১২০০ কোটি টাকার বন্দর টার্মিনাল
কী করছে দেশের প্রথম বিদেশি অপারেটর

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
চট্টগ্রাম বন্দরে নিউমুরিং কন্টেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) পরিচালনায় দ্বিতীয় আর্ন্তজাতিক অপারেটর নিয়োগ নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা-বিতর্ক চলছে। এই পরিস্থিতির মাঝেই স্বাভাবিকভাবে আলোচনায় উঠে আসছে দেশের প্রথম বিদেশি অপারেটর ‘রেড সী গেইটওয়ে’র কথা। সৌদিআরবভিত্তিক এ অপারেটর পতেঙ্গা কন্টেইনার টার্মিনাল (পিসিটি) কেমন চালাচ্ছে, কী তাদের পারফরম্যান্স, এমন আলোচনায় সরব বন্দর ব্যবহারকারীরা।
বিদেশি এ অপারেটর চট্টগ্রাম বন্দরের সাথে ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে ২২ বছর পিসিটি পরিচালনার চুক্তি করেছে। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে চাপিয়ে দেয়া সেই কনসেশন চুক্তি নিয়ে আছে অনেক বিতর্ক। আড়াই বছরে দেশি অপারেটরের তুলনায় কতটা গতিশীল হলো তারা। লক্ষ্যমাত্রার কতটা পূরণ করতে পেরেছে। এই সেবা বন্দর ব্যবহারকারীরাই বা কতটা সন্তুষ্ট। এসব আলোচনা এখন প্রাসঙ্গিক।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো প্রথম বিদেশি এ অপারেটর পিসিটিতে কতটা সফল। তাদের এ সাফল্যের ইস্যুটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে সাম্প্রতিক সময়ে এনসিটি বিদেশি প্রতিষ্ঠানের কাছে ইজারা দেওয়ার ক্ষেত্রে।
নিজস্ব ফান্ডের ১২শ কোটি টাকায় পিসিটি নিজেরাই তৈরি করেছে চট্টগ্রাম বন্দর। কিন্তু সেখানে যন্ত্রপাতি সংযোজন করেনি। অবস্থানগত দিক থেকে এনসিটির আগে পিসিটি। বঙ্গোপসাগর থেকে কর্ণফুলীর নদীর মোহনা পেরিয়ে প্রথমে পিসিটি সেকারনে এর অবস্থান ভালো। এই টার্মিনালে তিনটি কন্টেইনার পণ্য নামানোর জেটি আছে। রয়েছে তেলের জাহাজ ভেড়ার ডলফিন জেটিও।
চুক্তি অনুযায়ী, রেড সী গেইটওয়ে টার্মিনালটির আধুনিকায়ন, গ্যান্ট্রি ক্রেন সংগ্রহ এবং প্রযুক্তিগত উন্নয়নে ১৭০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগের কথা। চুক্তির শুরুতে কনসেশন ফি ১৮.৩ মিলিয়ন ডলার দিয়েছে বন্দরকে। ইতোমধ্যে ২৫ মিলিয়ন ডলারের ১৪টি রাবার টায়ার্ড গ্যান্ট্রি ক্রেন যুক্ত হয়েছে।
২২ বছর মেয়াদি চুক্তির ২ বছর পার হলেও পণ্য উঠানামার সবচেয়ে আধুনিক যন্ত্র ‘কী গ্যান্ট্রি ক্রেন’ যুক্ত করতে পারেনি রেড সী। ফলে তাদের পারফরম্যান্স এখনো এনসিটি-সিসিটির স্টান্ডার্ডে পৌঁছেনি। কী গ্যান্ট্রি ক্রেন না থাকায় ক্রেনবিহীন বা গিয়ারলেস জাহাজ জেটিতে ভিড়তে পারছে না। এতে বিশ্বমানের পণ্য উঠানামার সেবা এখনো অধরাই থেকে যাচ্ছে।
এসব বিষয় জানতে রেড সী গেইটওয়ে টার্মিনাল বাংলাদেশে প্রধান নির্বাহী এরউইন হেজিকে প্রশ্ন পাঠিয়ে ইমেইল করা হয়। কোন সাড়া দেননি। পরে হেড অফ কমার্শিয়াল সৈয়দ আরেফ খুরশিদের সাথে ফোনে কথা বলে লিখিত প্রশ্ন পাঠানো হয় ব্যক্তিগত নাম্বারে। তাকে তাগাদা দিলে উত্তর দেয়ারও আশ্বাস দেন। এক সপ্তাহ অপেক্ষার পরেও জবাব দেননি তিনি। ১৬ জুন সকালে তাকে পুনরায় উত্তর দেয়ার তাগাদা দিলেও কোন সাড়া মিলেনি।
শিপিং ও লজিস্টিক সেক্টরে ৩৮ বছরের অভিজ্ঞ এক শীর্ষ কর্মকর্তা জানালেন, ‘তাদের অফিস পরিবেশ যতটা স্মার্ট, সার্ভিস অতটা সন্তোষজনক না। তারা শুধু মায়ের্সক লাইনকে সেবা দিচ্ছে। অন্যদের জন্য সেবা দিতে না পারলে সেটি তো আর বন্দর থাকলো না। মার্কসের টার্মিনাল হয়ে গেলো। এতে ট্রেডের উপকার হলো না।’
বন্দরের হিসাবে, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত পাঁচমাসে পিসিটিতে মোট কন্টেইনার উঠানামা হয়েছে ১ লাখ ৪৩ হাজার একক। এরমধ্যে ৩১ শতাংশই খালি কন্টেইনার। ৫০ শতাংশ আমদানি কন্টেইনার। ১৯ শতাংশ রপ্তানি কন্টেইনার। প্রতিমাসে এখন ১১/১২টি কন্টেইনার জাহাজ পিসিটিতে ভিড়ে আর গড়ে ২৮ হাজার ৭১১ একক কন্টেইনার উঠানামা হয়। কিন্তু বছরে ৫ লাখ একক কন্টেইনার উঠানামার লক্ষ্যমাত্রা পুরণ করতে হলে মাসে গড়ে ৪১ হাজার ৬৬৬ একক কন্টেইনার উঠানামা করতে হবে। সে হিসেবে কন্টেইনার উঠানামা লক্ষমাত্রা থেকে অনেক দুরে আছে বিদেশি এই প্রতিষ্ঠান।
পিসিটিতে জাহাজ ভিড়া, জাহাজ উঠানামার দক্ষতা এখনো বন্দরের আধুনিক এনসিটি, সিসিটির মতো নয়। ফলে অন্যদের সাথে দক্ষতা তুলনার সুযোগ নেই। পিসিটির প্রেক্ষাপট বন্দরের অন্য যেকোন জেটি-টার্মিনালের তুলনায় একেবারেই ভিন্ন। পিসিটিতে এখনো কী গ্যান্ট্রি ক্রেন নেই। জাহাজের নিজস্ব ক্রেন দিয়ে পণ্য উঠানামা হয়; যেমনটা হয় বন্দরের সনাতন জেনারেল কার্গো বার্থে (জিসিবি)।
পিসিটির তিনটি জেটিতে জাহাজ ভিড়ার নিয়মও অন্য জেটির চেয়ে ভিন্ন। বন্দরের অন্য জেটিতে বার্থং মিটিংয়ে ‘আগে আসলে আগে পাবেন’ ভিত্তিতে জাহাজ বরাদ্দ দেয়া হয়। কিন্তু পিসিটির জন্য সেই নিয়মের বালাই নেই। এখানে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে জাহাজ জেটিতে ভিড়ে, মিটিং পারমিশনের দরকার হয় না। শুধুমাত্র অবহিত করে। এই যে ভেড়ার বাড়তি বা বিশেষ সুবিধা পায় এমন সুযোগ বন্দরের অন্য কোন জেটি-টার্মিনালে এখনো কার্যকর হয়নি।
বন্দরের বহিনোঙর থেকে পিসিটির দুরত্ব ১০ মাইল। আর এনসিটির দুরত্ব ১৬ মাইল। এনসিটির তুলনায় দুরত্ব কম থাকায় জ্বালানি সাশ্রয়ের সুবিধা পাচ্ছে তারা। এখানকার তিনটি জেটিতে সবচেয়ে বড় ড্রাফট বা গভীরতার জাহাজ ভিড়তে পারে। অন্য জেটিতে জাহাজ দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় পণ্যভর্তি রপ্তানি কন্টেইনার এনে তোলার সুযোগ থাকলেও পিসিটিতে এ কন্টেইনার এনে রাখতে হবে অন্তত ২৪ ঘণ্টা আগে।
পিপিপি কাঠামোয় কনসেশন চুক্তিতে এই রকম অসংখ্য অযৌক্তিক ‘বিশেষ সুবিধা’ রেড সী গেইটওয়েকে দিয়ে রাখা হয়েছে। এতে অন্য অপারেটরদের সাথে তৈরি হয়েছে বৈষম্য। তাই আলোচিত এনসিটিতেও দুবাইভিত্তিক ডিপিওয়ার্ল্ডও একই কনসেশন সুবিধা চাইছে বন্দরের কাছে।
বন্দর রক্ষা পরিষদের নেতা ইব্রাহিম খোকন বলছেন, ‘রেড সি’র সঙ্গে এক কনসেশন চুক্তিতে আমরা ধরা খেয়েছি। আবারো একই ভুল আমরা এনসিটিতে করতে চাই না।’
সৌদি আরবে বিপুল প্রবাসী শ্রমিকের চাকরি নিশ্চয়তার অজুহাতে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার সৌদি আরবের একটি ব্যবসায়ীক প্রতিষ্ঠানকে এই পিসিটি পরিচালনার দায়িত্ব দেয়। তখন বিশ্বমানের সেবা নিশ্চিত, দক্ষতা বাড়ানো, অতিমাত্রায় গতিশীলতার কথা বলেছিলেন তখনকার মন্ত্রীরা। কিন্তু বাস্তবে বন্দরের জিসিবির মতোই ধীরগতি দক্ষতা দেখাচ্ছে এখন পিসিটি।
কনসেশন চুক্তির কারণেই টার্মনাল পরিচালনার প্রায় সব শর্ত গোপন রাখা হয়েছে। যেটাকে বলা হয় নন-ডিসক্লোজার এগ্রিমেন্ট (এনডিএ)।
কনসেশন চুক্তি অনুযায়ী, রেড সী পুরো টার্মিনাল একচ্ছত্রভাবে পরিচালনা করবে। সব ধরনের আয় ও মাশুল তারা সংগ্রহ করবে। এ আয় থেকে চুক্তি অনুযায়ী বন্দরকে তার পাওনা পরিশোধ করবে। এতে পিসিটিতে বন্দরের নিয়ন্ত্রণ খুব একটা নেই। কিন্তু এনসিটি, সিসিটি এবং জিসিবির ক্ষেত্রে বন্দর নিজেই সব মাশুল আদায় করে। আর দেশিয় অপারেটরদের চুক্তি অনুযায়ী তাদের পাওনা পরিশোধ করে বন্দর।




