১৮০ টাকার ভাড়া ৩০০, গ্যাস সংকটে পথে পথে ভোগান্তি

চট্টগ্রাম নগরীর মোড়ে মোড়ে গাড়ির অপেক্ষায় মানুষের জটলা বেড়েছে। ছবি: আগামীর সময়
সকাল সাড়ে আটটা। অফিসে যাওয়ার তাড়া নিয়ে বহদ্দারহাট থেকে আগ্রাবাদ যাওয়ার জন্য সিএনজি অটোরিকশা থামালেন ব্যাংকার আব্দুল হাকিম। চালক ভাড়া চাইলেন ৩০০ টাকা, যেখানে এই পথের স্বাভাবিক ভাড়া ১৮০ টাকার মতো। দরদাম করেও লাভ হয়নি। অফিসে পৌঁছানোর তাড়া থাকায় শেষ পর্যন্ত বাড়তি ১২০ টাকা দিয়েই গাড়িতে উঠতে হয় তাকে।
শুধু আব্দুল হাকিমই নন, গত কয়েক দিনে চট্টগ্রাম নগরের কর্মজীবী মানুষের এমন অভিজ্ঞতা প্রতিনিয়ত ঘটছে। গ্যাসের সংকটে সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোতে দীর্ঘ সারি তৈরি হওয়ায় রাস্তায় নেমেছে কমসংখ্যক অটোরিকশা। যেগুলো চলছে, তারাও বাড়তি ভাড়া হাঁকছে। একই সঙ্গে গ্যাসচালিত গণপরিবহনেও গাড়ির সংখ্যা কমেছে। ফলে মোড়ে মোড়ে গাড়ির অপেক্ষায় মানুষের জটলা বেড়েছে। কোনো কোনো রুটে নির্ধারিত ভাড়ার চেয়েও বেশি টাকা নেওয়ার অভিযোগ করছেন যাত্রীরা।
যাত্রীদের ভোগান্তি
হালিশহর থেকে দেওয়ানহাটে প্রতিদিন অফিস করেন মিতু আক্তার। স্বাভাবিক সময়ে সিএনজি অটোরিকশায় ১০০ থেকে ১২০ টাকায় গন্তব্যে পৌঁছাতে পারেন তিনি। কিন্তু কয়েক দিন ধরে গাড়ি পেতে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে তাকে। গতকাল অটোরিকশা না পেয়ে রিকশায় যান। ভাড়া গুনতে হয়েছে ১৫০ টাকা। মিতু বলেছেন, ‘অফিসে যাওয়ার সময় হাতে বেশি সময় থাকে না। গাড়ির জন্য দাঁড়িয়ে থাকলে দেরি হয়ে যায়। আবার গাড়ি পেলেও আগের চেয়ে বেশি ভাড়া দিতে হচ্ছে। প্রতিদিন এভাবে চলা কঠিন।’
নগরের টাইগারপাস, আগ্রাবাদ, বহদ্দারহাট, হালিশহর ও ষোলশহর এলাকায় গতকাল সকাল থেকে যাত্রীদের এমন ভোগান্তি দেখা গেছে। কোথাও বাসের অপেক্ষায় দীর্ঘ সারি, কোথাও সিএনজি অটোরিকশার জন্য হন্যে হয়ে ঘুরছেন যাত্রীরা। গ্যাসচালিত বাসে উঠতে পারলেও অনেক যাত্রীর অভিযোগ, নির্ধারিত ভাড়ার বাইরে বাড়তি টাকা চাওয়া হচ্ছে।
বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মী সাইফুল ইসলাম বললেন, ‘বাসে উঠতে পারছি না, সিএনজিচালিত অটোরিকশা নিলে বেশি ভাড়া। অফিসে যেতে দেরি হচ্ছে, খরচও বাড়ছে। গ্যাসের সংকট যে এভাবে রাস্তায় এসে পড়বে, ভাবিনি।’
ফিলিং স্টেশনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা
ফিলিং স্টেশনগুলোর সামনের চিত্রও একই। এখানে যাত্রী নয়, গন্তব্যের অপেক্ষায় সারিবদ্ধ অটোরিকশা। কয়েকটি স্টেশনে দেখা গেছে সড়কজুড়ে দীর্ঘ লাইন, চালকদের কেউ দুই ঘণ্টা, কেউ তিন-চার ঘণ্টা ধরে অপেক্ষা করছেন।
ষোলশহরের একটি ফিলিং স্টেশনে কথা হয় চালক জাকির হোসেনের সঙ্গে। সকাল সাড়ে সাতটায় লাইনে দাঁড়িয়েছেন তিনি। বেলা সাড়ে ১১টা পর্যন্তও গ্যাস পাননি। জাকির বলেছেন, ‘এক জায়গায় গ্যাস নেই, আরেক জায়গায় চাপ কম। ঘুরতে ঘুরতে এখানে এসেছি। এখন চার ঘণ্টা ধরে দাঁড়িয়ে আছি। এই সময়টায় তো যাত্রী নিয়ে রাস্তায় থাকার কথা।’
চালকদের হিসাবে, গ্যাস নিতে প্রতিদিন কয়েক ঘণ্টা চলে যাওয়ায় তাঁদের ট্রিপ কমে গেছে। আয় কমলেও গাড়ির জমা, খাবার ও অন্যান্য খরচ কমেনি। ফলে বাড়তি ভাড়া না নিলে সংসার চালানো কঠিন বলে মনে করছেন অনেকে। চালক সেলিম মিয়া বলেছেন, ‘আগে দিনে যত টাকা আয় হতো, এখন তার অর্ধেকও হচ্ছে না। গ্যাসের লাইনে দাঁড়িয়ে থাকলে যাত্রী পাব কোথায়? আবার মালিকের জমা তো দিতেই হবে।’
এই সংকটের প্রভাব পড়েছে বাসাবাড়িতেও। নগরের বিভিন্ন এলাকায় গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় দিনের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে চুলা জ্বলছে না। কর্মজীবী মানুষকে রান্না না করেই বের হতে হচ্ছে, কেউ কেউ বাধ্য হয়ে হোটেল থেকে খাবার কিনছেন।
কেন এই সংকট
কর্ণফুলী গ্যাস বিতরণ কোম্পানি লিমিটেড (কেজিডিসিএল) জানিয়েছে, দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার কারণে মহেশখালীতে এলএনজি টার্মিনালগুলো থেকে এলএনজি সরবরাহ প্রায় ৭০০ মিলিয়ন ঘনফুট হ্রাস পেয়েছে। পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়া পর্যন্ত কর্ণফুলী গ্যাস অধিভুক্ত এলাকার সব শ্রেণীর গ্রাহক প্রান্তে গ্যাসের স্বল্পচাপ বিরাজ করছে।
ফলে আবাসিক গ্রাহকের পাশাপাশি পরিবহন ও শিল্প খাতেও সংকট তৈরি হয়েছে। কেজিডিসিএলের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ কমে যাওয়ায় চট্টগ্রামের বরাদ্দও কমেছে, আর পরিস্থিতি সামাল দিতে বিভিন্ন খাতে গ্যাসের চাপ কমিয়ে লোড ব্যবস্থাপনা করা হচ্ছে।
মহেশখালীর একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর জাতীয় গ্রিডে গ্যাসের সরবরাহ কমে যায়। যাতে দেশের পূর্বাঞ্চলে সংকট তীব্র হয়েছে।
পেট্রোবাংলা জানিয়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত টার্মিনালটি মেরামতের কাজ চলছে এবং দ্রুত আংশিক সরবরাহ চালুর চেষ্টা করা হচ্ছে। গতকাল দেশে মোট গ্যাস সরবরাহ কমে দৈনিক প্রায় ২ হাজার ১০০ মিলিয়ন ঘনফুটে (এমএমসিএফডি) দাঁড়িয়েছে, যেখানে দৈনিক চাহিদা প্রায় ৩ হাজার ৮০০ এমএমসিএফডি। এর মধ্যে দেশীয় গ্যাসক্ষেত্র থেকে প্রায় ১ হাজার ৬৩০ এমএমসিএফডি এবং দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল মিলে ৪১০ এমএমসিএফডি পর্যন্ত সরবরাহ এসেছে। গত ২১ জুলাই মার্কিন মালিকানাধীন এক্সিলারেট এনার্জি পরিচালিত টার্মিনালটি দুর্ঘটনার কবলে পড়ে সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়ার পর থেকে এটিই সর্বনিম্ন মোট গ্যাস সরবরাহ।
সামনে আরও ভোগান্তির শঙ্কা
গ্যাসের এই সংকট কবে নাগাদ কাটবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা কাটেনি। বৈরী আবহাওয়ার কারণে এলএনজিবাহী জাহাজকে ভাসমান টার্মিনালের সঙ্গে সংযুক্ত করা না গেলে সরবরাহ আরও কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এতে চট্টগ্রামের শিল্পকারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি সিএনজি স্টেশনে গাড়ির দীর্ঘ সারি, গণপরিবহনের সংকট ও বাড়তি ভাড়ার ভোগান্তিও আরও বাড়তে পারে। সব মিলিয়ে গ্যাসের সংকট এখন আর শুধু চুলার আগুন বা কারখানার উৎপাদনের বিষয় নয়, এর প্রভাব পড়ছে নগরবাসীর প্রতিদিনের যাতায়াত, আয়-ব্যয় ও স্বাভাবিক জীবনযাত্রায়।







