হাসপাতালে ছেলের জন্য বাবা, বাবার জন্য ছেলে

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের শিশু স্বাস্থ্য বিভাগ— আগামীর সময়
শাহদাত হোসেন তার দুই বছর বয়সী ছেলেকে নিয়ে আজ পাঁচ দিন ধরে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে। ছেলেটির জ্বর। ছেলে অসুস্থ তাই শাহদাত নিজের কাজ ফেলে পড়ে আছেন হাসপাতালে। তিনি বললেন, ‘ছেলে অসুস্থ থাকলে মা-বাবার কি কোনো কিছু ভালো লাগে।’
হাসপাতালের শিশু স্বাস্থ্য বিভাগ ঘিরে শুধু এ রকম উৎকণ্ঠা নিয়ে মা-বাবাদের ছুটোছুটি। সাধারণত মায়েরা শয্যাপাশে থাকেন। ওষুধ আনা, পরীক্ষার রিপোর্ট সংগ্রহ থেকে শুরু করে বাকি সবকিছু বাবাদের ওপরই থাকে বেশির ভাগ সময়। এখন হামের মৌসুম। প্রতিদিনই শিশুরা আসছে, চিকিৎসা নিচ্ছে। আর বাবাদের ঘুম হারাম।
সাধারণত নিম্ন বা মধ্যবিত্ত পরিবারের লোকজনের প্রধান ভরসা চমেক হাসপাতাল। এখানে আসা লোকদের বাবা দিবস সম্পর্কে কোনো ধারণা নেই। তবু এদিনেও বাবারা সন্তানের সুস্থতার জন্য প্রাণপণ ছুটছেন। এই যেমন গাড়িচালক শাহদাত হোসেন। বাসা শেরশাহ বাংলাবাজার এলাকায়। ছোট ছেলে আবদুল্লাহকে নিয়ে হাসপাতালের ৮ নম্বর শিশু স্বাস্থ্য বিভাগে আছেন।
শাহদাত জানালেন, ছেলেটির কয়েকদিন ধরে জ্বর। মেরিন সিটি হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিলাম। সেখানে চার দিন ছিল। ওখান থেকে এখানে নিয়ে এলাম। এখনো সুস্থ হচ্ছে না। গাড়ি বন্ধ রেখেছি অনেকদিন। ছেলেকে একটু সুস্থ করে বাসায় ফিরতে পারলেই বাঁচি।
শুধু এই ছেলে নয়, বাসায় থাকা বড় ছেলের জন্যও চিন্তা হচ্ছে শাহদাতের। স্ত্রীও হাসপাতালে ছোট ছেলের সুস্থতার জন্য পড়ে আছেন। বাসায় স্বজনদের কাছে থাকা বড় ছেলের জন্য প্রাণ কাঁদছে বাবা শাহদাতের।
স্বজন ত্রিপুরার ছেলেটি হাম আক্রান্ত। আজ এক সপ্তাহের বেশি সময় ধরে চমেক হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) রয়েছে তার ছেলে আর্য ত্রিপুরা। আট মাস বয়সী শিশুটিকে বাঁচাতে ফটিকছড়ির এই কাঠমিস্ত্রি আইসিইউর ফটকের মুখে আবাস পেতেছেন। স্ত্রী আইসিইউর ভেতরে সন্তানের পাশে। বিনিদ্র রাত কাটছে তাদের।
আজ রবিবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে স্বজনের সঙ্গে ওয়ার্ডের মুখে দেখা। প্রতিবেদকের সঙ্গে গত এক সপ্তাহে ওয়ার্ডের সামনে দুবার দেখা হয় স্বজনের। সে কারণে দেখেই চিনতে পারলেন। তখন তিনি একটা ওষুধ নিয়ে ওয়ার্ডে ঢুকছিলেন। ছেলে কেমন আছে জিজ্ঞেস করতেই মাথা নেড়ে জানালেন, ভালো না।
‘ডাক্তার নাকি কী জন্য ডেকেছেন। আমি ভেতর থেকে দেখা করে আসি। ছেলের অবস্থা এখনো উন্নতি হয়নি।’ -বলতে বলতে স্বজন আইসিইউ ওয়ার্ডের দিকে পা বাড়ালেন। একটু পরই ছেলের ফাইল নিয়ে ভেতর থেকে বের হয়ে এলেন স্বজন। ফটিকছড়ির এই যুবক পড়তে পারেন না। তাই ফাইলটিতে ডাক্তার কী লিখেছেন তা দু-একজনকে দেখাচ্ছেন। পরে তিনি ওই ফাইল নিয়ে ছুটলেন হৃদরোগ বিভাগের দিকে। একেবারে দৌড় বলা যায়। একমাত্র সন্তানকে বাঁচাতে প্রায় ২০ দিন ধরে স্বজন এভাবে দৌড়াচ্ছেন। বাবা বলে কথা। সন্তানের প্রতি ভালোবাসার প্রকাশ এই দৌড়ের মধ্যেই নিহিত। আলাদা করে প্রকাশ করতে হয় না। বাবারা প্রকাশ করেনও না। ছেলেমেয়েদের ভালোর জন্য তাদের এই দৌড়ঝাঁপ। বড় হয়ে কেউ বোঝে, কেউ বোঝে না।
এই যেমন একই হাসপাতালের নিচতলায় ক্যানসার বিভাগে বাবাকে নিয়ে এসেছেন ছেলে মো. সায়েম। সম্প্রতি তার বাবার ক্যানসার ধরা পড়েছে, পাকস্থলীতে। হুইল চেয়ারে বসা বাবাকে নিয়ে ডাক্তারের অপেক্ষায় রয়েছেন তিনি।
সায়েম বললেন, ‘বাবার ক্যানসার ধরা পড়েছে। দুইটা কেমোথেরাপি নিয়েছে। শরীর খারাপ হয়ে গেছে। এত বছর আমাদের জন্য অনেক করেছে। এখন নিজের শয্যাশায়ী অবস্থা। যদি একটু সুস্থ হতো।’





