আর্জেন্টিনার হারে বিষাদে ডুবল চট্টগ্রাম

আর্জেন্টিনা বনাম স্পেনের ফাইনাল খেলায় দর্শকের উপছে পরা ভিড়। সিআরবি শিরিষ তলা থেকে তোলা ছবি- আগামীর সময়
বিশ্বকাপ ফাইনাল মানেই উন্মাদনা, স্বপ্ন আর আবেগের মিলনমেলা। ২০২৬ বিশ্বকাপের শিরোপা নির্ধারণী ম্যাচ ঘিরে ঠিক তেমনই এক উৎসবের নগরীতে পরিণত হয়েছিল চট্টগ্রাম। শহরের অদূরের চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ মিনার প্রাঙ্গণ থেকে শুরু করে নগরের সিআরবি, কাজীর দেউড়ি, আগ্রাবাদ, পতেঙ্গা, হালিশহর, বহদ্দারহাট, কর্ণফুলী ও ২ নম্বর গেট সবখানেই বড় পর্দা, আকাশি-সাদা পতাকা, মেসির জার্সি আর হাজারো সমর্থকের সরব উপস্থিতে মুখর ছিল চারপাশ।
কোথাও বিরিয়ানির আয়োজন, কোথাও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, কোথাও আবার বন্ধুদের সঙ্গে সারারাত জেগে বিশ্বকাপ জয়ের অপেক্ষা। কিন্তু শেষ পর্যন্ত স্পেনের কাছে আর্জেন্টিনার পরাজয়ে সেই উৎসবের রাত মুহূর্তেই পরিণত হয় দীর্ঘশ্বাস, নীরবতা আর অশ্রুভেজা এক বিষাদের রাতে। মনে করিয়ে দিল ২০১৪ বিশ্বকাপ ফাইনালের সেই পুরোনো ক্ষত।
রবিবার রাত ১টার ফাইনালে মুখোমুখি হবে বর্তমান চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা ও স্পেন। এই ম্যাচ ঘিরে বিকেল থেকেই শুরু হয় নানা আয়োজন। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে ম্যাচের আগে রাত ৮টায় অনুষ্ঠিত হয় ফ্ল্যাশ মব ও সাংস্কৃতিক সন্ধ্যা। এতে উপস্থিত ছিলেন ভূমি প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন। একই সঙ্গে বড় পর্দার সামনে ভালো জায়গা দখল করতে শিক্ষার্থীদের মধ্যে দেখা যায় চিরচেনা উচ্ছ্বাস আর হুড়হুড়ি। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংগঠনের উদ্যোগে এই খেলা দেখানোর আয়োজন করা হয়। আগের ম্যাচগুলোর মতো এবারও শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীরা একসঙ্গে ফাইনাল উপভোগ করতে জড়ো হন। আকাশি-সাদা পতাকা, লিওনেল মেসির ১০ নম্বর জার্সি আর জয়ধ্বনিতে মুখর ছিল পুরো ক্যাম্পাস। সবার একটাই প্রত্যাশা—আরেকটি বিশ্বকাপ জিতে ইতিহাস গড়বে আর্জেন্টিনা, মেসির জার্সিতে যুক্ত হবে নতুন আরেকটি তারকা। অনেক সমর্থক অগ্রিম ৪ তারকা যুক্ত জার্সি অর্ডারের কাজটিও সেরে নিয়েছিলেন।
শুধু বিশ্ববিদ্যালয় নয়, পুরো চট্টগ্রাম নগর জুড়ে ছিল ফুটবল উন্মাদনা। সিআরবি, হালিশহর, ২ নম্বর গেট, কর্ণফুলী, সিটি গেট, কাজীর দেউড়ি, চকবাজার, বহদ্দারহাট, আগ্রাবাদ ও পতেঙ্গাসহ বিভিন্ন এলাকায় বড় পর্দায় খেলা দেখার আয়োজন করা হয়। কোথাও ক্লাবের উদ্যোগে, কোথাও স্থানীয় তরুণদের ব্যবস্থাপনায় হাজারো দর্শক একসঙ্গে বসে বিশ্বকাপের ফাইনাল উপভোগ করেন।
ম্যাচের শুরু থেকেই আর্জেন্টিনা সমর্থকদের মনে ছিল টানটান উত্তেজনা। কখন প্রিয় তারকা লিওনেল মেসি করবেন প্রত্যাশিত গোলটি! কিন্তু প্রত্যাশা দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হলো! গোল আর এলো না! উল্টো স্পেনের একের পর এক আক্রমণ যেন তীরের মতো আঘাত করতে লাগলো হাজারো সমর্থকের বুকে।
অতিরিক্ত সময়ে খেলা গড়াল। শেষ সময়ে স্পেন এগিয়ে গেল, বল জড়াল আর্জেন্টিনার জালে। কয়েক সেকেন্ড আগেও যেখানে জয়ধ্বনিতে মুখর ছিল চারপাশ, সেখানে নেমে আসে হঠাৎ নিস্তব্ধতা। ঠিক তখনই যেন নীল আকাশ ভেঙে পড়ল ভক্তকুলের মনে। শেষ বাঁশির সঙ্গে সঙ্গেই ভেঙে যায় কোটি সমর্থকের স্বপ্ন। সুদূর আর্জেন্টিনা থেকে বাংলাদেশ পর্যন্ত হতাশায় নিমজ্জিত হয়। লাল ও হলুদ কার্ডের ঘটনাগুলো সমর্থকদের হতাশা বাড়িয়ে দেয় আরও দ্বিগুণ।
ম্যাচ শেষে বড় পর্দার সামনে দাঁড়িয়ে অনেককে মাথায় হাত দিয়ে বসে থাকতে দেখা যায়। কারও চোখে জল, কেউ আবার নীরবে পর্দার দিকে তাকিয়ে থাকেন। কেউ হতাশায় মাঠ ছেড়ে চলে যান, আবার অনেকে শেষ পর্যন্ত দাঁড়িয়ে প্রিয় দলের খেলোয়াড়দের করতালি দিয়ে বিদায় জানান।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের শিক্ষার্থী অন্তু নাথের আক্ষেপ, ‘বিশ্বাসই হচ্ছে না এমন একটি রাত আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিল। আবারও মেসির হাতে ট্রফি দেখার স্বপ্ন পূরণ হলো না। শেষ বাঁশির পর মনে হচ্ছিল, যেন নিজের খুব কাছের প্রিয় কিছু হারিয়ে ফেলেছি।’
নগরীর সিআরবিতে খেলা দেখা মোহাম্মদ শরীফ বললেন, ‘মেসির এমন বিদায় আমরা চাইনি। ম্যাচ শেষ হওয়ার পর কয়েক মিনিট কেউ কোনো কথা বলেনি। সবাই শুধু একে অপরের মুখের দিকে তাকিয়ে ছিলাম। ফাইনালে এসে মেসির হার মেনে নেওয়া খুব কঠিন। তবুও এই দলটার প্রতি ভালোবাসা কখনো কমবে না।’
একই চিত্র দেখা গেছে নগরের বিভিন্ন এলাকাতেও। সিটি গেটে বড় পর্দার সামনে অনেক সমর্থক কান্নায় ভেঙে পড়েন। হালিশহর ও ২ নম্বর গেটে ম্যাচ শেষে নীরবে বাড়ির পথে ফিরতে দেখা যায় দর্শকদের। কর্ণফুলী, কাজীর দেউড়ি, আগ্রাবাদ ও বহদ্দারহাটেও কয়েক ঘণ্টার উৎসব মুহূর্তেই পরিণত হয় বিষণ্ন পরিবেশে। আকাশি-সাদা পতাকা হাতে থাকা অনেক সমর্থক নীরবে সেগুলো গুটিয়ে বাড়ি ফেরেন।
এভাবে স্বপ্নভঙ্গের বেদনাময় মুহূর্তের নীরব সাক্ষী হয়ে রইল চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় এবং পুরো চট্টগ্রাম নগরের একটি নির্ঘুম, বিষাদময় রাত।




