আকাশি-সাদা জার্সি পরিহিত ছবিটাতে বাবার স্মৃতি

বামে মেয়ের সঙ্গে ওম প্রকাশ, ডানে স্ত্রী নন্দিনীর আহাজারি। চমেক হাসপাতাল জরুরি বিভাগের সামনে থেকে দুপুরে তোলা ছবি। রনি দে, চট্টগ্রাম
চব্বিশ ঘণ্টা আগে একগুচ্ছ ছবি পোস্ট করেছিলেন। এক স্বজনের বিয়ের আনন্দঘন মুহূর্ত। স্ত্রী, কন্যা আত্মীয়, বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে তোলা ১১টি ছবিতে হাস্যোজ্জ্বল ওম প্রকাশ বসু। এই ছবিগুলোর মতো আর কখনো হাসবেন না তিনি। ওম প্রকাশ যে নিজেই এখন ছবি হয়ে গেছেন।
আত্মীয় পিকলু দাশ ও রিয়া দাশের বিয়ের অনুষ্ঠান উপলক্ষে বেশ ধুমধামেই কেটেছে কয়েকটি দিন। বিয়ে, বউভাতের নানা আনন্দযজ্ঞ শেষে আজ রবিবার কর্মস্থলে লক্ষ্মীপুরে ফিরছিলেন ওম প্রকাশ (৪০)।
সীতাকুণ্ডের ছোট কুমিরা এলাকায় তাকে বহনকারী জোনাকি পরিবহনের বাসটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে দুর্ঘটনায় পড়ে। হাসপাতালে নিতে নিতে ওম প্রকাশ না ফেরার দেশে। দুর্ঘটনায় আহত আরও ৬ জন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন।
ওম প্রকাশ লক্ষ্মীপুরে বার্জার পেইন্টস বাংলাদেশের টেরিটরি ম্যানেজার হিসেবে কর্মরত ছিলেন। বাড়ি চট্টগ্রামের পটিয়ার হাবিলাসদ্বীপে। থাকতেন নগরের দিদার মার্কেট এলাকায়।
আজ সকালে বাসা থেকে বের হয়ে অফিসের উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছিলেন। ঘণ্টাখানেক পর খবর আসে ওম প্রকাশের দুর্ঘটনার।
প্রথমে অজ্ঞাত হিসেবে রাখা হয় চমেক মর্গে। এদিকে, স্ত্রী ফোন করে তাকে পাচ্ছিলেন না। পরে একজন ফোন ধরে দুর্ঘটনার কথা জানান। স্ত্রী ও স্বজনেরা ছুটে যান হাসপাতালে। তখন তার মরদেহ শনাক্ত করা হয়।
লাশঘরের সামনে স্বজনদের সঙ্গে বসেছিলেন স্ত্রী নন্দিনী বসু। চোখ দিয়ে অঝরে পানি পড়ছিল। কোনোভাবে মেনে নিতে পারছেন না তিনি। দু ঘণ্টা যে প্রিয় লোকটিকে সুন্দরমতো বিদায় দিলেন তিনি এখন নেই। তাদের পাঁচ বছরের মেয়ে পূর্ণার কী হবে। সবাই ঘিরে রয়েছেন নন্দিনীকে। কী স্বান্তনা দেবেন তাকে!
এই তো সেদিন ১ জুন ঘটা করে স্ত্রী নন্দিনীর জন্মদিন পালন করলেন ওম প্রকাশ বসু। সেই ছবি এখনো জ্বলজ্বল করছে ফেসবুকের পাতায়। ১৫ জুলাই নন্দিনী নিজেও পিকলু-রিয়ার বিয়ের অনুষ্ঠানের ছবি পোস্ট করেছেন। সেখানেও ওম প্রকাশের সঙ্গে হাসিমাখা স্মৃতি।
নন্দিনী বিশ্বকাপ ফুটবলে ব্রাজিলের সমর্থক। স্বামী ওম প্রকাশ আর্জেন্টিনার। ৪ জুন দুই প্রিয় দলের জার্সি পরিহিত তাদের যৌথ ছবি পোস্ট করেন নন্দিনী। সঙ্গে মেয়ে পূর্ণা। ক্যাপশনে নন্দিনী স্বামী ওম প্রকাশকে উদ্দেশ্যে করে লিখেছেন-‘কী রাগ করলা...?’
আর কোনোদিন রাগ করবেন না ওম প্রকাশ। সব রাগ, অনুরাগ, প্রিয় অপ্রিয়ের ঊর্ধ্বে তিনি এখন। আজ স্পেনের বিপক্ষে প্রিয় দল আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপ ফাইনালটিও আর দেখা হবে না আর কোনোদিন।
অনেক ছবির ভিড়ে আকাশি নীল-সাদা জার্সি পরিহিত বাপ-মেয়ের যুগল ছবিটাই হয়তো ভবিষ্যতে বাবার সঙ্গে বিশ্বকাপের বড় স্মারক হয়ে থাকবে পূর্ণার কাছে। ছোট্ট পূর্ণা হাসপাতালের লাশঘরের সামনে স্বজনদের পাশে পাশে ঘুরছে। এখনো বুঝতে পারছে না সে কী হারিয়েছে।




