প্রতারকের ফাঁদে রাষ্ট্র : মনোরেল কাণ্ডে দায় কার?

চট্টগ্রাম শহরের যানজট কমাতে মেট্রোরেল চালুর একটা তোড়জোড় বেশ কিছুদিন ধরেই চলছে। প্রায় ৭০ কোটি টাকা খরচ করে এর সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কাজ করছে ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ (ডিটিসিএ)। কিন্তু সেই কাজ শেষ হওয়ার আগেই হুট করে মনোরেলের আরেকটি প্রকল্প নিয়ে যেন আদাজল খেয়ে নামল চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক) ও বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা)। আর এই তাড়াহুড়ো করতে গিয়ে দুটি সংস্থাই এক মস্ত ধোঁকাবাজির ফাঁদে পা দিল।
বিষয়টি নিয়ে গত ২০ জুন দৈনিক ‘আগামীর সময়’-এ ‘সবাইকে বোকা বানিয়ে মনোরেলে অদ্ভুত ধোঁকাবাজি’ শিরোনামে একটি প্রধান প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। যা পুরো দেশে রীতিমতো শোরগোল ফেলে দিয়েছে। প্রতিবেদনের মূল বিষয়বস্তু চমকে যাওয়ার মতো।
পুরো ঘটনাটি বিশ্লেষণ করলে একে স্রেফ একটা সাধারণ জালিয়াতির গল্প বলে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। এটি আসলে আমাদের রাষ্ট্রীয় শাসনব্যবস্থার দুর্বলতা, জবাবদিহির অভাব আর প্রাতিষ্ঠানিক অসতর্কতার এক চরম বহিঃপ্রকাশ। ৩০ হাজার কোটি টাকার প্রজেক্ট! একজন মানুষ নিজেকে আন্তর্জাতিক কোম্পানির লোক দাবি করে সরকারি দপ্তরে দাপিয়ে বেড়াল, একের পর এক উচ্চপর্যায়ের মিটিং করল, মন্ত্রণালয়ে ফাইল ঘুরল, অথচ কেউ একবারও ভেরিফাই করার প্রয়োজন বোধ করল না? এই খবর সংবাদমাধ্যমে না এলে জল যে কতদূর গড়াত, তা ভাবলেও গা শিউরে ওঠে।
প্রশ্ন হলো, একজন সাধারণ প্রতারক কীভাবে রাষ্ট্রের এত উচ্চপর্যায়ে পৌঁছাল— সে কি একা, নাকি আমলাতান্ত্রিক দুর্বলতা, প্রভাবশালী সিন্ডিকেট বা দুর্নীতিবাজ চক্রের সহায়তায় সরকারি দপ্তরে সহজ প্রবেশাধিকার পেয়েছিল? পুরো ঘটনায় চসিক, বিডা ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর মধ্যে সমন্বয়হীনতা ও অস্বাভাবিক তাড়াহুড়ো স্পষ্ট, যেখানে প্রাথমিক যাচাই-বাছাই কার্যত উপেক্ষিত হয়েছে। আজকের ডিজিটাল যুগে বিদেশি কোম্পানির প্রতিনিধির সত্যতা যাচাই ই-মেইল, ফোনকল বা দূতাবাসের মাধ্যমে সহজ হলেও সেই ন্যূনতম প্রক্রিয়াও অনুসরণ করা হয়নি; বরং ফাইল আদান-প্রদান ও দ্রুত অনুমোদনের প্রতিযোগিতা দেখা গেছে, যা শুধু অদক্ষতা নয়, বরং এর পেছনে অন্য কোনো স্বার্থ ছিল কি না তা গভীরভাবে খতিয়ে দেখা জরুরি।
দেশে দীর্ঘদিন ধরে বড় প্রকল্পকে ঘিরে কমিশন বাণিজ্য ও ব্যক্তিস্বার্থের সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে, যেখানে ‘বিদেশি বিনিয়োগ’ বা ‘মেগা অবকাঠামো’র মতো শব্দ ব্যবহার করে রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করা হয়। এর সঙ্গে অসাধু কর্মকর্তা ও দালাল চক্র যুক্ত হলে যাচাই-বাছাই উপেক্ষিত হয়ে দ্রুত ফাইল পাসই মুখ্য হয়ে ওঠে, মনোরেল কাণ্ডেও যার ইঙ্গিত মেলে। একই সঙ্গে দায়িত্বশীলদের পরস্পরকে দোষারোপ ও ‘মনে নেই’, ‘সবুজ সংকেত ছিল’ এ ধরনের বক্তব্য দায়হীন প্রশাসনিক সংস্কৃতিকে প্রকাশ করে, যা প্রতারকদের জন্য সুযোগ তৈরি করে। ফলে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের নাম ব্যবহার করে জালিয়াতি হলেও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে তা সময়মতো ধরা না পড়ায় দেশের ভাবমূর্তি ও বিনিয়োগ আকর্ষণ কমে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়।
আরও গুরুতর বিষয় হলো প্রকল্প সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির অতীত রেকর্ড। সংবাদ অনুযায়ী, কনসোর্টিয়ামের সঙ্গে যুক্ত এক শীর্ষ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আগেও জালিয়াতির মামলা, সেনানিবাসে অবাঞ্চিত ঘোষণা ও কারাভোগের তথ্য ছিল, যা সাধারণ অনুসন্ধানেই যাচাই করা সম্ভব। প্রশ্ন হলো, কর্তৃপক্ষ কি এসব তথ্য জানত না, নাকি জেনেও উপেক্ষা করেছে? না জেনে থাকলে তা চরম অযোগ্যতা, আর জেনেও এড়িয়ে গেলে তা সরাসরি অবহেলা ও সম্ভাব্য দুর্নীতির ইঙ্গিত। প্রশাসনে অযোগ্যতা ও অনিয়ম একসঙ্গে চললে প্রতারকদের জন্য সুযোগ সৃষ্টি হয়, কারণ তারা সিস্টেমের দুর্বলতা ভালোভাবেই কাজে লাগাতে পারে।
এ ঘটনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো একই শহরের জন্য যখন এরই মধ্যে একটি সরকারি প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই চলছিল, তখন সেটিকে পাশ কাটিয়ে নতুনভাবে মনোরেল প্রকল্প হাতে নেওয়ার কারণ কী? এর পেছনে কোনো ব্যবসায়িক বা রাজনৈতিক স্বার্থ ছিল কি না, তা সরকারের গভীরভাবে খতিয়ে দেখা উচিত। পাশাপাশি চট্টগ্রামের যানজট ও গণপরিবহন সমস্যার সমাধানে মেট্রোরেল ও মনোরেল— দুটি প্রকল্পই একই সঙ্গে কতটা অগ্রাধিকারযোগ্য, তা নিয়েও বিতর্ক রয়েছে। পরিবহন বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান বাস্তবতায় এ ধরনের ব্যয়বহুল প্রকল্পের চেয়ে তুলনামূলক সাশ্রয়ী ও বাস্তবসম্মত সমাধানই বেশি কার্যকর হতে পারে। তাই দেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতা বিবেচনায় নিয়ে সরকারের আরও সতর্ক ও যুক্তিসংগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ জরুরি।
সুতরাং ভবিষ্যতে এমন ঘটনা ঠেকানোর জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, বিদেশি বিনিয়োগ বা আন্তর্জাতিক অংশীদারত্বের ক্ষেত্রে বাধ্যতামূলক ডিজিটাল ভেরিফিকেশন ব্যবস্থা চালু করতে হবে। কোনো বিদেশি কোম্পানির প্রতিনিধি দাবি করলেই তার পরিচয় সংশ্লিষ্ট কোম্পানির প্রধান কার্যালয় এবং সংশ্লিষ্ট দেশের দূতাবাসের মাধ্যমে লিখিতভাবে নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত কোনো সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করা যাবে না।
এ ছাড়া সব মেগা প্রকল্পের আগে স্বাধীন 'ইন্টেগ্রিটি ডিউ ডিলিজেন্স' বাধ্যতামূলক করতে হবে। শুধু আর্থিক সক্ষমতা নয়, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের মালিকানা, মামলা, আন্তর্জাতিক সুনাম, নিবন্ধন এবং অনুমোদন যাচাই করতে হবে। পাশাপাশি সরকারি কর্মকর্তাদের সিদ্ধান্তের ব্যক্তিগত জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। 'মনে নেই' বা 'অন্য দপ্তর করেছে' এ ধরনের উত্তর গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। দায়িত্বে অবহেলার জন্য প্রশাসনিক এবং প্রয়োজনে ফৌজদারি ব্যবস্থা নিতে হবে।
রাষ্ট্রীয় প্রকল্পের সব সমঝোতা স্মারক, অনুমোদনপত্র, প্রতিনিধি নিয়োগপত্র এবং যাচাই-সংক্রান্ত নথি জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে প্রকাশ করতে হবে। স্বচ্ছতা বাড়লে প্রতারণার সুযোগ অনেক কমে যাবে। এ ছাড়া দুদক, সিআইডি এবং অন্যান্য তদন্ত সংস্থাকে শুধু প্রতারকদের নয়, তাদের প্রশাসনিক সহায়তাকারীদেরও তদন্ত করতে হবে। কারণ প্রতারক একা কখনো রাষ্ট্রের এতগুলো দরজা খুলতে পারে না।
চট্টগ্রামের এই মনোরেল কাণ্ড আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল যে, আমাদের আসল সমস্যা কারিগরি বা বিনিয়োগসংক্রান্ত নয়। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির অভাবই উন্নয়নের অন্তরায়। বাংলাদেশ যদি সত্যিই আন্তর্জাতিক বিনিয়োগের হাব হতে চায়, তবে শুধু বিনিয়োগ-বান্ধব নীতি কাগজ-কলমে রাখলে হবে না, প্রতিষ্ঠানগুলোকে দুর্নীতিমুক্ত ও শক্তিশালী করতে হবে। প্রতারকদের জন্য দরজা খোলা রাখলে, সৎ বিনিয়োগকারীরা মুখ ফিরিয়ে নিতে বাধ্য।
সরকার এখন এই ঘটনাকে একটা 'বিচ্ছিন্ন ঘটনা' বলে ধামাচাপা দেবে, নাকি দোষীদের শাস্তি নিশ্চিত করে পুরো সিস্টেমে বড় ধরনের সংস্কার আনবে সে সিদ্ধান্ত সরকারকেই নিতে হবে। কারণ, প্রতারকদের সাহস কখনো রাতারাতি বাড়ে না, আমাদের শাসনব্যবস্থার অবহেলাই তাদের সবচেয়ে বড় অস্ত্র।
লেখক: ইয়াসির সিল্মী, শিক্ষক, বিজিসি ট্রাস্ট বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রাবন্ধিক
মেইল : [email protected]




