সাম্পান বাইচে থইথই কর্ণফুলী

ছবি: রনি দে
মিজোরামের লুসাই পাহাড় থেকে নেমে আসা কর্ণফুলী নদী। স্রোতঃস্বিনী নদী ঘিরে এ জনপদের ইতিহাস ঐতিহ্য এবং সাহিত্য-সংস্কৃতি সমৃদ্ধ হয়েছে বারবার। কবি-সাহিত্যিকদের কলমে ফুটেছে হাজারো গল্প, কবিতা, গান। কর্ণফুলীর সঙ্গে আষ্টেপৃষ্ঠে মিশে রয়েছে সাম্পান। আর সাম্পানের মাঝিই যেন কর্ণফুলী নামের এই স্রোতধারার মূল নায়ক।
সময়ের সঙ্গে সাম্পানে যোগ হয়েছে ইঞ্জিন। তবুও ঐতিহ্যের বৈঠাযুক্ত সাম্পানকে কি ভোলা যায়? বিলুপ্তির পথে চিরায়ত এ সাম্পান ঘিরে প্রতি বছর অনুষ্ঠিত হয় প্রতিযোগিতা বা সাম্পান বাইচ, যা দেখতে হাজার হাজার নর-নারী দুই পাড়ে এবং নদীতে ভিড় জমায়। এক অপূর্ব আনন্দযজ্ঞ! রবিবার গোধূলিলগ্নে এই সাম্পান বাইচের ২০তম আসরটি হয়ে গেল কর্ণফুলীর বুকে।
কর্ণফুলী এমনই এক নদী— আছে প্রবল স্রোত, তালের ঢেউ। বঙ্গোপসাগরের জোয়ার-ভাটায় এই নদী কখনো চঞ্চলা-যৌবনা আবার কখনো ম্রিয়মাণ— যেন বয়োবৃদ্ধ নারী। দেশ-বিদেশের হাজার হাজার পণ্যবাহী জাহাজ ভেড়ে, নোঙর করে নদীর মোহনার জেটিতে। বছর জুড়ে অর্থনীতির আদান-প্রদান। বাংলাদেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের ৯০ শতাংশের বেশি একে কেন্দ্র করেই। এত বৈচিত্র্যময় রূপ দেশের কোনো নদীর কি আছে! কিন্তু কর্ণফুলীকে অকারণ অত্যাচারে অতিষ্ঠ করে তুলেছে দুই পাড়ের মানুষরা।
নদীকে বাঁচানোর এ উদ্যোগ অনন্য। কর্ণফুলী পুরো দেশের অর্থনীতির প্রাণ। এটাকে বাঁচাতে হবে
নদীর দখল-দূষণ বন্ধ করতে ২০০৬ সাল থেকে শুরু এ সাম্পান বাইচ। এ অঞ্চলের আরেক প্রাণের উৎসব ও মেলা— শতবর্ষী জব্বারের বলীখেলা। এ সাম্পান বাইচও সেই ঐতিহ্যের পথে হাঁটছে ধীরলয়ে । বিকাল ৩টা থেকে নদীর দুই পাড়ে ভিড় জমতে থাকে মানুষের। বিভিন্ন বয়সী নারী-পুরুষ ভাসছিলেন নদীর বুকের নৌযানেও।
সাউন্ডবক্স লাগিয়ে গানও বাজানো হচ্ছিল সেসব নৌযানে। চট্টগ্রামের আঞ্চলিক গানের জনপ্রিয় জুটি শ্যামসুন্দর বৈষ্ণব ও শেফালি ঘোষের ‘কর্ণফুলীর সাম্পানওয়ালা আঁর মন হরি নিল’ কিংবা ‘ওরে কর্ণফুলীরে সাক্ষী রাখিলাম তোরে’ ইত্যাদির তালে তালে ছিল আনন্দ নৃত্য।
যেন নৌকাবাইচ মিলিয়ে দিল দুই পাড়কে। বাইচ দেখতে দেখতে এপার থেকে কেউ চিৎকার করছিলেন। ওপারে শোনা না গেলেও মনে হচ্ছিল যেন সাড়া দিচ্ছেন হাত নেড়ে। নৌকাবাইচ ঘিরে দুই পাড়ের মানুষের এরকম উৎসব-উৎসাহ ফ্রেমবন্দি হলো।
নদীপাড় থেকে হাজার হাজার নারী-পুরুষের উৎসুক চোখ ছিল ওরা ১১ জনের দিকে। মানে ১১টি সাম্পানে। প্রতিটি সাম্পানে ৯ জন করে মাঝি। নদীর অভয়মিত্র ঘাট থেকে বিকাল সাড়ে ৪টায় শুরু হয় এই বাইচ। কর্ণফুলীর ঢেউ ঠেলে নদীর চর পাথরঘাটা অর্থাৎ, দক্ষিণ প্রান্তে ছুটতে থাকে সাম্পান। একপর্যায়ে পৌঁছে যায় গন্তব্যে।
এবারের প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়ন হয় চর পাথরঘাটা বড় সাম্পান সমিতির মোজাম্মেল মাঝি। দ্বিতীয় হয়েছেন শিকলবাহা এলাকার কাশেম মাঝি। তৃতীয় পুরস্কার জিতেছেন চর পাথরঘাটার রনি মাঝি।
চট্টগ্রাম ইতিহাস সংস্কৃতি গবেষণা কেন্দ্রের উদ্যোগে প্রতিবারের মতো এবারও তিন দিনব্যাপী এই আয়োজনের শেষদিনে এ সাম্পান বাইচ অনুষ্ঠিত হয়। নানা আয়োজনের পাশাপাশি কর্ণফুলী উপজেলার চর পাথরঘাটা এলাকায় তিন দিনব্যাপী বিশাল মেলা বসে।
চর পাথরঘাটার স্থানীয় যুবক মোরশেদ ও চট্টগ্রাম ইতিহাস সংস্কৃতি গবেষণা কেন্দ্রের মুখপাত্র আলিউর রহমান একই সুরে জানান, প্রতি বছর এই আয়োজন দেখতে নদীপাড়ের বাড়িঘরে আত্মীয়স্বজন নাইয়োর (বেড়াতে) আসে।
যমুনাপাড়ের বাসিন্দা ভোলা জেলার মিরাজ হোসেনও বাইচ দেখতে এসেছেন। তার ভাষায়, নদীকে বাঁচানোর এ উদ্যোগ অনন্য। কর্ণফুলী পুরো দেশের অর্থনীতির প্রাণ। এটাকে বাঁচাতে হবে।






