চৈত্রসংক্রান্তি : ঔষধি ও পুষ্টিগুণে ভরা শত পদের পাঁচন

চৈত্র সংক্রান্তি ও পহেলা বৈশাখকে ঘিরে চট্টগ্রাম নগরের অলিগলিতে বসেছে পাঁচনের উপকরণের জমজমাট বাজার
চৈত্রের শেষের তপ্ত দুপুর। চারদিকে পুরনো বছরকে বিদায় জানানোর আবহ। এ সময় রান্নাঘর থেকে ভেসে আসে এক বিশেষ সুঘ্রাণ— এক বা দুই পদের নয়, বরং শতরকম গাছগাছড়া, লতাপাতা আর নানা সবজির সমন্বয়ে তৈরি এক অনন্য আয়োজন, যার নাম ‘পাঁচন’।
বাঙালি সংস্কৃতি ও লোকজ ঐতিহ্যের এক অসাধারণ বহিঃপ্রকাশ এই নিরামিষ পদ।
চৈত্রসংক্রান্তি ও পহেলা বৈশাখ ঘিরে চট্টগ্রাম নগরের অলিগলিতে বসেছে পাঁচনের উপকরণের জমজমাট বাজার।
পুষ্টিবিদদের মতে, প্রাচীনকালে যখন আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি, তখন ঋতু পরিবর্তনের সময় রোগ প্রতিরোধে পাঁচনের মতো মিশ্র সবজি খেত মানুষ।
আবার আয়ুর্বেদ মতে, তিতা, কষা ও মিষ্টি স্বাদের মিশ্রণ শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সহায়ক। লোকবিশ্বাস আছে, চৈত্রসংক্রান্তিতে পাঁচন খেলে শরীরে জমে থাকা বিষাক্ত উপাদান দূর হয় এবং নতুন বছর সুস্থভাবে শুরু করা যায়।
পাঁচন শুধু একটি খাবার নয়, এটি পার্বত্য অঞ্চলের ‘বিজু’ এবং সমতলের ‘সংক্রান্তি’ উৎসবের অবিচ্ছেদ্য অংশ। প্রচলিত আছে, পাহাড়ের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীরা ১০১ পদের উপাদানে এবং সমতলের বাঙালিরা ১০৮ পদের উপকরণ দিয়ে পাঁচন রান্না করে। ইতিহাস বলছে, ঋতু পরিবর্তনের সময় শরীর সুস্থ রাখতে আয়ুর্বেদিক ধারণা থেকেই এ ভেষজ মিশ্রণের প্রচলন।
আজ সোমবার নগর ঘুরে দেখা যায়, হরেক রকম সবজি, লতাপাতা আর ভেষজ সংগ্রহে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন নারী-পুরুষ সবাই।
রাস্তার দুই পাশে সাজানো কাঁচা কাঁঠাল, ডুমুর, বাঁশ কোঁড়ল, গিমা শাক, কচুরমুখী, মেটে আলু, কাঁকরোল, পটোল, শজনে ডাঁটা, নিমপাতাসহ নানা উপকরণ। গৃহিণী ও গৃহকর্তারা প্রয়োজন অনুযায়ী কিনছেন এসব।
বোয়ালখালী থেকে আসা বিক্রেতা মো. মিজান বলছিলেন, প্রতিবছর চৈত্রসংক্রান্তির আগে নানা ধরনের সবজি নিয়ে আসা হয় এখানে। এবারও আনা হয়েছে প্রায় ৪৫ পদের উপকরণ। অন্যদিকে, পটিয়ার সত্তরোর্ধ্ব কাজল মিয়ার ভাষ্য, আগে পাঁচন রান্নার প্রচলন ছিল বিভিন্ন বাড়ি থেকে সংগ্রহ করা লতাপাতা দিয়ে। এখন অনেক উপাদান পাওয়া যায় না খুব সহজে।
স্থানীয় বাসিন্দা গৌতম দত্ত জানান, পঞ্জিকা অনুযায়ী ১৪ এপ্রিল চৈত্রসংক্রান্তিতে পাঁচন রান্না করা হয়। ১০৮ পদের কথা থাকলেও এখন যতটুকু পাওয়া যায়, তা দিয়েই রান্না করা হয়।
আরেক ক্রেতা বিশ্বজিৎ সেন বললেন, পাঁচনে সাধারণ সবজির পাশাপাশি তিতা ও ভেষজ উপাদানই এনে দেয় আসল বৈশিষ্ট্য। কাঁঠালের বিচি, শিমের বিচি, কাঁচকলা, ডুমুর, বাঁশ কোঁড়লসহ বিভিন্ন উপকরণ এতে যোগ করে বিশেষ স্বাদ। অনেকে বিশ্বাস করেন, পাঁচনের পুষ্টিগুণ ও শুভফল বাড়ে রান্না করার সময় অন্তত সাতটি বাড়ি থেকে সংগ্রহ করা উপাদানে।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ড. প্রকাশ দাশগুপ্ত মত দেন, চৈত্রসংক্রান্তিতে আশপাশের ঝোপঝাড় থেকে সংগ্রহ করা ভোজ্য লতাপাতা দিয়ে দীর্ঘ ঐতিহ্য রয়েছে পাঁচন রান্নার। কারণ, পরদিন পহেলা বৈশাখে ভালো খাবার খাওয়ার মাধ্যমে বরণ করা হয় নতুন বছরকে।
পুষ্টিবিদ হাসিনা আক্তার লিপি জানান, পাঁচনে থাকা বিভিন্ন সবজি শরীরের জন্য অত্যন্ত উপকারী। এতে সমন্বয় থাকে কার্বোহাইড্রেট, ভিটামিন, মিনারেল ও ফাইবারের।
নগরের মোজাহের আয়ুর্বেদীয় কলেজের অধ্যক্ষ কবিরাজ শতদল বড়ুয়া বললেন, পাঁচনের অধিকাংশ উপাদানেই রয়েছে ঔষধি গুণ। তবে রান্নার পদ্ধতির ওপর অনেকটাই নির্ভর করে এর গুণাগুণ। সঠিকভাবে রান্না করা হলে এটি স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী একটি খাবার।
















