হানিট্র্যাপ-ব্ল্যাকমেইলের চক্রে ছিলেন সেই ৬৩ বিদেশি
- ভুয়া ই-কমার্স ওয়েবসাইটের আড়ালে ভয়ংকর সাইবার অপরাধের জাল
- স্মার্ট ওয়াচের মাধ্যমে ব্যক্তিগত সংবেদনশীল তথ্য হাতিয়ে নেয়ার ছক
- ‘কূটনৈতিকভাবে আমাদের ইমেজের যথেষ্ঠ ক্ষতি হতো’

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লোভনীয় ক্যাটালগ আর সস্তা নন-ব্র্যান্ড গ্যাজেটের (ইলেকট্রনিক্স পণ্য) বিজ্ঞাপন। ক্লিক করলেই সস্তায় মিলবে স্মার্ট ডিভাইস। কিনে ব্যবহারের পর হয়তো কখনো দেখা যাবে ব্যবহারকারীর ফোনের গোপন সব তথ্য চক্রের হাতে।
গোপনে হাতিয়ে নেয়া গ্যালারির ছবি, কন্টাক্ট নম্বর ও সংবেদনশীল ব্যক্তিগত সব তথ্য। পরে সেই তথ্য ব্যবহার করেই পাতা হচ্ছে ‘হানিট্র্যাপ ও ব্ল্যাকমেইলিংয়ের’ এক কঠিন ফাঁদ।
অখ্যাত পণ্য আর ভুয়া ই-কমার্স ওয়েবসাইটের আড়ালে এমনই এক ভয়ংকর সাইবার অপরাধের জাল তৈরির সব আয়োজন সম্পন্ন হয়েছিল চট্টগ্রাম নগরীর খুলশীতে। কিন্তু পুলিশের অভিযানে চীন, পাকিস্তান, নেপাল, ভিয়েতনাম ও লাওসের মোট ৬৩ নাগরিককে গ্রেপ্তারের পর আপাতত ভণ্ডুল হয়ে গেল সেই আয়োজন।
এ ঘটনায় করা মামলা তদন্ত ও আন্তর্জাতিক সাইবার অপরাধী চক্রের কর্মকাণ্ড অনুসন্ধান করছে সিএমপির কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিট।
সংস্থার উপকমিশনার মোহাম্মদ শামীম হোসেন আগামীর সময়কে বললেন, ‘এরা যদি কাজটা পরিপূর্ণভাবে শুরু করতে পারতো আমাদের সাথে অন্যান্য দেশের সম্পর্ক খারাপ হওয়ার আশঙ্কা ছিল। এজন্য আমরা পূর্ণশক্তি নিয়ে প্রথমেই তাদের ঘাঁটিটাকে আইনের আওতায় নিয়ে এলাম। কারণ এটা যদি কোনো বাংলাদেশি লিড না-ও করে, তা-ও তো অপরাধটা সংঘটিত হচ্ছিল বাংলাদেশের ভূমি ব্যবহার করে। বাংলাদেশের আইপি ব্যবহার করে। আর সাইবার স্পেস তো বর্ডারলেস। কূটনৈতিকভাবে আমাদের ইমেজের যথেষ্ট ক্ষতি হতো।’
পুলিশ বলছে, চীন থেকে পরিচালিত হচ্ছিল সাইবার অপরাধীদের এ নেটওয়ার্ক। এতে জড়িত চীন ও পাকিস্তান নাগরিকদের সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেট। তাদের টার্গেট দক্ষিণ-মধ্য এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ। এ ধরনের অপরাধী চক্রের শক্ত ঘাঁটি ছিল পূর্ব এশিয়ার দেশ কম্বোডিয়া ও লাউসে। সেখানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাঁড়াশি অভিযানের মুখে তারা নিরাপদ ঘাঁটি গড়ার চেষ্টা করছিল বাংলাদেশে। গ্রেপ্তার ৬৩ জনের মধ্যে ৩৫ জন লাওসের, পাকিস্তানের ২১ জন, চীনের ৫ জন, নেপাল ও ভিয়েতনামের ২ জন নাগরিক। এদের মধ্যে কমপক্ষে ৫০ জন আগেও একাধিকবার কম্বোডিয়া সফর করেছেন। গত তিন মাসের মধ্যে তারা ২-৩ জন করে গ্রুপে-গ্রুপে ভাগ হয়ে ভিজিট ভিসায় বাংলাদেশে প্রবেশ করেন।
সাইবার অপরাধীদের ‘স্বর্গরাজ্য’ কম্বোডিয়া সফরের তথ্য পাসপোর্টে থাকার পরও বিনা বাধায় তারা কীভাবে বিমানবন্দরে ইমিগ্রেশন পার হল, এ নিয়ে পুলিশে জোর আলোচনা চলছে।
পুলিশের কেন্দ্রীয় বিশেষ শাখার ডিআইজি-ইমিগ্রেশন মোহাম্মদ মোয়াজ্জেম হোসেন আগামীর সময়কে বললেন, ‘বিষয়টি আমাদের নজরে এসেছে। এটা আমরা খতিয়ে দেখছি।’
গ্রেপ্তার ৬৩ জনের মধ্যে অপরাধী চক্রের মূল হোতা নেই। এদের অধিকাংশই বিষয়টি সম্পর্কে অবগত নন। তারা চাকরি করতে এসেছিলেন। আমদানি-রপ্তানির ব্যবসা ও বিদেশি বিভিন্ন নামীদামী ব্র্যান্ডের পণ্য মার্কেটিংয়ের কথা বলে তাদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল।
পাকিস্তানিদের প্রত্যেকের বেতন ধরা হয়েছিল মাসিক ৩৫০ মার্কিন ডলার। নেপালের নাগরিকের ৩০০ ডলার। লাওসের নাগরিকদের মধ্যে একজন ছাড়া কেউ ইংরেজিতে কথা বলতে জানেন না। তাদের বিষয়ে খুব বেশি তথ্য পাওয়া যায়নি। পাকিস্তানিরা বাংলাদেশে আসেন নেপালের এজেন্টের মাধ্যমে সেই দেশ ঘুরে। অন্যরা এসেছেন চীনা এজেন্টের মাধ্যমে। এরা বাংলাদেশে পৌঁছানোর পর তাদের পাসপোর্ট কেড়ে নেয় যারা তাদের এখনো শনাক্ত করা যায়নি। নগরীর খুলশী থানার জালালাবাদ কৃষ্ণচূড়া আবাসিক এলাকায় দুবাই প্রবাসী এক ব্যক্তির সাততলা একটি ভবন ভাড়া করে তাদের রাখা হয়েছিল। অনেকটা বন্দি অবস্থায় তারা ছিলেন। শুধুমাত্র বেডরুম থেকে ডাইনিং রুম পর্যন্ত সীমাবদ্ধ। ওই ভবনের বার্ষিক ভাড়া নির্ধারণ হয়েছিল এক কোটি টাকা।
সিএমপির কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটের উপকমিশনার মোহাম্মদ শামীম হোসেন বললেন, ‘মোহাম্মদ মহসীন নামে এক ব্যক্তির নাম আমরা পেয়েছি। তিনি বিদেশি নাগরিকদের খুলশীর ভবনে নিয়ে যান। ভবন মালিকের সঙ্গে ভাড়ার চুক্তিপত্র করে রাকিব নামে এক ব্যক্তি। বিদেশি নাগরিকদের বাড়ি ভাড়া দিতে হলে কিংবা তাদের অবস্থানের বিষয়ে পুলিশের এসবি ও লোকাল থানায় জানানোর নিয়ম আছে। কিন্তু এক্ষেত্রে তারা বিষয়টি গোপন রেখেছিলেন। কোকেন মামলায় মহসিন গ্রেপ্তার হওয়ার পরই বিষয়টি উদঘাটিত হয়।’
খুলশীর ভবনটিতে সার্ভার স্টেশন বানিয়ে মূলত প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছিল গ্রেপ্তার ৬৩ জনকে। সেখানে আরও অন্তত শতাধিক বিভিন্ন দেশের নাগরিক যুক্ত হওয়ার পরিকল্পনা ছিল। গ্রেপ্তার কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে পুলিশ কর্মকর্তারা জানতে পেরেছেন, ভূয়া ওয়েবসাইট তৈরি করে পণ্য বিক্রির বিজ্ঞাপন দেওয়া, পণ্যের অর্ডার নিয়ে সরবরাহ না করা অথবা নকল পণ্য সরবরাহ করার বিষয়ে তাদের প্রাথমিক প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছিল। লাওস-ভিয়েতনামের নারীদের ব্যবহার করে টার্গেট ব্যক্তিকে হানিট্র্যাপে ফেলে ব্ল্যাকমেইলিং করার উদ্দেশ্য ছিল। এছাড়া সস্তা ডিভাইসে তথ্য চুরির ছক পাতা হয়েছিল।
নাম প্রকাশে অনাগ্রহী কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটের এক পরিদর্শক বললেন, ‘বাজারে বিভিন্ন নন-ব্র্যান্ড স্মার্টওয়াচ, ফিটনেস ট্র্যাকার বা ডিজিটাল গ্যাজেটে আগেই ইনস্টল করা থাকে অনিরাপদ সফটওয়্যার ও স্পাইওয়্যার। চক্রটি ভুয়া ওয়েবসাইট খুলে ভুয়া অর্ডারের মাধ্যমে এসব পণ্য গ্রাহকদের হাতে পৌঁছে দিত। স্মার্টফোন যুক্ত করার বা সাধারণ সফটওয়্যার ইনস্টল করার পরপরই ব্যবহারকারীর অজান্তে ফোনের পুরো নিয়ন্ত্রণ চলে যেত চক্রের হাতে।’
‘সস্তা পণ্যের ভুয়া ক্যাটালগ দেখিয়ে ই-কমার্স পেজ ও ওয়েবসাইটের মাধ্যমে সংগ্রহ করা হতো গ্রাহকদের নাম, ঠিকানা ও ফোন নম্বর। হানিট্র্যাপের ফাঁদে ফেলে ব্যক্তিগত ছবি ও তথ্য ছড়িয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে আদায় করা হতো মোটা অঙ্কের অর্থ। এছাড়া ক্যাসিনো, অনলাইন বেটিংয়ের মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহের পরিকল্পনাও তাদের ছিল। হুন্ডি এবং ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে অর্থ পাচার করে দেওয়া হতো। এক্ষেত্রে তাদের টার্গেট শুধু বাংলাদেশিরা নন। তাদের টার্গেট ছিল বিদেশি ভিআইপিরা।’



