স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর উদ্বোধনের অপেক্ষায় যৌথবাহিনীর ক্যাম্প, গভীর রাতে গুঁড়িয়ে দিল সন্ত্রাসীরা

ছবি: আগামীর সময়
চট্টগ্রাম মহানগরী সংলগ্ন সীতাকুণ্ডে জঙ্গল সলিমপুর। প্রায় সাড়ে ১২ বর্গকিলোমিটারের এই পাহাড়ি এলাকা যেন ‘রাষ্ট্রের ভেতর আরেক রাষ্ট্র’। ভূমিদস্যু, সন্ত্রাসী, দাগী অপরাধীদের আস্তানা খ্যাত এই জঙ্গল সলিমপুরে প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার জন্য র্যাব-পুলিশের সমন্বয়ে যৌথবাহিনীর একটি ক্যাম্প ৩১ মে উদ্বোধন করার কথা ছিল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদের।
গতকাল রবিবার সকালে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এ কর্মসূচির বিষয়টি চূড়ান্ত হয়। আর রাতের অন্ধকারে হাজারো সন্ত্রাসী গুলি ছুঁড়তে ছুঁড়তে আক্রমণ করে সেই ক্যাম্পে। এস্কেভেটর দিয়ে গুঁড়িয়ে দেয় ক্যাম্পটি। এর আগে সন্ত্রাসীদের সঙ্গে যৌথবাহিনীর সদস্যদের গুলিবিনিময় হয়। কিন্তু চারদিক ঘিরে হঠাৎ আক্রমণের মুখে পালিয়ে যেতে বাধ্য হন ক্যাম্পের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা।
হামলার পর যৌথবাহিনী অভিযান চালিয়ে কমপক্ষে ৩০ জনকে আটক করেছে। সন্ত্রাসীদের ফেলে যাওয়া ২টি মোটর সাইকেল, ২টি এস্কেভেটর ও ১টি ট্রাক জব্দ করেছে।
র্যাব এ ঘটনার জন্য ‘রাষ্ট্রের ভেতরে আরেক রাষ্ট্রের’ প্রধান নিয়ন্ত্রক মো. ইয়াসিনের নেতৃত্বাধীন ইয়াসিন বাহিনীর সদস্যদের দায়ী করছে। এলাকাবাসীর ভাষ্যও তাই। প্রশ্ন উঠেছে, এর মধ্য দিয়ে সন্ত্রাসী ইয়াসিন বাহিনী স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্তৃত্বকে চ্যালেঞ্জ করলো কী না। র্যাব কর্মকর্তাদের ভাষ্য, সন্ত্রাসীরা অবশ্যই সরকারকে বিব্রত করার জন্য এ ঘটনা ঘটিয়েছে।
নগরীর শেরশাহ মোড় থেকে বায়েজিদ-ফৌজদারহাট লিংক রোড ধরে তিন কিলোমিটার গেলে আরেফিন নগর এলাকা। সেখানে লিংক রোডের ডানে পাহাড় ভেদ করে চলে যাওয়া একটি সড়ক। সেটি জঙ্গল সলিমপুরের প্রবেশমুখ। সেখান থেকে আলীনগর পর্যন্ত প্রায় ৩১০০ একর এলাকায় পাহাড় কেটে সরকারি খাসজমি দখল করে প্লট বানিয়ে ঘরবাড়ি তুলে গড়ে তোলা হয়েছে বিশাল সাম্রাজ্য। প্রশাসনের ভাষ্য, এর পুরোটাই অবৈধ। কিন্তু সেখানে পাওয়া যায় গ্যাস, পানি, বিদ্যুৎসহ শহরের সব ধরনের নাগরিক সুবিধা।
একসময় ইয়াসিন বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে ছিল শুধুমাত্র আলীনগর এলাকা। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর পুরো জঙ্গল সলিমপুরই ইয়াসিনের নিয়ন্ত্রণে বলে জানালেন এলাকাবাসী। গত ১৯ জানুয়ারি ইয়াসিনকে গ্রেফতার অভিযানে গিয়ে বেধড়ক পিটুনিতে প্রাণ হারান র্যাব-৭ এর গোয়েন্দা টিমের প্রধান নায়েব সুবেদার মো. মোতালেব হোসেন ভূঁইয়া। আহত হন আরও তিন র্যাব সদস্য। এরপর ৯ মার্চ সেনাবাহিনী, বিজিবি, র্যাব ও পুলিশ মিলে ২০০ সদস্যের বিশাল যৌথবাহিনী সেখানে সাঁড়াশি অভিযান চালায়। ইয়াসিনকে গ্রেফতার করতে না পারলেও জঙ্গল সলিমপুরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেছে বলে ঘোষণা দেয়। যৌথবাহিনীর দুটি অস্থায়ী ক্যাম্প প্রতিষ্ঠা করা হয়। এছাড়া পুলিশ একাডেমি, কারাগারসহ আরও বিভিন্ন সরকারি স্থাপনা প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেওয়া হয়।
অস্থায়ী ক্যাম্পগুলোর মধ্যে একটি আলীনগর প্রাথমিক ও উচ্চ বিদ্যালয়ের নির্মাণাধীন এক ভবনে স্থাপন করা হয়েছে। সেখানে জেলা পুলিশ, এপিবিএন, আরআরএফ ও র্যাব মিলে ১৫০ সদস্য নিয়মিত অবস্থান করে। রোববার রাতে হামলার সময় এস্কেভেটর দিয়ে সেই ভবনের সীমানা দেওয়ালের আংশিক ভেঙে দেয় সন্ত্রাসীরা। জঙ্গল সলিমপুরের প্রবেশমুখ থেকে আলীনগর বিদ্যালয় পর্যন্ত প্রায় চার কিলোমিটার এলাকায় চারটি স্থানে এস্কেভেটর দিয়ে রাস্তা কেটে দিয়ে সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা প্রবেশ করে ক্যাম্পে হামলার জন্য। হামলার খবর পেয়ে দ্রুত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা যাতে সেখানে প্রবেশ করতে না পারে, সেজন্য সন্ত্রাসীরা এ কৌশল নেয় বলে জানান র্যাব ও পুলিশ কর্মকর্তারা।
আজ সোমবার (২৫ মে) সকালে ওই এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে, লিংক রোডে জঙ্গল সলিমপুরের প্রবেশমুখ থেকে প্রায় দেড় কিলোমিটার দূরে খেজুরতলা এলাকায় দুই স্থানে, এর আধা কিলোমিটার দূরে পাথরিঘোনা এলাকা এবং আরও এক কিলোমিটার পরে আলীনগর চৌরাস্তার মোড়ে রাস্তা কেটে ফেলা হয়েছে। সেখানে পথচারীদের হেঁটে পারাপারেও যথেষ্ঠ বেগ পেতে হচ্ছে।
আলীনগর প্রাথমিক ও উচ্চ বিদ্যালয়ের ক্যাম্প থেকে পূর্বে ৫০ গজের মতো গেলে যৌথবাহিনীর নতুন সার্বক্ষণিক ক্যাম্পটি গড়ে তোলা হয়েছিল। পাকা পিলারের সঙ্গে চারদিকে টিনের ঘেরা দিয়ে ক্যাম্পটি নির্মাণ করা হয়। পুলিশ ও নির্মাণ শ্রমিকরা জানান, গত ১ মে থেকে ক্যাম্পটি নির্মাণের কাজ শুরু হয়। প্রায় ৯০ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। পুরো কাজ শেষ করে আগামীকাল মঙ্গলবার শ্রমিকদের বিদায় নেওয়ার কথা ছিল। ক্যাম্পটিতে প্রতি শিফটে নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করছিলেন র্যাব, জেলা পুলিশ ও এপিবিএনের ৫ জন করে সদস্য মিলে ১৫ জন। নির্মাণ শ্রমিকদের ক্যাম্পের সামনেই খালি একটি দোকানের ভেতরে থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছিল।
নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা এপিবিএনের এক সদস্যের ভাষ্য, ‘রাত ১টার পর হবে। আমরা ১৭ জন ডিউটি করছিলাম। হঠাৎ দক্ষিণ দিকে পাহাড়ের ওপর থেকে গুলিবর্ষণ শুরু হয়। আমরাও গুলি ছুঁড়তে ছুঁড়তে দক্ষিণ দিকে এগোতে থাকি। কিন্তু উত্তর ও পূর্বদিক থেকে শত, শত সন্ত্রাসী তখন গুলিবর্ষণ করতে করতে আমাদের দিকে আসতে থাকে। আমরা অস্ত্রধারীদের ঘেরাওয়ের মধ্যে পড়ে যাই। তখন প্রাণভয়ে আমরা যে যেদিকে পেরেছি, সেদিকে চলে যাই।’
প্রত্যক্ষদর্শী নির্মাণ শ্রমিক হৃদয় ইসলাম বললেন, ‘প্রথমে পাহাড়ের ওপর থেকে গুলি শুরু করে। তারপর দুইদিক থেকে গুলি ছুঁড়তে ছুঁড়েতে সন্ত্রাসীরা আসতে থাকে। মোটর সাইকেলেও কয়েকজন আসে। অনেকের হাতে পিস্তল আর কিরিচ দেখছি। ট্রাক আর এস্কেভেটরও নিয়ে আসে। আমরা দোকানের ভেতর ঘুমানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। সাতজন ছিলাম। তিনজন ড্রেনের ভেতরে ঢুকে পড়ে আর চারজন দোকানের ভেতরে বসে থাকি। কয়েকজন সন্ত্রাসী দোকানের ভেতরে ঢুকে আমাদের মারধর করে ৪০ হাজারের মতো টাকা আর সবার মোবাইলগুলো নিয়ে চলে যায়।’
আরেক নির্মাণ শ্রমিক বললেন, ‘এস্কেভেটর দিয়ে আমাদের তৈরি করা ক্যাম্পটা একেবারে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দিয়েছে। তবে আল্লাহ আমাদের বাঁচিয়েছে। আমরা মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসেছি।’
পুলিশ ও র্যাবের সদস্যরাও সন্ত্রাসীদের লক্ষ্য করে পাল্টা গুলিবর্ষণ করে বলে জানালেন এক নির্মাণ শ্রমিক, ‘সন্ত্রাসীরা দুটি মোটর সাইকেল ফেলে যায়। উত্তেজিত পুলিশ সদস্যরা একটি মোটর সাইকেলে আগুন ধরিয়ে দেয়। আরেকটি ভাঙচুর করে।’
নীরব নামে একজন নির্মাণ শ্রমিক আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য দিলেন, ‘ইয়াসিন বাহিনীর সন্ত্রাসীরা হামলা করেছে। এলাকার লোকজন জড়িত ছিল। কারণ এখানে প্রতিদিন দোকানপাট বন্ধ হয় রাত ১২টা-১টার দিকে। গতকাল রাতে ১০টার মধ্যে সব বন্ধ হয়ে যায়। আমরা কয়েকজন পুলিশ ভাইসহ রাত সাড়ে ১১টার দিকে সিগারেট কিনতে সিএনজি অটোরিকশা স্ট্যান্ডে যাই। সেখানে ৫-৬ জন লোক দেখি। তাদের কাছে যে অস্ত্র আছে সেটা আমরা বুঝতে পারি। আগেরদিন এলাকার কয়েকজন লোক এসে আমাদের ভিডিও করে। তারা হুমকি দেয় প্রত্যেকজনকে দেখে নেবে বলে।’
ক্যাম্পের সামনে একটি স্টেশনারি দোকান দেখিয়ে এপিবিএনের এক সদস্য বলেন, ‘এই দোকানের মালিকের ছেলেকে আমরা চিনি। সবসময় এখানে দেখি। গতকাল হামলার সময় তাকেও দেখলাম অস্ত্র হাতে। এখানে ইয়াসিন বাহিনী বলতে আলাদা কোনো বাহিনী নেই। এলাকার সব লোকজনই ইয়াসিন বাহিনী। ইয়াসিনের কথাই এখানে আইন।’
মধ্যরাতে হঠাৎ আক্রমণের বর্ণনা দিয়ে চট্টগ্রামের পুলিশ সুপার (এসপি) মাসুদ আলম বললেন, ‘জঙ্গল সলিমপুরের মেইন সড়কের ৩-৪ জায়গায় সন্ত্রাসীরা রাস্তা কেটে ব্যারিকেড তৈরি করে হামলা শুরু করে। সীতাকুণ্ড থানা থেকে পুলিশ দ্রুত মুভ করে। কিন্তু ততক্ষণে হামলাকারীরা আলীনগরে নতুন নির্মিত ক্যাম্পের দিকে চলে যায়। সেখানে আক্রমণ করে। নতুন এই ক্যাম্পটার ওপর সন্ত্রাসীদের যথেষ্ঠ ক্ষোভ ছিল।’
‘আলীনগর স্কুলে আরেকটি ক্যাম্পে আমাদের ১৫০ সদস্য ছিল। তারা শক্ত প্রতিরোধ গড়ে তোলে। তাদের ১০৫ রাউন্ড গুলি ছুঁড়তে হয়েছে। পুলিশের শক্ত প্রতিরোধের মুখে হামলাকারীরা টিকতে না পেরে দ্রুত পাহাড়ের দিকে পালিয়ে যায়।’
দেড় ঘন্টা ধরে আক্রমণ-পাল্টা আক্রমণ চলে বলে জানালেন র্যাবের চট্টগ্রাম জোনের অধিনায়ক লেফট্যানেন্ট কর্নেল হাফিজুর রহমান, ‘এস্কেভেটরগুলো সন্ত্রাসীরা পাহাড়ি সরু পথ দিয়ে নিয়ে আসে। সেজন্য এই তথ্য আমরা আগেভাগে পাইনি। তারা চর্তুদিক থেকে গুলি, ককটেল ছুঁড়ে হঠাৎ আক্রমণ শুরু করে। তারা একে-৪৭ রাইফেল ব্যবহার করেছে। আমাদের পক্ষ থেকে টিয়ারশেল ও শটগানের বুলেট এবং অল্প কিছু রাইফেল দিয়ে ফায়ার করা হয়েছে।’
পাল্টাপাল্টি আক্রমণে যৌথবাহিনীর সদস্যদের মধ্যে তেমন কেউ আহত হননি বলে জানালেন এ র্যাব কর্মকর্তা।
এ অবস্থায় ৩১ মে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদের যৌথবাহিনীর ক্যাম্প উদ্বোধন কর্মসূচি বহাল থাকছে কি না, তা নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে। র্যাব-৭ অধিনায়ক ও এসপি উভয়ে জানিয়েছেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কর্মসূচি পালন করা যাবে। নিরাপত্তার কোনো ঘাটতি হতে তারা দেবেন না।






