বিশ্বের সবচেয়ে জনাকীর্ণ সমুদ্রসৈকত!

দামেইশা সৈকতে দর্শনার্থীদের ভিড়
চীনের দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর শেনঝেনের একটি ছোট্ট সমুদ্রসৈকত-দামেয়িশা। দৈর্ঘ্যে মাত্র ১.৮ কিলোমিটার (১.১ মাইল), অর্থাৎ হেঁটে পার হতে সময় লাগে বড়জোর ২০-২৫ মিনিট। অথচ এই ছোট্ট বালুচরই কখনো কখনো একসাথে প্রায় ২ লাখ মানুষের ভার বহন করে-যা একে বিশ্বের সবচেয়ে ভিড়যুক্ত সমুদ্রসৈকতের তকমা এনে দিয়েছে, তাও রীতিমতো বড় ব্যবধানে।
শেনঝেনের ইয়ানতিয়ান জেলায় অবস্থিত দামেয়িশা সমুদ্রসৈকত এমনিতেই জনবহুল চীনে একটি পরিচিত নাম, তবে ভিড়ের দিক থেকে এটি চীনা মানদণ্ডেও ব্যতিক্রম। সাপ্তাহিক ছুটির দিনগুলোতে এই বালুচর একরকম জনসমুদ্রে রূপ নেয়। পরিস্থিতি এতটাই নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে যে কর্তৃপক্ষকে বাধ্য হয়ে সেখানে দৈনিক প্রবেশাধিকারপ্রাপ্ত দর্শনার্থীর সংখ্যা সীমিত করে দিতে হয়েছে। দামেয়িশা ঠিক কতটা ভিড়ে ঠাসা হতে পারে তা বোঝার সবচেয়ে সহজ উপায় হলো ট্রিপঅ্যাডভাইজারের মতো প্ল্যাটফর্মে গিয়ে দর্শনার্থীদের পর্যালোচনা পড়া। সেখানে অসংখ্য অভিযোগ পাওয়া যায়, যার মধ্যে বেশ কিছু পর্যালোচনায় দর্শনার্থীরা লিখেছেন-মানুষের ভিড়ে তারা সমুদ্রের পানি পর্যন্ত পৌঁছাতেই পারেননি। কেউ কেউ একে রীতিমতো “সার্ডিন-ক্যানের মতো ঠাসা” বলে বর্ণনা করেছেন, আবার কারও মন্তব্য ছিল, পার্কিং জায়গা তো দূরের কথা, গাড়ি নিয়ে সৈকতের ধারেকাছে পৌঁছাতেই ঘণ্টার পর ঘণ্টা ট্র্যাফিকে আটকে থাকতে হয়।
দামেয়িশা একটি সরকারি বা পাবলিক সৈকত, অর্থাৎ নীতিগতভাবে যে কেউ এখানে বিনামূল্যে প্রবেশ করতে পারেন। তবে ক্রমাগত অতিরিক্ত ভিড়ের সমস্যা মোকাবিলায় সাম্প্রতিক বছরগুলোতে শেনঝেন কর্তৃপক্ষ একটি নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা চালু করেছে। মে থেকে অক্টোবর-অর্থাৎ পর্যটন মৌসুমে-প্রতিদিনের দর্শনার্থী সংখ্যা সর্বোচ্চ ৮০ হাজারে বেঁধে দেওয়া হয়েছে। এই সীমা কার্যকর করতে একটি বাধ্যতামূলক অনলাইন রিজার্ভেশন সিস্টেম চালু করা হয়েছে, যাতে দর্শনার্থীরা আগে থেকেই নির্দিষ্ট দিনের জন্য নিজেদের প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করে নিতে পারেন।কিন্তু ৮০ হাজারের এই সীমাও বাস্তবে সবসময় কার্যকর থাকে না। বিশেষ কিছু উপলক্ষে-যেমন লম্বা ছুটির দিনগুলোতে-দামেয়িশায় একসঙ্গে প্রায় ২ লাখ মানুষের সমাগম হয়েছে বলে জানা যায়। এত বিপুল ভিড়ের কারণে সেখানে হাঁটাচলা করাই কঠিন হয়ে পড়ে, সাঁতার কাটা বা রোদ পোহানো তো দূরের কথা।
আসলে এমন বিশাল জনসমাগমের নজির নতুন কিছু নয়। শেনঝেনের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম ও স্থানীয় সূত্র অনুযায়ী, চীনা নববর্ষ বা স্প্রিং ফেস্টিভ্যালের ছুটিতে এক দিনেই প্রায় ১ লাখ ৬০ হাজার মানুষ এই সৈকতে ভিড় জমিয়েছিল বলে খবর প্রকাশিত হয়েছে। এমনকি মে দিবসের লম্বা ছুটিতেও দামেয়িশা সৈকত পার্কে তিন দিনে সাড়ে চার লাখের বেশি দর্শনার্থী এসেছিলেন বলে সংবাদ পরিবেশনকারী সংস্থাগুলোর প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, যার মধ্যে এক দিনেই দুই লাখের বেশি মানুষ প্রবেশ করেছিলেন। স্থানীয়দের মধ্যে এমন কথাও প্রচলিত আছে যে, ব্যস্ত সপ্তাহান্তে দর্শনার্থীর সংখ্যা ৫০ হাজার ছাড়ালেই সৈকতে একটি সতর্কীকরণ অ্যালার্ম বেজে ওঠে।
স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে-এত ভিড়ের পরও কেন মানুষ বারবার দামেয়িশায় ফিরে আসেন? উত্তরটা লুকিয়ে আছে এর অবস্থান ও সংযোগ ব্যবস্থায়। পরিহাসের বিষয় হলো, যে গণপরিবহন ব্যবস্থা দামেয়িশাকে এত সহজলভ্য করে তুলেছে, সেটিই আবার এর অতিরিক্ত ভিড়ের অন্যতম কারণ। সৈকতে পৌঁছানোর জন্য একাধিক বাস রুট তো আছেই, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো-ঠিক সৈকতের সামনেই একটি মেট্রো স্টেশন রয়েছে। ফলে শেনঝেনের যেকোনো প্রান্ত থেকে সহজেই এখানে পৌঁছানো যায়, কোনো গাড়ি বা ট্যাক্সির প্রয়োজন হয় না।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিনামূল্যে প্রবেশাধিকার-দামেয়িশায় ঢুকতে কোনো টিকিট বা ফি লাগে না। সহজ যাতায়াত আর বিনামূল্যে প্রবেশ, এই দুইয়ের মিশেলে সৈকতটি স্থানীয় শেনঝেনবাসী ও পর্যটক-উভয়ের কাছেই অত্যন্ত আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে। বিপরীতে, এর পাশেই অবস্থিত ছোট ও তুলনামূলক শান্ত সৈকত জিয়াওমেইশায় প্রবেশ ফি নেওয়া হয় বলে সেখানে ভিড় অনেকটাই কম থাকে-এই একটি তুলনা থেকেই বোঝা যায়, বিনামূল্যে প্রবেশাধিকার কতটা প্রভাব ফেলে দর্শনার্থীর সংখ্যায়। দামেয়িশা একা নয়-চীনের একাধিক সমুদ্রসৈকত বিশ্বের সবচেয়ে ব্যস্ত সৈকতের তালিকায় নিয়মিত জায়গা করে নেয়। উদাহরণস্বরূপ, উত্তর-পূর্ব চীনের দালিয়ান শহরের গোল্ডেন পেবল বিচেও গ্রীষ্মে প্রায় ৪০ হাজার মানুষের সমাগম ঘটে। তবে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের একাধিক প্রতিবেদনে দামেয়িশাকেই বারবার বিশ্বের সবচেয়ে ভিড়যুক্ত সমুদ্রসৈকত হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে-কারণ এর দৈর্ঘ্যের তুলনায় দর্শনার্থীর সংখ্যা সত্যিই অস্বাভাবিক। ১.৮ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি সৈকতে ২ লাখ মানুষ মানে প্রতি মিটারে গড়ে শতাধিক মানুষের ঘনত্ব-যা বিশ্বের অন্য যেকোনো জনপ্রিয় সৈকতের তুলনায় বহুগুণ বেশি ট্রিপঅ্যাডভাইজার ও অন্যান্য অনলাইন প্ল্যাটফর্মে দামেয়িশা নিয়ে বহু নেতিবাচক পর্যালোচনা থাকা সত্ত্বেও, গ্রীষ্মের মাসগুলোতে সৈকতটির জনপ্রিয়তায় বিন্দুমাত্র ভাটা পড়ে না। বরং প্রতি বছর গ্রীষ্মে দামেয়িশার জনসমুদ্রের ছবি ও ড্রোন ফুটেজ নিয়মিতভাবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়ে ওঠে-রঙিন ছাতার সারি, গা ঘেঁষাঘেঁষি করে থাকা মানুষ আর সৈকতজুড়ে মাথার সমুদ্র দেখে বিস্মিত হন বিশ্বজুড়ে দর্শকরা।
যারা সত্যিকারের নিরিবিলি সৈকত অভিজ্ঞতা চান, স্থানীয়রা তাদের পরামর্শ দেন সপ্তাহের মাঝামাঝি, অর্থাৎ মঙ্গল থেকে বৃহস্পতিবারের মধ্যে দামেয়িশায় যেতে, অথবা কাছাকাছি জিয়াওমেইশা বা দাপেং উপদ্বীপের অপেক্ষাকৃত কম পরিচিত সৈকতগুলো বেছে নিতে। কিন্তু সাপ্তাহিক ছুটি বা লম্বা সরকারি ছুটির দিনে দামেয়িশায় গেলে একটি বিষয় মোটামুটি নিশ্চিত-আপনি একা থাকবেন না, বরং লাখো মানুষের সঙ্গে বালুচর ভাগাভাগি করেই কাটাতে হবে দিনটি।
শেষ পর্যন্ত দামেয়িশার গল্পটা এক অর্থে আধুনিক নগরায়ণের প্রতিচ্ছবি-সহজলভ্য গণপরিবহন, বিনামূল্যে প্রবেশাধিকার আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রচার মিলে একটি ছোট্ট সৈকতকে বদলে দিয়েছে বিশ্বের সবচেয়ে জনাকীর্ণ সমুদ্রতটে। প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করতে চাওয়া মানুষের ভিড়ই যেন এখানে সেই সৌন্দর্য উপভোগের পথে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সূত্রঃ অডিটি সেন্ট্রাল, দ্য ওয়েদার চ্যানেল, শেনঝেন ডিকোডেড









