স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
জঙ্গল সলিমপুরকে সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্য হতে দেওয়া হবে না

সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। ছবি : আগামীর সময়
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার জঙ্গল সলিমপুরকে সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্য হতে দেওয়া হবে না বলে হুঁশিয়ার করে দিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তবে ওই এলাকায় পাহাড়ে সরকারি খাস জমিতে বসতি স্থাপনকারী লাখো বাসিন্দাকে ‘আপাতত’ উচ্ছেদ করা হবে না বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন মন্ত্রী।
আজ রবিবার দুপুরে ওই এলাকা পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
প্রায় ৩ হাজার ১০০ একর সরকারি খাসজমি দখল করে প্লট বানিয়ে বিক্রি করে জঙ্গল সলিমপুরকে রীতিমতো ‘রাষ্ট্রের ভেতর আরেক রাষ্ট্রে’ পরিণত করেছে চিহ্নিত ভূমিদস্যু ও সন্ত্রাসী চক্র। সেখানে অভিযান চালাতে গিয়ে বারবার প্রতিরোধের মুখে পড়তে হয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে। এমনকি র্যাবের এক কর্মকর্তাকে প্রাণ দিতে হয়েছে।
প্রশাসনের পক্ষ থেকে এতদিন দখলদারদের উচ্ছেদের কথা বলা হলেও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ সেই পথে না হেঁটে বরং বাসিন্দাদের আশ্বস্ত করলেন, ‘স্থানীয় অধিবাসী যারা বিভিন্নভাবে এখানে কোনো না কোনো কারণে বসতি স্থাপন করতে বাধ্য হয়েছে। অস্থায়ীভাবে অথবা রিহ্যাবিলিটেটেড হয়েছে বিভিন্ন কারণে। তাদের কীভাবে পুনর্বাসন করা যায়, আমরা একটা পরিকল্পনা করব। তাদের কাউকেই এখান থেকে আপাতত উচ্ছেদ করা হবে না।’
‘আমরা জনগণের সরকার। জনগণকে কমফোর্ট দেওয়ার জন্য আমরা আমাদের সমস্ত পরিকল্পনা করব। সুতরাং কেউ যদি এখানে ভীতি সৃষ্টি করতে চায় যে উচ্ছেদ করা হবে, তাহলে তারা (বাসিন্দা) যেন প্রশাসনের সাথে আগেই যোগাযোগ করে।’
জঙ্গল সলিমপুরের মূল নিয়ন্ত্রক হিসেব আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তালিকাভুক্ত ভূমিদস্যু মোহাম্মদ ইয়াসিন। তাকে গ্রেফতারে গিয়ে গত ১৯ জানুয়ারি র্যাব কর্মকর্তা মোতালেব হোসেন ভূঁইয়া নিহত হয়েছিলেন। এরপর ৯ মার্চ সেনাবাহিনী, বিজিবি, র্যাব ও পুলিশ মিলে যৌথ অভিযান চালিয়ে এলাকা নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার ঘোষণা দেয় এবং সেখানে দুটি অস্থায়ী ক্যাম্প স্থাপন করা হয়। সেখানে আরেকটি ক্যাম্প স্থাপন করা হয়েছিল যেটি আজ রবিবার (৩১ মে) উদ্বোধনের কথা ছিল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর। কিন্তু গত ২৫ মে মধ্যরাতে সশস্ত্র হামলা করে সন্ত্রাসীরা সেই ক্যাম্পটি গুঁড়িয়ে দেয়।
ক্যাম্প গুঁড়িয়ে দেওয়ার মাধ্যমে সন্ত্রাসীরা রাষ্ট্রকে চ্যালেঞ্জ করেছে বলে মন্তব্য করলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, ‘আমরা অবাক হয়ে গেলাম যে, রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জ ঘোষণা করার মতো সন্ত্রাসীদের দুঃসাহস কিভাবে হলো ? তারা রাস্তা কেটে, ভেকু নিয়ে এসে, বুলডোজার নিয়ে এসে র্যাবের আন্ডার কনস্ট্রাকশন ক্যাম্প ভেঙে দেওয়ার সাহসটা কোত্থেকে পেল? তাদের সাথে কারা জড়িত? এই জায়গার জমি দখলের সাথে কারা জড়িত? এগুলো আমরা এখন ফাইন্ড আউট করছি।’
বিভিন্নসময় অভিযানের তথ্য আগে ফাঁস হয়ে যাওয়ায় কাঙ্খিত সফলতা আসেনি বলেও জানালেন মন্ত্রী, ‘আমরা দায়িত্ব গ্রহণের পর এক মাসের মধ্যেই চট্টগ্রামে কিছু সন্ত্রাসী কার্যক্রম লক্ষ্য করেছিলাম। কিছু ব্যবসায়ীর বাসভবনে গিয়ে অত্যাধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে গুলিবর্ষণ, গালিগালাজ করার পর, তাদের হুমকিধমকি দেওয়ার পর, চাঁদা আদায়ের জন্য—আমরা বিষয়টা খুব গুরুত্ব সহকারে নিই। তখনই আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম তাদের অভয়ারণ্য আগে নষ্ট করতে হবে।’
‘এর অংশ হিসেবে মার্চ মাসের ৯ তারিখ আমরা এখানে একটা যৌথবাহিনীর অভিযান পরিচালনা করি। পুলিশ, র্যাব, বিজিবি, সেনাবাহিনীর মাধ্যমে ব্যাপক তল্লাশি অভিযান চালাই। কিছু অস্ত্র উদ্ধার হয়েছে এবং কিছু সন্ত্রাসী আটক হয়েছিল। তবে আমাদের লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী আমরা সেটা করতে পারিনি। কারণ, কোনো না কোনো কারণে হয়তো এই তথ্যগুলো ফাঁস হয়ে যাওয়ার কারণে তারা আগে থেকে সাবধান হয়ে গিয়েছিল বলে আমার মনে হয়।’
তবে সিসিটিভি ক্যামেরা ও পাহারাদার বসিয়ে জঙ্গল সলিমপুরকে ভূমিদস্যুরা যেভাবে নিয়ন্ত্রণে রেখেছিল, সেটা ভেঙে দেওয়া হয়েছে বলে দাবি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর, ‘এই আলীনগর, জঙ্গল সলিমপুর— এই জায়গাটা আর কোনো বিচ্ছিন্ন সন্ত্রাসীদের এলাকা থাকবে না, অভয়ারণ্য থাকবে না। এর আশেপাশে দুইটা পাহাড়-টিলা শ্রেণী আছে। একটা হচ্ছে বেতুয়া, আরেকটা চা বাগান। এসব এলাকায়ও সন্ত্রাসীদের আনাগোনা আছে বলে আমরা জানতে পেরেছি। এখান থেকেও তাদের উচ্ছেদ করা হবে।’
দুর্বৃত্তায়িত রাজনীতির মাধ্যমে গত ১৭ বছরে আওয়ামী লীগের গঠন করা দুর্বৃত্তের রাষ্ট্রের একটা নমুনা এই জঙ্গল সলিমপুর, ভাষ্য মন্ত্রীর।
জঙ্গল সলিমপুরের সঙ্গে সীতাকুণ্ডের সলিমপুর ইউনিয়ন, ভাটিয়ারি এবং হাটহাজারী বাইপাস হয়ে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ক পর্যন্ত একটি রোড নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা হবে বলেও জানালেন মন্ত্রী, ‘এছাড়াও এখানে পুলিশের জন্য, বিজিবির জন্য, র্যাবের জন্য, অন্যান্য বাহিনীর জন্য এবং সেনানিবাসের জন্য কী কী ফ্যাসিলিটিজ ক্রিয়েট করা যায়—সে বিষয়ে আমরা কথা বলেছি। এগুলো পরিকল্পনা করছি।’
‘এখানে কারাগারের একটা স্থাপনা করার বিষয় অনেক বছর আগে থেকেই ঝুলে আছে। চট্টগ্রাম কারাগারকে শিফট করার বিষয়। একটা খাস জমির মধ্যে বায়েজিদ লিংক রোডের আশেপাশে, যেখানে এখনো আবাস নেই, বসতি নাই। এমন একটা জায়গা চিহ্নিত করে করা হয়েছে। জেলা প্রশাসন বুঝিয়ে দেবে। এটার প্রশাসনিক অনুমোদন অনেক আগেই দেওয়া হয়েছে।’
এছাড়া মাদক, সন্ত্রাস, জুয়া এবং চাঁদাবাজি বন্ধে সারাদেশে যৌথবাহিনীর মাধ্যমে সাঁড়াশি অভিযান চালানোর কথাও জানালেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ।
এসময় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে ভূমি ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন, পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মোহাম্মদ আলী হোসেন ফকিরসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও স্থানীয় প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তারা ছিলেন।






