আ.লীগ নেতার আস্থাভাজন থেকে হত্যা মামলার আসামি এখন এনসিপি নেতা
- বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে চট্টগ্রামে ছাত্রদল নেতা ওয়াসিম হত্যা মামলার আসামি
- এনসিপির অফিসের জায়গা দেওয়ায় দলে ভেড়ানোর অভিযোগ

জিয়া রনি
কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের চট্টগ্রামের প্রভাবশালী নেতা এবং সিটি করপোরেশনের সাবেক প্রথম প্যানেল মেয়র আব্দুস সবুর লিটন। রাজনীতিতে সাবেক মেয়র প্রয়াত এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরীর অনুসারী। পরে তার ছেলে সাবেক শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেলের ‘বিশেষ আস্থাভাজন’। আওয়ামী লীগের আমলে হঠাৎ টাকাওয়ালা লিটন শুরু করেন তামাক ব্যবসা। প্রতিষ্ঠা করেন ‘তারা গ্রুপ’।
লিটনের একসময়ের বিশ্বস্ত কর্মচারী এ কে এম জিয়াউদ্দিন ওরফে জিয়া রনি। ২০২২ সালে যোগ দিয়েছিলেন ‘তারা গ্রুপে’। ছিলেন মহাব্যবস্থাপক। লিটনের ‘বৈধ-অবৈধ’ ব্যবসা ও সিন্ডিকেটের বিশ্বস্ত সারথি হয়ে উঠেছিলেন ক্রমেই। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণআন্দোলনে আওয়ামী লীগের পতনের পর লিটন দেশ ছাড়েন। এর দুই বছর পর হঠাৎ জিয়াকে নিয়ে শুরু হলো তুমুল আলোচনা।
জিয়া এখন চব্বিশের গণআন্দোলনে নেতৃত্বদাতাদের দল জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) চট্টগ্রাম মহানগরের যুগ্ম আহ্বায়ক। তিনি জানালেন, চট্টগ্রাম মহানগর এনসিপির সদস্য সচিব আরিফ মঈনুদ্দিনসহ কয়েকজন নেতা মিলে তাকে দলটিতে নিয়ে গেছেন। প্রচার আছে, হঠাৎ টাকাওয়ালায় পরিণত হওয়া জিয়া এখন এনসিপির অন্যতম অর্থের জোগানদাতা। চট্টগ্রাম নগরে এনসিপিকে স্থায়ী অফিস কিনে দিয়েছেন। এনসিপি তাকে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদে প্রার্থী করবে।
রাজনীতিতে জিয়ার ‘হঠাৎ উদয়’ ও এনসিপিতে বড় পদ পাওয়া নিয়ে জানতে চাইলে আরিফ মঈনুদ্দিন আগামীর সময়কে বললেন, ‘এনসিপিতে একটা বড় অংশ আছে, যারা আগে কখনো রাজনীতি করেনি। ১৬ বছর ফ্যাসিজমের সময় অনেকে তো ভয়ে নিজের রাজনৈতিক মতপ্রকাশ করতেন না। গণঅভ্যুত্থানের পর গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার মধ্যে জিয়া ভাইদের মতো অনেকে রাজনীতিতে আসছেন। আগে রাজনীতি না করলে কেউ পরে আর রাজনীতি করতে পারবেন না বা পদে যেতে পারবেন না এমন নয়। যোগ্যতা থাকলে অবশ্যই পদে যাবেন।’
‘জিয়া ভাই আমাদের স্থায়ী অফিস কিনে দিয়েছেন, এটি পুরোপুরি সত্য নয়। চট্টগ্রাম মহানগর এনসিপির কোনো স্থায়ী অফিস এখনো নেই। একটা খুবই ছোট মাত্র ৪০০ বর্গফুটের অফিস আছে। মাসিক ভাড়ায় নেওয়া। উনি মহানগর এনসিপি চালান বা পুরো ফান্ডিং করেন এমনও নয়। আমাদের পার্টিতে অনেক ব্যবসায়ী, পেশাজীবী আছেন, যারা ভালো ইনকাম করেন। ওনারা সবাই মিলে শেয়ার করেন। সেখানে জিয়া ভাইয়ের কাছ থেকে যতটুকু হেল্প নেওয়া দরকার, সেটুকুই ওনার কাছ থেকে আমরা নিই’— বললেন আরিফ মঈনুদ্দিন।
এনসিপিতে যোগ দেওয়ার পর এখন জিয়ার ভয়েই তটস্থ লিটনের পরিবারের সদস্যরা। তাদের অভিযোগ, দেশ ছাড়ার সময় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান দেখভালের দায়িত্ব জিয়াকে দিয়ে গিয়েছিলেন লিটন। সেই প্রতিষ্ঠানগুলোর দখল-বেদখল, অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ ও ব্যবসায়িক স্বার্থের দ্বন্দ্বে ‘সাবেক বস’ লিটনের সঙ্গে এখন জিয়ার বিরোধ তুঙ্গে। এর ফলে নিজের প্রভাব ও ব্যবসার আধিপত্য টিকিয়ে রাখতে জিয়া তড়িঘড়ি করে আশ্রয় নিয়েছেন এনসিপিতে।
জিয়ার নিজের ভাষ্যে, এনসিপিতে তার যোগ দেওয়ার বয়স মাত্র ১৬০ দিন। তিনি আগামীর সময়কে বললেন, ‘আমি লিটন সাহেবের প্রতিষ্ঠানে চাকরি করতাম এটা সত্য। তারা ট্রেডার্স লিংকের জিএম ছিলাম। ২০২৩ সালের ৩১ ডিসেম্বর আমি চাকরি ছেড়ে দিই। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট যখন গণঅভ্যুত্থান হয়, তখন আমি ওনার প্রতিষ্ঠানে ছিলাম না। সুতরাং এখানে ওনার ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান আমার দখল নেওয়ার যেসব কথাবার্তা বলা হচ্ছে, সেগুলো পুরোপুরি অসত্য। আমি আব্দুস সবুর লিটনের কোনো সম্পদ কিনিনি। কোনো সম্পদ দখলে নিইনি। ওনার কোনো সম্পদ আমার ভোগদখলে নেই।’
পরিবারের সদস্যদের অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বললেন, ‘ওনার (লিটন) পরিবারের সদস্য কারা? বউ কয়টা জানেন? এখন পর্যন্ত তো শুনেছি চারটা বিয়ে করেছেন। ওনারা কত কথা বলবেন! এগুলো আমি পাত্তা দিই না।’
বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যের একটি দেশে অবস্থান করা আব্দুস সবুর লিটনের সঙ্গে গত বুধবার বিকালে আগামীর সময়ের যোগাযোগ হয়। তিনি বললেন, ‘কোনো ফ্যাক্টরি এখন আমার নিয়ন্ত্রণে নেই। কারা নিয়ন্ত্রণ করছে, সেটি আমি বলতে চাই না। আপনারা খোঁজখবর নেন। কাউকে দায়ী করছি না। কারও প্রতি আমি নেগেটিভও নই। পজিটিভও নই। আল্লাহ সবকিছু দেখছেন। আমি ২০২৪ সালের ৬ আগস্ট দেশ ছেড়েছি। যেহেতু আমি দেশে নেই, ব্যবসা করতে পারছি না।’
বিজয় ইন্টারন্যাশনাল টোব্যাকো, তারা ইন্টারন্যাশনাল টোব্যাকো, তারা ট্রেডার্স লিংকসহ কয়েকটি তামাকজাত পণ্য প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানের মালিক আব্দুস সবুর লিটন। চকরিয়ার আজিজনগর, কুষ্টিয়ার ভেড়ামাড়া ও ভৈরবে তার অন্তত ছয়টি কারখানা ও গুদাম আছে।
লিটনের ঘনিষ্ঠজন ও পরিবারের সদস্যরা জানালেন, ভৈরবের তিনটি কারখানা ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে বন্ধ আছে। চকরিয়ার আজিজনগরের কারখানাটি সরকারি দল বিএনপির একজন নেতার সন্তানের নিয়ন্ত্রণে আছে। কুষ্টিয়ার কারখানাটি জিয়ার দখলে আছে। সেটির নাম পাল্টে জেনুইন লিফ টোব্যাকো (জেএলটি) রেখেছেন তিনি। হয়েছেন প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক। মূলত কুষ্টিয়ার কারখানা নিয়েই দুজনের মধ্যে বিরোধের শুরু।
এর মধ্যে গত ৪ অক্টোবর এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী কুষ্টিয়ায় সেই বিতর্কিত কারখানা পরিদর্শনে যান। সেখানে হাস্যোজ্জ্বল ভঙ্গিতে পাটওয়ারীর সঙ্গে জিয়ার একটি ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। অভিযোগ ওঠে, রাজনৈতিক ছত্রছায়া ‘দখল করা’ ব্যবসা টিকিয়ে রাখা কঠিন বুঝতে পেরে তিনি নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীকে কারখানায় নিয়ে যান।
জানতে চাইলে এ কে এম জিয়াউদ্দিন বললেন, ‘জেনুইন টোব্যাকোর মালিকানা সম্পূর্ণ আমার। একই জায়গায় লিটন সাহেবেরও কারখানা আছে। আমারও আছে। তাই বলে আমার কারখানা কি ওনার হয়ে যাবে? নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী ভাই নিজ থেকে আমার কারখানায় যাননি। তিনি কুষ্টিয়ায় যাবেন শুনে আমিই ফোন করে আমার কারখানায় যেতে বলেছিলাম।’ জিয়াউদ্দিনের দাবি, আব্দুস সবুর লিটনের মালিকানাধীন প্রতিটি কারখানা সচল আছে। চব্বিশের পটপরিবর্তনের পর তার প্রতিষ্ঠানের কোনো ক্ষতি হয়নি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে আব্দুস সবুর লিটন বললেন, ‘ভাই, আমি দেশছাড়া। এমনিতেই বিপদের মধ্যে আছি। নতুন করে আর কোনো বিপদ ডেকে আনতে চাই না। জিয়া আমার প্রতিষ্ঠানের স্টাফ ছিল। সে আছে তার তালে। আমি আছি আমার তালে। আমি কারও সঙ্গে কোনো ঝগড়া-ফ্যাসাদ করতে চাই না।’
এনসিপিতে আশ্রয় পাওয়া জিয়াউদ্দিন আবার ২০২৪ সালের বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে চট্টগ্রামে প্রথম শহীদ ছাত্রদল নেতা ওয়াসিম হত্যা মামলার আসামি। এ মামলায় তিনি ২০২৫ সালের ২৩ জুন গ্রেপ্তার হন। যদিও মামলার এজাহারে তার নাম ছিল না। তাকে আদালতে পাঠানোর সময় দেওয়া প্রতিবেদনে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা পাঁচলাইশ থানার এসআই মোহাম্মদ মনিরুল ইসলাম উল্লেখ করেন, তদন্তে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে জিয়াউদ্দিনকে আসামি করা হয়েছে। তিনি চসিকের সাবেক কাউন্সিলর আব্দুস সবুর লিটনের ঘনিষ্ঠ সহচর ও মহানগর যুবলীগের কর্মী। ৭ জুলাই তিনি জামিনে মুক্ত হন।
এনসিপিতে যোগ দেওয়ার পর জিয়াউদ্দিনকে গ্রেপ্তারের দাবিতে সরব হয়েছে ছাত্রদল। গত বুধবার বিকালে চট্টগ্রাম, মহানগর, উত্তর ও দক্ষিণ জেলা ছাত্রদল, চুয়েট, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়সহ আরও কয়েকটি ইউনিট সম্মিলিতভাবে নগরীতে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেছে।
জিয়াউদ্দিন আগামীর সময়কে বললেন, ‘এনসিপিতে যোগ দেওয়ার আগে আমি কখনোই কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত ছিলাম না। গণঅভ্যুত্থানের সময় আমি প্রোফাইল পিকচার লাল করেছিলাম। ওয়াসিম হত্যাকাণ্ড যেদিন হয়, সেদিন আমি দেশেই ছিলাম না। গণঅভ্যুত্থানের পর বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের কয়েকজন সমন্বয়ক আমার কাছে ৫ কোটি টাকা চাঁদা দাবি করেন। আমি টাকা দিতে অপারগতা প্রকাশ করি। এরপর ২৩ জুন সকালে আমাকে চা খাওয়ার কথা বলে পুলিশ কমিশনারের অফিসে ডেকে নিয়ে যায়। অন্তত ১ কোটি টাকা দেওয়ার জন্য আমার ওপর চাপ প্রয়োগ করা হয়। এত টাকা আমি কীভাবে দেব? সেজন্য আমাকে আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে কেক কাটার মিথ্যা অভিযোগ এনে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে ওয়াসিম হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়।’
জিয়াউদ্দিন কোনো সমন্বয়কের নাম উল্লেখ না করলেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে খান তালাত মাহমুদ রাফিকে এজন্য দায়ী করে নানা সমালোচনা চলছে। তিনি বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের চট্টগ্রামের সমন্বয়ক ও কেন্দ্রীয় সহ-সমন্বয়ক ছিলেন। বর্তমানে এনসিপির সহযোগী সংগঠন জাতীয় ছাত্রশক্তির কেন্দ্রীয় সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক।
খান তালাত মাহমুদ রাফি আগামীর সময়কে বললেন, ‘গণঅভ্যুত্থানের পরবর্তী সময়ে স্বৈরাচারের লোকজনকে নিয়ে অনেকে বিভিন্ন অভিযোগের ডকুমেন্ট আমাদের দিতেন। বিশেষ করে সাংবাদিকরা অনেক ডকুমেন্ট দিয়েছেন। সেগুলো পেলেই আমরা সিএমপি কমিশনার কিংবা অন্য কর্মকর্তাদের ফরোয়ার্ড করতাম। আমাদের পাঠানো ডকুমেন্ট যাচাই-বাছাই করে পুলিশ ব্যবস্থা নিত। জিয়াউদ্দিনকে আমি অভ্যুত্থানের আগে-পরে কখনো দেখিনি। চিনতামও না। ওনার বিষয়ে একটা ডকুমেন্ট আমাকে দেওয়া হলে আমি গতানুগতিকভাবে সিএমপি কমিশনারকে (তখন দায়িত্বে ছিলেন হাসিব আজিজ) ফরোয়ার্ড করি। এরপর ওনাকে গ্রেপ্তার করা হয়। এখন ওনাকে আমাদের দল এনসিপিতে কারা এনেছেন আমি জানি না।’



