লাশই ধরিয়ে দিত খুনিকে!

মৃত মানুষের শরীর কি তার খুনিকে চিনতে পারে?
মৃত মানুষের শরীর কি তার খুনিকে চিনতে পারে? খুনি সামনে এসে দাঁড়ালে লাশের চোখ, নাক কিংবা ক্ষতস্থান থেকে রক্ত ঝরতে শুরু করে- এমন বিশ্বাস একসময় বেশ প্রচলিত ছিল ইউরোপে। আদালতেও এই বিশ্বাসের ভিত্তিতে নির্ধারণ করা হতো, কে খুনি আর কে নির্দোষ। বিজ্ঞানের অগ্রগতি এই ধারণাকে কুসংস্কার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। তবে কয়েক শ বছর ধরে মানুষ যে এমন অদ্ভুত পদ্ধতিতে অপরাধীর খোঁজ করেছে, তা ইতিহাসের এক বিস্ময়কর অধ্যায়।
মৃতদেহের সাক্ষ্য
মৃতদেহের মাধ্যমে খুনিকে শনাক্ত করার এই প্রাচীন বিশ্বাসের নাম ‘ক্রুয়েনটেশন’। একে ‘বিয়ারের অর্ডিল’ বা ‘শববাহকের পরীক্ষা’ও বলা হতো। ধারণাটি ছিল, খুনির উপস্থিতিতে নিহত ব্যক্তির শরীর থেকে আবার রক্ত বের হতে শুরু করবে। কখনো চোখ বা নাক দিয়ে, কখনো শরীরের ক্ষতস্থান দিয়ে রক্ত ঝরবে। আর এই দৃশ্যকে মনে করা হতো খুনির বিরুদ্ধে স্বর্গ থেকে পাওয়া প্রমাণ।
বিশ্বাসটির উৎপত্তি ঠিক কোথায়, তা নিশ্চিতভাবে জানা যায় না। তবে এর শিকড় বেশ প্রাচীন বলে ধারণা করা হয়। প্রায় এক হাজার বছর আগের জার্মান মহাকাব্য ‘নিবেলুঙ্গেনলিড’-এ এমন একটি ঘটনার উল্লেখ আছে। কিংবদন্তির বীর সিগফ্রিডের মৃতদেহের কাছে তার হত্যাকারী হাগেন এগিয়ে এলে লাশ থেকে রক্ত ঝরতে শুরু করে।
এমন বর্ণনা থেকে ধারণা করা হয়, মধ্য ও উত্তর ইউরোপের প্রাচীন জনগোষ্ঠীর মধ্যে এ বিশ্বাসের প্রচলন ছিল। দ্বাদশ শতক নাগাদ ইউরোপের মধ্যযুগীয় সমাজে এটি অপরাধী শনাক্ত করার গ্রহণযোগ্য পদ্ধতি হয়ে ওঠে। খ্রিষ্টধর্মের প্রভাব বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে অনেকে একে ঈশ্বরের দেওয়া সংকেত বলেও বিশ্বাস করতে শুরু করেন।
আদালতে যেভাবে পরীক্ষা হতো
পরীক্ষার পদ্ধতিটিও ছিল অদ্ভুত। নিহত ব্যক্তির মৃতদেহ কফিনবাহী খাটিয়ায় করে আদালতে আনা হতো। শরীর থেকে আগে থেকেই রক্ত বা অন্য কোনো তরল বের হচ্ছিল না, এমন ক্ষেত্রে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে মৃতদেহের গায়ে হাত রাখতে বলা হতো। এরপর শরীর থেকে রক্ত বা তরল বের হতে দেখা গেলে আদালত ধরে নিত, অভিযুক্তই হত্যাকারী। একে ঈশ্বরের দেওয়া প্রমাণ মনে করা হতো। ফলে অভিযুক্তের পক্ষে নিজের নির্দোষিতা প্রমাণ করা কঠিন হয়ে পড়ত।
কিন্তু মৃতদেহ কি সত্যিই খুনিকে চিনে এমন প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারে? আধুনিক বিজ্ঞান বলছে, এর কোনো প্রমাণ নেই। মৃত্যুর পর হৃৎপিণ্ডের স্পন্দন বন্ধ হয়ে যায়, রক্ত চলাচল থেমে যায় এবং ধীরে ধীরে রক্ত জমাট বাঁধে। ফলে জীবিত মানুষের মতো শরীর থেকে নতুন করে রক্ত প্রবাহিত হওয়ার কথা নয়।
তাহলে মৃতদেহ থেকে তরল বের হওয়ার ঘটনা ঘটত কীভাবে?
কুসংস্কারের আড়ালে ছিল পচনপ্রক্রিয়া
এর একটি সম্ভাব্য ব্যাখ্যা দিয়েছেন গবেষকেরা। মৃত্যুর পর শরীরের ভেতরে গ্যাস জমতে থাকে। এতে মৃতদেহ ফুলে উঠতে পারে, ত্বকে ফোসকা দেখা দিতে পারে এবং পচনশীল নরম টিস্যু থেকে তরল বের হতে পারে। ক্ষতস্থান বা শরীরের বিভিন্ন ছিদ্র দিয়ে এসব তরল বাইরে আসাও সম্ভব। অর্থাৎ, মৃতদেহ থেকে বের হওয়া তরলকে মানুষ হয়তো নতুন করে ঝরে পড়া রক্ত ভেবেছিল। স্বাভাবিক পচনপ্রক্রিয়াকে ভুলভাবে ব্যাখ্যা করে তারা ধরে নিয়েছিল, খুনি কাছে আসায় মৃতদেহ প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে।
আশ্চর্যের বিষয়, এমন অবৈজ্ঞানিক পদ্ধতি কয়েক শ বছর ধরে অপরাধ বিচারের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়েছে। ইউরোপে অষ্টাদশ শতকে এর প্রচলন কমে এলেও যুক্তরাষ্ট্রে ১৮৬৯ সালেও এই পদ্ধতি ব্যবহারের বিবরণ পাওয়া যায়।
আজ আঙুলের ছাপ, ডিএনএ পরীক্ষা ও আধুনিক ফরেনসিক বিজ্ঞানের সাহায্যে অপরাধের তদন্ত করা হয়। মৃতদেহের নীরবতাকে আর খুনির বিরুদ্ধে সাক্ষ্য হিসেবে ধরা হয় না। তবু ইতিহাসের এই ঘটনা মনে করিয়ে দেয়, একসময় মানুষ ন্যায়বিচারের আশায় প্রকৃতির স্বাভাবিক ঘটনাকেও কীভাবে অলৌকিক প্রমাণ বলে মেনে নিয়েছিল।
সূত্র: মেন্টাল ফ্লস



