ওরাসকমের সুরে আরব কন্ট্রাক্টরস ‘চুক্তি করিনি, প্রতিনিধিও নেই’

সংগৃহীত ছবি
চট্টগ্রামে ৩০ হাজার কোটি টাকার মনোরেল প্রকল্প হাতিয়ে নেওয়ার চেষ্টায় লিপ্ত জালিয়াত চক্রটির দাবি এবার পুরোপুরি নাকচ করে দিয়েছে মিসরের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ও আরবের শীর্ষস্থানীয় নির্মাণ প্রতিষ্ঠান ‘দি আরব কন্ট্রাক্টরস’।
বৈশ্বিক নির্মাণ জায়ান্ট ওরাসকম কনস্ট্রাকশনের পর এবার আরব কন্ট্রাক্টরস কর্তৃপক্ষও লিখিতভাবে স্পষ্ট জানিয়েছে, বাংলাদেশে তাদের কোনো ধরনের ব্যবসায়িক কার্যক্রম, প্রকল্প, অফিস কিংবা কোনো স্থানীয় প্রতিনিধি নেই। প্রতিষ্ঠানটির বিজনেস ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ ডিপার্টমেন্টের ম্যানেজিং ডিরেক্টর ইঞ্জিনিয়ার লুবনা শাতলা আগামীর সময়ের পাঠানো ইমেইলের আনুষ্ঠানিক জবাবে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। গতকাল শনিবার বাংলাদেশ সময় দুপুর ২টা ৪৬ মিনিটে আসে তার এই জবাব।
এর আগে ওরাসকম কনস্ট্রাকশন গ্রুপ কায়রোর প্রধান কার্যালয় থেকে এই চক্রের কথিত ‘আরব কন্ট্রাক্টরস-ওরাসকম পেনিনসুলা কনসোর্টিয়াম’কে সম্পূর্ণ অবৈধ ও ভুয়া ঘোষণা করা হয়েছিল।
এবার কনসোর্টিয়ামের মূল অংশীদার দাবি করা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান আরব কন্ট্রাক্টরসের পক্ষ থেকেও এলো একই ধরনের অস্বীকৃতি। আর এত কিছুর পরও যার বিরুদ্ধে জালিয়াতির অভিযোগ, সেই কাউসার আলমের পক্ষে অবস্থান নিল চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন।
শনিবার চসিকের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেনের পক্ষে গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, চট্টগ্রাম মনোরেল প্রকল্প বাস্তবায়নের লক্ষ্যে গত ২৪ জুন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের সঙ্গে ‘দি আরব কন্ট্রাক্টরস’, ‘ওরাসকম কনস্ট্রাকশন’ এবং ‘পেনিনসুলা কনসোর্টিয়াম’-এর স্বাক্ষরিত সমঝোতা চুক্তিতে কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনা হয়েছে। প্রকল্পটির স্বার্থে গৃহীত সংশোধিত সিদ্ধান্তগুলোও সেখানে তুলে ধরা হয়েছে।
অংশীদারত্বের পরিবর্তন: এই জয়েন্ট ভেঞ্চার থেকে ‘ওরাসকম কনস্ট্রাকশন’ এবং ‘পেনিনসুলা কনসোর্টিয়াম’কে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। ওরাসকম কনস্ট্রাকশন এই প্রকল্পে বিনিয়োগকারী বা প্রধান ঠিকাদার হিসেবে দায়িত্ব পালন করবে না।
মূল দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান: চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের সঙ্গে ‘দি আরব কন্ট্রাক্টরস’ এককভাবে বিনিয়োগকারী এবং প্রধান ঠিকাদার হিসেবে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে। ‘ওরাসকম কনস্ট্রাকশন বাংলাদেশ’ উক্ত প্রকল্পে প্রয়োজনীয় সব ধরনের লজিস্টিক সহায়তা দেবে।
মেয়রের বক্তব্য: প্রতিবেদন প্রকাশের জের ধরে আগামীর সময়ে টেলিফোন করেছিলেন চট্টগ্রাম সিটি মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন। তিনি বললেন, ‘এখানে সিটি করপোরেশন বা সরকারের কোনো টাকা খরচ হচ্ছে না। কেউ বিদেশি বিনিয়োগ আনতে পারলে প্রকল্প বাস্তবায়ন হবে। এ ব্যাপারে এখন আমরা সতর্ক আছি। এ ছাড়া অনেক বিদেশি প্রতিনিধি করপোরেশনের কাছে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প নিয়ে আসে। আমরা চট্টগ্রামের জনগণের স্বার্থ বিবেচনা করে সেই সব প্রকল্পের ব্যাপারে অগ্রসর হই।’
সরকারের প্রতিনিধি সেজে কায়রোতে যোগাযোগ: লুবনা শাতলার পাঠানো অফিসিয়াল ইমেইলে উঠে এলো এক ‘চাঞ্চল্যকর’ তথ্য। তিনি জানালেন, এই জালিয়াত চক্রের মূল হোতা হিসেবে চিহ্নিত কাউছার আলম চৌধুরী মূলত উল্টো কায়দায় জালিয়াতির ছক পেতেছিলেন। তিনি কায়রোতে আরব কন্ট্রাক্টরসের কাছে নিজেকে ‘বাংলাদেশ সরকারের প্রতিনিধি’ হিসেবে পরিচয় দেন। তিনি দাবি করেছিলেন, বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট উচ্চপদস্থ কর্তৃপক্ষের পক্ষে তিনি মিসরের এই রাষ্ট্রীয় কোম্পানির সঙ্গে সহযোগিতার সম্ভাব্য সুযোগ খতিয়ে দেখতে চান।
আরব কন্ট্রাক্টরসের পক্ষ থেকে অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে জানানো হয়েছে, বাংলাদেশে তারা কোনো ধরনের চুক্তি, কার্যাদেশ, প্রকল্প প্রতিশ্রুতি, সমঝোতা স্মারক কিংবা কোনো বাধ্যতামূলক নথিতে স্বাক্ষর বা চূড়ান্ত করেনি। এ বিষয়ে কাউছার আলম চৌধুরীর বক্তব্য চাওয়া হলে তিনি আবারও নিজেকে আরব কন্ট্রাক্টরসের অনুমোদিত প্রতিনিধি দাবি করেন। একই সঙ্গে বাংলাদেশ সরকার ও আরব কন্ট্রাক্টরসের মধ্যে লিয়াজোঁ করেন বলে দাবি করেন।
প্রকল্পটির পদে পদে জালিয়াতি: অনুসন্ধানে দেখা যাচ্ছে, কাউছার আলম চৌধুরী কোম্পানি আইন ১৯৯৪-এর ৩৭৯ ধারা এবং বিডা আইন ২০১৬-এর ন্যূনতম বাধ্যবাধকতা তোয়াক্কা না করে টঙ্গীর একটি সাধারণ ঠিকাদারি মেয়াদোত্তীর্ণ ট্রেড লাইসেন্স দেখিয়ে এই জালিয়াতি চালিয়ে যাচ্ছিলেন।
শুধু তাই নয়, রেজিস্ট্রেশন আইন, ১৯০৮-এর ৩৩(১)(গ) ধারা অনুযায়ী বিদেশি কোনো কোম্পানির পক্ষ থেকে বাংলাদেশের বাইরে পাওয়ার অব অ্যাটর্নি সম্পাদন করতে হলে তা নোটারি পাবলিক বা সংশ্লিষ্ট দেশের বাংলাদেশি কনস্যুলারের কাছ থেকে সত্যায়িত হওয়া বাধ্যতামূলক। যেহেতু কায়রোর মূল দুটি প্রতিষ্ঠানের কোনোটিই কাউছারকে কোনো আমমোক্তারনামা না দেওয়ায় এটাই প্রমাণ হয়, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক) ও বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) নথিতে কাউছার আলমের জমা দেওয়া কথিত ‘পাওয়ার অব অ্যাটর্নি’ যে সম্পূর্ণ জালিয়াতি ও জাল নথির ওপর ভিত্তি করে তৈরি।
চুক্তি ও কর্মকর্তার সই জালিয়াতি: ২০২৫ সালের ১ জুন নগরের আগ্রাবাদ ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারে জমকালো আয়োজনের মধ্য দিয়ে এই চুক্তি সই হয়েছিল, যা সেদিন বিভিন্ন গণমাধ্যমে ফলাও করে প্রকাশিত হয়। অথচ রহস্যজনকভাবে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনে থাকা মূল চুক্তির নথিতে স্বাক্ষরের তারিখ দেখানো হয়েছে ২৪ জুন। ১ জুনের চুক্তি কীভাবে নথিতে ২৪ জুন হয়ে গেল, তা নিয়ে সিটি করপোরেশনের কোনো বক্তব্য নেই।




