নতুন এনবিআর চেয়ারম্যান রেসে তারা ৭ জন

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
কে হচ্ছেন জাতীয় রাজস্ব (এনবিআর) বোর্ডের নতুন চেয়ারম্যান? বর্তমান চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খানের মেয়াদ শেষ হবে আগামী ৩০ জুন। দুই বছর চেয়ারম্যান থাকার পর তার মেয়াদ বাড়ানোর কোনো সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না। রাজনৈতিক সরকারের নীতি-কৌশলের সঙ্গেও খাপ খাওয়াতে হিমশিম খাচ্ছেন। তার বিরুদ্ধে এমন অভিযোগও শোনা যায়— কারও কাছে কোনো পরামর্শ শোনার চেয়ে নিজেই বলেন বেশি।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের বিভিন্ন উইংয়ে কর্মরত বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তা ও ব্যবসা-শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মালিকদের সঙ্গে কথা বলে এমন ধারণা পাওয়া গেছে। ভবিষ্যতে রোষাণলে পড়তে পারেন অথবা নিজের ক্ষতি হতে পারে এই ভয়ে তারা নাম প্রকাশ করতে রাজি হননি। কারণ রাজস্ব বোর্ড এমন শক্তিশালী সরকারি সংস্থা চাইলে যখন-তখন যে কারোর ওপর চড়াও হতে পারে।
দাম কমছে চীনের গাড়ির
১২ জুন ২০২৬
বর্তমান রাজনৈতিক সরকার জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান কাকে বানাবেন সে বিষয়ে খুবই সতর্ক ও সংবেদনশীল। বোর্ড প্রধানের ওপর নির্ভর করে রাজস্ব আহরণের গতি ও সাফল্য। আগামী অর্থবছরে এনবিআরের মাধ্যমে অন্তত ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আদায়ের লক্ষমাত্রা নির্ধারণ করা হয় ঘোষিত বাজেটে।
এনবিআর চেয়ারম্যান নিয়োগের ক্ষেত্রে পেশাদার, ব্যবসাবান্ধব ও সৎ কর্মকর্তা নিয়োগ করতে না পারলে পদে পদে অর্থনীতি হোঁচট খাওয়ার আশঙ্কা থাকে। কারণ চেয়ারম্যানের দক্ষতা ও সৃজনশীলতার ওপর নির্ভর করে রাজস্ব আয়ে সফলতা-ব্যর্থতা। কোনো কারণে রাজস্ব আদায়ের ১ শতাংশও হেরফের হলে ৬ হাজার ৪০ কোটি টাকা কম আদায়ের আশঙ্কা থেকে যায়।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনবিআরের এক ঊর্ধ্বতন কমকর্তা জানালেন, এনবিআর চেয়ারম্যানের কোনো পদক্ষেপে ভুল করা যাবে না। তাকে রাজস্ব আদায়ে মনোযোগী একই সঙ্গে উদ্যোগী হতে হয়। যাদের কাছ থেকে কর আদায় হয়, তাদেরকে অতিরিক্ত চাপ প্রয়োগ না করে নতুনভাবে বিস্তৃত করতে হবে কর জাল। অর্থাৎ খুঁজে বের করতে হবে নতুন করদাতা।
প্রায় ২০ বছর পর বিএনপি সরকার এবারের বাজেট ঘোষণা করেছে। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীরও এটি প্রথম বাজেট। বিশ্বের টালমাটাল অর্থনীতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে এ সরকারের জন্য অর্থনীতি সচল রাখা ও উজ্জীবিত করা বিরাট চ্যালেঞ্জ। এরকম পটভূমিতে কাকে করা হবে বা কে হতে যাচ্ছেন এনবিআরের চেয়ারম্যান? এটা এমন গুরুত্বপূর্ণ পদ যাকে বলা হয় রাষ্ট্রীয় কোষাগারের প্রধান রক্ষক।
অন্তত ৭ জন চেয়ারম্যান হওয়ার দৌড়ে এগিয়ে রয়েছেন। নানা উপায়ে চেষ্টা-তদবিরও করছেন তারা। যদিও এদের অনেকে তা অস্বীকার করছেন। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে শীর্ষ পর্যায়ে কারা কোন পদ পাবেন এ নিয়ে বৃহত্তর নোয়াখালী ও বরিশালের মধ্যে প্রতিযোগিতা দীর্ঘদিনের।
এদের তালিকায় রয়েছেন রাজস্ব বোর্ডের সদস্য কর প্রশাসন আহসান হাবিব। বরিশাল তার বাড়ি। সরকারঘনিষ্ঠ দুজনের মাধ্যমে তিনি চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। ভ্যাট-অডিট ও নিরীক্ষা সদস্য সৈয়দ মুশফিকুর রহমান বিএনপি প্রভাবশালী নেতাদের মাধ্যমেই চেয়ারম্যান হওয়ার জন্য তদবির করছেন। লক্ষ্মীপুর তার বাড়ি। শ্বশুরবাড়ি বরিশাল। তিনি একসময় বিদেশি মালিকানাধীন ব্যাংক এএনজেড গ্রিন্ডলেজ ব্যাংকে (বর্তমানে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড) চাকরি করতেন। আছেন তার সহকর্মী শুল্ক প্রশাসনের সদস্য মোয়াজ্জেম হোসেন। তার বাড়ি নোয়াখালীর চাটখিলে। বুয়েটে দুবছর পড়ার পর বিসিএস পরীক্ষা দিয়ে যোগ দেন সরকারি চাকরিতে। ঢাকার রেসিডেন্সিয়াল মডেল স্কুলে পড়ার সময় বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তার ব্যাচমেট ছিলেন বলে শোনা যায়।
রাজস্ব বোর্ডের করনীতির সদস্য মোতাসিম বিল্লাহ ফারুকী। বাড়ি জামালপুরে। তার সম্ভাবনা বেশি বলে তিনি নিজেই ঘনিষ্ঠজনদের বলছেন বলে জানা গেছে। বিএনপি নেতাদের সঙ্গে তার যোগাযোগ পুরনো।
সৈয়দ আবু দাউদ রাজস্ব বোর্ডের অ্যাপিলেট ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান। চট্টগ্রামের কানেকশনে তিনি এ পদের জন্য আগ্রহী। সরকারের একাধিক ব্যক্তির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ প্রভাবশালী এক ব্যবসায়ীও তার বিষয়ে লবিং করছেন বিভিন্ন মহলে।
ভূমি অ্যাপিলেট বোর্ডের চেয়ারম্যান হলেন আবদুল্লা হিল বাকী। তার বাড়ি লক্ষ্মীপুরে। তিনি প্রধানমন্ত্রীর জনপ্রশাসন উপদেষ্টা ইসমাইল জবিউল্লাহর ছোট ভাই।
সমাজকল্যাণ সচিব আবু ইউসুফের বাড়ি নোয়াখালীর বেগমগঞ্জে। পরিশ্রম করতে পারেন। উদ্যমী হয়ে কাজ করার মানসিকতা রয়েছে তার। তার চ্যানেলে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন নীরবে তিনিও।
বিষয়টি জানার জন্য ভ্যাট-অডিট ও নিরীক্ষা সদস্য সৈয়দ মুশফিকুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করলে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। বলছেন, ‘এসব নিয়ে অহেতুক মিথ্যা ট্রল হয়। এ নিয়ে আমরা খুবই বিব্রত।’
তবে একই পদমর্যাদার আরেকজন জানালেন, কেউ চেয়ারম্যানের দৌড়ে আছেন এ খবর এলেই তো ৩০০/৪০০ কোটি টাকা খরচের ট্রল শুরু হয়ে যায়। আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব প্রশ্ন করতে থাকে, সত্যি আমরা এ নিয়ে বিব্রত হই। কারও যদি এতো টাকা থেকেই থাকে, তাহলে সে পৃথিবীর অন্যতম প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের দ্বীপরাষ্ট্র বাহামা গিয়ে অবকাশযাপন না করে কেন সাধারণ মানুষের গালি শুনবে, মন্ত্রীর ঝাড়ি খাবে।
শুল্ক প্রশাসনের সদস্য মোয়াজ্জেম হোসেন জানালেন, ‘চেয়ারম্যান হতে চাই না। এ নিয়ে গুজব ছড়ানো হচ্ছে।’ তার চাকরির মেয়াদ আছে আরও ৬ মাস।
আরেক কর্মকর্তা বললেন, ‘পদটা একটা ‘হাবিয়া দোজখ। ঢাকা-চট্টগ্রামে যেসব খনিতে যে সময়ে চাকরি করেছি, তখন টাকার দাম ছিল বেশি, জমির দাম ছিল কম। এখন জমির দাম অনেক বেশি। কিন্তু সে পথে হাঁটিনি কখনো।’
রাজস্ব বোর্ডের অ্যাপিলেট ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান সৈয়দ আবু দাউদ জানালেন ভিন্ন কথা, ‘চাকরির মেয়াদ আছে আরও ১১ মাস। একটু শান্তিতে থাকতে চাই।’
অন্য একজন কর্মকর্তা নিজের পরিচয় গোপন করে জানালেন, এই রেস থেকে ৩ মাস আগেই সরে এসেছি। এ পদে যারা কাজ করছেন বা করেছিলেন তাদের অনেকেই এখন ঝামেলায় আছেন। এ পদ এখন একটি বিরাট বোঝা মনে হয়। বুদ্ধিমানদের কেউই এ পথে হাঁটবেন না।






