গতি ধরে রাখতে সহায়তা করে।’
জহিরুল আলম মজুমদারের মতে, তিন কারণে বাংলাদেশিদের কাছে নতুন গন্তব্য মালদ্বীপ। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর তুলনায় মালদ্বীপে যাওয়ার অভিবাসন খরচ কিছুটা কম। আত্মীয়-স্বজনের মাধ্যমে সহজে ভিসা পাওয়া যায়। বেতন-ভাতাও তুলনামূলক ভালো।
কর্মসংস্থানের পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, প্রথম ১০টির মধ্যে ছয়টিই ছোট গন্তব্য। যেমন— মালদ্বীপ, কুয়েত, জর্ডান, ইরাক, কম্বোডিয়া, ইতালি।
৫ লাখ ৩০ হাজার জনসংখ্যার মালদ্বীপের ৩০ শতাংশই বিদেশি কর্মী। নিজ দেশের নাগরিক কম থাকায় পর্যটননির্ভর দেশটি বিদেশি কর্মীর ওপর নির্ভরশীল। মালদ্বীপে শুরু থেকেই বাংলাদেশি কর্মীদের আধিপত্য। সে দেশে মোট ১ লাখ ৩০ হাজার বৈধ প্রবাসী আছেন। এর মধ্যে প্রায় ৪৬ শতাংশ কর্মীই বাংলাদেশি। ২৯ শতাংশ কর্মী নিয়ে ভারতের অবস্থান দ্বিতীয়। ১০ শতাংশ কর্মী শ্রীলঙ্কার।
মালদ্বীপে নির্মাণ খাত ও হোটেল পর্যটনসহ সাধারণ সেবামূলক কাজ বাংলাদেশিদের নিয়ন্ত্রণে। একজন গেলে আরেকজন স্বজনকে নেওয়ার প্রবণতা লক্ষ্য করা যায় বাংলাদেশিদের। সে কারণে কর্মীর সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে।




